somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দুঃখের দেশান্তরি

০৩ রা জানুয়ারি, ২০১৫ রাত ৯:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মস্ত বড় পুকুরের পাড়ে পুরাতন জীর্ণশীর্ণ কুটিরটিকে কালিঘর বলেই জানতাম এবং শৈশব হতেই সেটিকে যমের মত ভয় পেতাম ৷ কুটিরের পাশেই প্রাচীনতম একটি বটবৃক্ষ এবং আশেপাশে জঙ্গল ও কিছুটা খোলা মাঠের মত জায়গা ছিল,দেখে মনে হত দীর্ঘদিন যাবৎ মানুষের চলাচল শূন্য অরন্যভূমি৷ সেই কুটিরে ও বটবৃক্ষে কৃষ্ণকায় ভূত(কালি) সুবিশাল চুলওয়ালা ভুজঙ্গ থাকত বলে শুনেছি৷ আসলে কুটিরটিতে কিছু দেবদেবীর মূর্তি ছাড়া অার কিছুই নেই তবুও এখানকার অনেক ইট সিমেন্টের পাকা মন্দিরের মধ্যে এখনও যে টিকে আছে তা ভগমানের অশেষ কৃপা ছাড়া বিশেষ কিছুই নয় ৷

আমাদের পাশের গ্রামটির নাম জগৎপুর৷সেখানে বিশ-বাইশ ঘর হিন্দু লোকের বসবাস,পূর্বে আরও অনেক ছিল তবে দেশান্তরিত হতে হতে আজ এ কয় জন টিকে আছে৷ একটা সুপ্রসারিত কাচা সড়ক গ্রামটির বুক চিড়ে মধ্যে দিয়ে চলে গেছে৷রাস্তার পাশেই তাদের বাড়ীর দহলগুলি মিশে একটা বড় খোলা মাঠের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন পূজা পার্বণের উৎসব গুলি সেখানেই আয়োজিত হয়ে থাকে৷এই মানুষগুলির অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই ভাল,কেউ চাকুরীজীবী,কেউ কৃষিজীবী কেউ বা ব্যবসায়ী তবে এখানকার রমনীদের চেহারার শ্রী অধিকতর সুন্দর ছিল৷


যাইহোক, এ গ্রামে তপন চন্দ্র দে নামক একজন গ্রাম্য ডাক্তার বাস করত৷কোন প্রতিষ্ঠানের উচ্চ না নিলেও হাতড়িয়ে অনেক বড় বড় রোগ নির্নয় করতে পারত এবং অনেক ভাল চিকিৎসা করতে পারত৷আশেপাশে অনেক গ্রামের আর্ত পিড়িত দরিদ্র মানুষ তার চিকিৎসার শরাপন্ন হত ৷তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন চিকিৎসাবিদ্যা এই দরিদ্র মানুষগুলির অল্প খরচার রোগবালাই কে বিফলে যেতে দিত না৷তাই তার সুনাম ও খ্যাতি তার নিজ এলাকার গন্ডি পেরিয়ে আশেপাশে অনেক গ্রামের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল৷

চিকিৎসা,ঔষধ বিক্রি ও কৃষিকাজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে তার সংসার খুবই ভাল ভাবে চলতেছিল৷শীর্ণকায় লম্বাচোরা তপনকে রোগাক্রান্ত মনে হলেও তার চেহারার মধ্যে আর্ট আছে,তবে মাথায় চুল নেই সেগুলো মনে হয় অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধির ভিড়ে ঝর়ে পরে গেছে৷তার স্ত্রী সোমা রানী দে দেখতে শুভ্রবর্ণের,কোকড়া চুল,শরীর দীর্ঘ হৃষ্টপুষ্ট, সুস্থ সবল এবং নবম বর্ষিকা একটি তনয়ার মাতা তা বোঝাই যায়না৷তাদের একটি মাত্র কন্যা রূপা রানী দে এবং তার চেহারার শ্রী তার মা অপেক্ষা অধিকতর সুন্দর৷খুব সুখের সংসার ছিল তাদের৷
একটা পুরাতন সাইকেলের পিছনের সীটে আরও লোহাকে গলিয়ে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে বাড়িয়ে সেখানে ঔষধের একটা বড় বাক্স দড়ি দিয়ে বেধেঁ বিভিন্ন গ্রামের হাটে যেত৷রোগী দেখা,ওষুধ দেয়া,পুরাতন রোগীর সাথে কথাবলা বা পরামর্শ দেওয়া এসব কাজ শেষে অল্প উপার্জিত অর্থ নিয়ে রাত করে বাড়ি ফিরত৷

