
'দর্শকদের ভাবালেন ফারুকী, কাঁদালেন আয়েশা' শিরোনামে একটা নিউজ করেছে চ্যানেল আই অনলাইন। রাজনৈতিক একটি বিষয়কে নিয়ে আনিসুল হকের রচিত "আয়েশামঙ্গল" উপন্যাস অবলম্বনে নাটকটি নির্মিত হয়েছে। নাট্যরূপ দিয়েছেন বিশিষ্ট নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন চঞ্চল চৌধুরী (জয়নাল আবেদীন) এবং নুসরাত ইমরোজ তিশা (আয়েশা বিবি)। নাটকটি প্রচারিত হয়েছে চ্যানেল আই'তে। এটা অনুমেয় যে, নাটকটি দর্শক গ্রহন করেছে, এজন্যই চ্যানেল আই অনলাইন এমন সংবাদ প্রচার করছে।
নাটকটি যেহেতু রাজনৈতিক বিষয়কে কেন্দ্র করে ; এমনকি এতে জাসদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সেহেতু নাটকটির গুণগত দিক নিয়ে কথা না বলে, নাটকটি নিয়ে (রাজনৈতিক) পক্ষপাতিত্ব হবে এমনটা অনুমিতই ছিল। ইউটিউবের ৪০০ মন্তব্য পড়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ তথা দৃষ্টিভঙ্গি চোখে পড়েছে বেশিরভাগক্ষেত্রে। অবশ্য এতে ব্যক্তিগতভাবে আমি বিচলিত নই।
আমাদের দেশের প্রায় শতভাগ জনগণ একইসাথে ডাক্তার, রাজনীতিবিদ, ক্রীড়া বিশ্লেষক, সমালোচক এবং বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রাণি ; ক্ষেত্রবিশেষে সকলেই দলের নেতা। নাহয় এতবেশি শিল্পগুণ সমৃদ্ধ একটি বিষয়কে নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য আসত না। কেউ বলেছেন ফারুকী বাকশালের দালাল আবার কেউ বলেছেন জিয়ার কুকীর্তি প্রকাশ পেল বলে, কেউ বলেছেন বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসলে ফারুকীকে দেখে নেওয়া হবে, কেউবা আবার সামো ব্লগ রকমারি ডটকম এবং অনলাইন লাইব্রেরির রেফারেন্স দিয়ে দলীয় ভিত শক্ত করার কাজে বেজায় ব্যস্ত। তাই এইসব রাজনৈতিক প্রাণিদের মনে-
"জীবিত মানুষটারে দেখতে চাইলাম, দিলেন না। মৃত মানুষটারেও দেখতে দিলেন না। কবর কোথায় দিছেন, এটাও কইতেছেন না। আমরা কবর জিয়ারতও করতে পারবো না। এটা কোন বিচার স্যার?"
কিংবা
"ওর লাশটা দেখতে দিলেন না। যে বাপ মা জন্ম দিলো, ওদেরও দেখতে দিলেন না। আমি ওর স্ত্রী, আমাকেও দেখতে দিলেন না।" -হৃদয়বিদারক কথাগুলো পৌছতে পারে নাই।
একজন স্ত্রী যখন স্বামীর কবরের চিহ্নটাও জানতে না পেরে খালি জায়গায় মোনাজাত করে এবং বলে "আমি জানি না আমার স্বামীর কবর কৈ, তাই এই ৫৬ হাজার বর্গমাইল আমার স্বামীর কবর।"
তখন আমরা নাটক দেখে নিছক মন্তব্য করি, "কোয়াটার ছেড়ে যাওয়ার সময় তিশার মাথার হিজাব না থাকাটা ঠিক হয় নি" কিংবা "নিজের বউকে দিয়ে নাটক করায়, পরপুরুষ দেখে, পরকালের কথা ভুলে গেছে, নাউজুবিল্লাহ্"। বলাই বাহুল্য, কমেন্টে পরকালের বায়ান প্রদানকারী আল্লামা এই বেগানা নারীর সম্পূর্ণ নাটকটা দেখেই মন্তব্য করেছেন। শুধু দেখেন-ই নি, এই বুজুর্গ টাইম মেনশন করে হিজাব না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
ফারুকীর এই নাটকটি নিঃসন্দেহে উন্নত শিল্পমানসম্পন্ন একটি শিল্পকর্ম। তিশার অভিনয়, শেখ রাজিবুল ইসলামের ক্যামেরার কারসাজি, 'চিরকুটের' পাভেল অরিনের অসাধারণ মিউজিক- সব মিলিয়ে চমৎকার একটি কাজ হয়েছে। চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয়ও যথারীতি সাবলীল ও গলার স্বর ছিল উচ্চ। নাম ও অভিনয়- উভয়ক্ষেত্রেই তিশা ছিলেন নাটকের প্রাণ।
জাপানি বিমান ছিনতাইয়ের সাথে কারা জড়িত, বিচার কি সত্যিই ১ মিনিটে হয়েছিল, জাসদ-তাহের ইস্যু, জিয়ার কুকীর্তি, বাকশালের দালাল- ইত্যাদি বিষয়গুলো বাদ দিয়ে যদি আমরা শিল্পকে শিল্পের মতো করে বিচার, বিবেচনা ও গ্রহণ করতে পারি, তবেই আসন্ন দিনগুলোতে আমাদের শিল্প হবে উন্নত থেকে উন্নততর। তাই প্রয়োজন শিল্পবিজ্ঞানজাত দৃষ্টিভঙ্গি, শিল্পবোধসম্পন্ন অনুভুতি।
(৩০ আগস্ট ২০১৮ ইং তারিখে লিখিত)
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জানুয়ারি, ২০১৯ রাত ১২:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


