
আমি শুধু সংবাদ সম্পর্কিত কাজ জানি। এছাড়া অন্য কাজ আমি করতে পারিনা। কোন ঘটনা, দুর্ঘটনা, অন্যায় অবিচারে আমার কলম প্রতিবাদ করে উঠে। আমার প্রতিবাদের ভাষা খুব কড়া। আমি ধর্ম, বর্ণ, জাতী, গোষ্ঠি সবকিছু সমান ভাবে দেখতে শিখেছি। আমি শিখেছি নারী ও শিশুদের প্রতি সংবেদনশীল হতে। আমি চিৎকার করে কেদে উঠি, যখন কোন নারী ধর্ষনের শিকার হয়। আমি চিৎকার করে কেদে উঠি, যখন মানুষগুলো ক্ষুধায় কষ্ট পায়। আমি চিৎকার করে কেদে উঠি, যখন দেখি কোন হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি খালাস পায়।
আমি উপলব্ধি করতে শিখেছি, সকল ধর্ম, বর্ণের মানুষের সমান অধিকার আছে। আমি বিশ্বাস করতে শিখেছি, মানবতাই প্রধান ধর্ম।
আমার এই উপলব্ধি আর চেতনা এ দেশের উপযুক্ত হয়ে উঠতে পারেনি। সরকার আমার গলা চেপে ধরে আছে। সংবাদ মাধ্যমের কর্তৃপক্ষ আমার কলম দড়ি দিয়ে বেধে রেখেছে। তারপরেও যখন আমরা ছুটতে থাকি, প্রতিরোধের ভাষা বলি, তখন হয় আমাদেরকে পুলিশ নির্যাতন করে, অথবা কোন রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরা নির্যাতন করে। তারপরেও আমরা কথা বলতে চাইলে, আমাদেরকে হত্যা করা হয়।
বাংলাদেশে প্রতিদিন সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। প্রতি বছরই সাংবাদিক হত্যা করা হচ্ছে। আজ পর্যন্ত সাংবাদিক নির্যাতন বা হত্যার কোন বিচার বাংলাদেশে হয়নি।
অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়, যে দেশে আমি জন্ম গ্রহণ করেছি, আজ আমি সেই দেশেরই একজন শরণার্থী।
এইখানে সামাজিক অব্যবস্থা, সরকার দলীয় বা অন্য কোন রাজনৈতিক নেতার খারাপ দিক সম্পর্কে কথা বলতে গেলে নির্যাতন অথবা হত্যার শিকার হতে হয়। অন্যদিকে যে সংবাদ মাধ্যমে চাকরী করি, সেই সংবাদ মাধ্যমের অসংগতি, অপরাধ, মিথ্যা বা কারো পক্ষ নিয়ে সাংবাদিকতার প্রতিবাদ করলেই, কোন কারণ ছাড়াই চাকরীচ্যুত হতে হয়। আদালতে ন্যায় বিচার চাইলেও, বিচার পাওয়া যায়না। অবস্থাটা এমনই যে, চাকরী করতে হলে, একজন গৃহপালিত এর মত আচরন নিয়ে চাকরী করতে হবে। সংবাদ মাধ্যম অন্যায় ভাবে ব্যক্তিগত লাভের আশায়, যে সকল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কখনই লিখতে বা বলতে চায়না, সে সম্পর্কে সাংবাদিকরাও কোন কিছু বলতে পারবেনা। এক কথায়, নিজের বিবেককে বিসর্জন দিয়ে এই দেশে সাংবাদিকতা করতে হবে। নয়তো চাকরীচ্যুত অতবা হত্যা নির্যাতনের শিকার হতে হবে।
দীর্ঘ ১৫ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে আমার মনে হয়েছে, দেশের সরকারগুলো, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো দয়া করে এই দেশে আমাদেরকে বাস করতে দিয়েছে। আমাদের বেচে থাকাটা তাদের ওপর নির্ভর করে। অন্যদিকে কয়েকটি সংবাদ মাধ্যম আমাদেরকে তাদের ইচ্ছামত কিছু টাকা দেয়। আবার যাদের ইচ্ছা হয়না, তারা কোন টাকা দেয়না। আমরা সংবাদ মাধ্যমে চাকরী করলেও, সংবাদ মাধ্যমের কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে তাদের কৃতদাস মনে করে। তাই, যখন ইচ্ছা হয়, তখন চাকরী থেকে বের করে দেয়, আবার যখন ইচ্ছা হয়, তখন বেতন ভাতা বন্ধ করে দেয়, মানসিক নির্যাতন করে।
সংবাদ মাধ্যম, সরকারের ওপর আর এক সরকারের ভূমিকা পালন করছে। দূর্নীতিগ্রস্থ সরকার বা অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা কর্মীরা বা সমর্থন দাতারা সংবাদ মাধ্যম পরিচালনা করছে। এতে করে সাংবাদিকদের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সংবাদ মাধ্যম কোন ভূমিকাই রাখে না। এদেশের সংবাদ মাধ্যমে একজন সাংবাদিকের জীবনের মূল্য নাই।
যখন কোন সাংবাদিক নির্যাতন বা হত্যার শিকার হয়, তখন সংবাদ মাধ্যমগুলো লোক দেখানো প্রতিবাদ, সভা সমাবেশ করে। বিচারের দাবিতে বড় বড় বক্তব্য দেয়, মানব বন্ধন করে। আসলে এসব আন্দোলন লোক দেখানো। প্রকৃত পক্ষে সংবাদ মাধ্যমের কর্তৃপক্ষ বা বাংলাদেশের সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারাই চান না যে, সাংবাদিক হত্যা বা নির্যাতনের বিচার হউক। এসব নেতা কর্মীরা সরকার বা বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থন করে। অবৈধভাবে ব্যক্তিগত লাভের আশায় এরা সাংবাদিকদের জীবনকে তুচ্ছ করে দেখে।
স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে যত সাংবাদিক নির্যাতন বা হত্যার শিকার হয়েছে, কোনটি ঘটনারই বিচার আজ পর্যন্ত হয়নি।
এদেশে আমরা জন্ম গ্রহণ করলেও, সাংবাদিক হবার কারণে, আমরা যেন মানুষের সমাজ ব্যবস্থা থেকে আলাদা হয়ে অন্য কোন জীবে পরিনত হয়েছি। তাই, আমার জন্মভূমিতেই আমি পরবাসী। আমার এই দেশেই আজ আমি শরণার্থী।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ সকাল ৮:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