অন্যদিকে কিছু যুবক ছেলের একটা দল আমাদের গ্রামে দেখা যেতে লাগল৷ তারা সবাই এ গ্রামের না তবে বন্ধুত্বের টানেই একত্রীভূত হত এবং এমনই বন্ধুত্ব যে আপন ভাইয়ের শিরঃচ্ছেদ করবে তবুও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে ছিন্ন করবে না৷দশম শ্রেণীতে উঠতে পারে নি কেউ,তার আগেই নাম কাটা পরেছে৷এত দিন পরীক্ষার ফি,খাতা কলম সহ আরো যে টাকা ছলে বলে কৌশলে তাদের পরিবারের কাছ থেকে খসিয়েছে সেগুলি অল্পপরিশ্রমে ও পুরোটায় সিনামার হল পর্যন্তই গড়িয়েছে৷এই কৃতবিদ্য ছাত্র গুলি তাদের স্কুল,ক্লাস, পরীক্ষাকে ডোবার জলে ফেলে দিয়ে দিনের পর দিন সিনামা হলে সিনামা দেখতে দেখতে তাদের মাথাগুলিকে বিগড়িয়ে ফেলেছে এবং তামাক পান চুন ও চা গ্রহনের মধ্য দিয়ে আধুনিক সভ্য গ্রামের বাসিন্দার খাতায় নাম লিখায়েছে৷ আসন্ন ভাদ্রের পহেলায় এ গ্রামের নদীর পারে একটা বিশাল যাত্রা অনুষ্ঠিত হবে এবং যাত্রার আয়োজন থেকে শুরু করে সমাপ্তি পর্যন্ত সবকিছুরই দ্বায়িত্ব এ যুবক ছেলের দল গ্রহন করবে ৷ কিন্তু সমস্যা একটাই হল এবং সেটা হচ্ছে অর্থের ৷কোনভাবেই এর সমাধান হল না কিন্তু যে করেই হোক গ্রামের জন্যে এ মহৎ কাজ তারা করিবেই সেজন্যে দৃঢ প্রতিজ্ঞ ৷ অবশেষে অনেক ভেবেচিন্তে, এই সিদ্ধান্তে উপনিত হল যে তারা তপনের বাড়িতে ডাকাতি করবে কারন তাদের নিজ চোখে দেখা অনেক রোগীর কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থ জমে জমে অনেক হবে ৷সভ্য পাড়াগায়ের ভবিষ্যৎ মাথা,সিনেমা থেেক প্রাপ্ত সীমাহীন জ্ঞান কে কাজে লাগিয়ে এবং একটা বিশাল,মহৎ কাজ গ্রামকে উৎসর্গ করার জন্যই এ সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছে৷
অবশেষে এক শ্রাবণ শর্বরীতে তপনের বাড়ীতে তাদের পরিকল্পনার তীর বর্ষিত হল৷সারাদিন ধরে টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছিল ,সন্ধ্যা হতে বৃষ্টি নাই তবে ভ্যপ্সা গরম ছিল৷গ্রামের সবাই তাদের গৃহের দ্বার রুদ্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছে ৷রাত্রী দ্বি প্রহরে তারা তপনের ঘরের জানালা ভেঙ্গে তার ঘরে প্রবেশ করল ৷শব্দে তাদের ঘুম ভেঙ্গে গেল এবং ভয়ে চিৎকার করতে লাগল৷এদের কয়জন তাদের মুখ কাপড় দ্বারা বেধে থামাতে চাইল,বাকীজন চাবি নিয়ে আলমারি খুলে টাকা খুজতে লাগল৷ চিৎকার কোন ভাবেই থামছেনা এবং উপায় বেগতিক দেখে প্রথমে হাত পরে ধারাল অস্ত্র দ্বারা আঘাত করতে লাগল৷ ধুপধাপ শব্দে আশেপাশের মানুষ জাগা পেল এবং এরা নিরুপায় হয়ে স্বল্প কিছু টাকা নিয়ে পালিয়ে গেল৷
তপন তার স্ত্রীর চেয়ে বেশী আহত হয়েছে,পেটেতে ছুরির আঘাতে অনেক বেশি যখম হয়েছে ৷তাকে হাসপাতলে নেওয়া হল,দুদিন অজ্ঞান থাকার পর সেখানেই মারা গেল৷
কিছুদিন পর হতে তার বাড়ীর আশেপাশে আর কাউকে দেখা গেল না৷ যে মানুষগুলোকে দধিচীর মত বুকের হার দিয়ে সেবা করত তারাও ভুলে গেল এবং তার স্ত্রী ও কন্যা কষ্টে দিনযাপন করতে লাগল ৷
শুনেছিলাম সেই ছেলেগুলোর উপর মামলা করা হয়েছিল কিন্তু কোন লাভ হয় নি,বছর দুই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে ছিল,তারপর এখানে ফিরে এসে কেউ আগের মতই আছে আবার কেউ বিবাহ করে সংসারী হয়েছে ৷
বছক তিনেক হয়ে এল তপনের স্ত্রী ও কন্যা সমন্ধে কোন খবর আমার জানা নাই ৷তবে এবার শীতের ছুটিতে বাড়িতে আসার সময় সেই কালিঘর, সুবিশাল দহল এবং দহলে তপনের স্ত্রী সোমা রাণী ও তার কন্যাকে দেখলাম৷ দুজনেই শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে,চোখেমুখে দরিদ্রতা ও কষ্টের ছাপ পরেছে এবং তারা জিনিসপত্র বোঝাই করে কোথায় যেন যাচ্ছে ৷পরে জানতে পারলাম অনেক কষ্টে ও মাঝেমধ্যেই অনাহারে দিনযাপন করত ৷সোমা রানীর একভাই কলকাতায় থাকে,তার সহযোগিতায় এখানকার বাড়ি ভিটা,জমি সবকিছু বিক্রি করে কলকাতায় তার ভাইয়ের কাছে চলে যাচ্ছে, ,,,
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার ফিরে আসার পদ্ধতি কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আপা কেন ভারতে বেড়াতে গেলেন সেটা সবাই জানে। আগামী ডিসেম্বরে আপা দেশে ফিরে আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সেটাও সবাই জানে। আপা কিভাবে দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×