মস্ত বড় পুকুরের পাড়ে পুরাতন জীর্ণশীর্ণ কুটিরটিকে কালিঘর বলেই জানতাম এবং শৈশব হতেই সেটিকে যমের মত ভয় পেতাম ৷ কুটিরের পাশেই প্রাচীনতম একটি বটবৃক্ষ এবং আশেপাশে জঙ্গল ও কিছুটা খোলা মাঠের মত জায়গা ছিল,দেখে মনে হত দীর্ঘদিন যাবৎ মানুষের চলাচল শূন্য অরন্যভূমি৷ সেই কুটিরে ও বটবৃক্ষে কৃষ্ণকায় ভূত(কালি) সুবিশাল চুলওয়ালা ভুজঙ্গ থাকত বলে শুনেছি৷ আসলে কুটিরটিতে কিছু দেবদেবীর মূর্তি ছাড়া অার কিছুই নেই তবুও এখানকার অনেক ইট সিমেন্টের পাকা মন্দিরের মধ্যে এখনও যে টিকে আছে তা ভগমানের অশেষ কৃপা ছাড়া বিশেষ কিছুই নয় ৷
আমাদের পাশের গ্রামটির নাম জগৎপুর৷সেখানে বিশ-বাইশ ঘর হিন্দু লোকের বসবাস,পূর্বে আরও অনেক ছিল তবে দেশান্তরিত হতে হতে আজ এ কয় জন টিকে আছে৷ একটা সুপ্রসারিত কাচা সড়ক গ্রামটির বুক চিড়ে মধ্যে দিয়ে চলে গেছে৷রাস্তার পাশেই তাদের বাড়ীর দহলগুলি মিশে একটা বড় খোলা মাঠের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন পূজা পার্বণের উৎসব গুলি সেখানেই আয়োজিত হয়ে থাকে৷এই মানুষগুলির অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই ভাল,কেউ চাকুরীজীবী,কেউ কৃষিজীবী কেউ বা ব্যবসায়ী তবে এখানকার রমনীদের চেহারার শ্রী অধিকতর সুন্দর ছিল৷
যাইহোক, এ গ্রামে তপন চন্দ্র দে নামক একজন গ্রাম্য ডাক্তার বাস করত৷কোন প্রতিষ্ঠানের উচ্চ না নিলেও হাতড়িয়ে অনেক বড় বড় রোগ নির্নয় করতে পারত এবং অনেক ভাল চিকিৎসা করতে পারত৷আশেপাশে অনেক গ্রামের আর্ত পিড়িত দরিদ্র মানুষ তার চিকিৎসার শরাপন্ন হত ৷তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন চিকিৎসাবিদ্যা এই দরিদ্র মানুষগুলির অল্প খরচার রোগবালাই কে বিফলে যেতে দিত না৷তাই তার সুনাম ও খ্যাতি তার নিজ এলাকার গন্ডি পেরিয়ে আশেপাশে অনেক গ্রামের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল৷
চিকিৎসা,ঔষধ বিক্রি ও কৃষিকাজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে তার সংসার খুবই ভাল ভাবে চলতেছিল৷শীর্ণকায় লম্বাচোরা তপনকে রোগাক্রান্ত মনে হলেও তার চেহারার মধ্যে আর্ট আছে,তবে মাথায় চুল নেই সেগুলো মনে হয় অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধির ভিড়ে ঝর়ে পরে গেছে৷তার স্ত্রী সোমা রানী দে দেখতে শুভ্রবর্ণের,কোকড়া চুল,শরীর দীর্ঘ হৃষ্টপুষ্ট, সুস্থ সবল এবং নবম বর্ষিকা একটি তনয়ার মাতা তা বোঝাই যায়না৷তাদের একটি মাত্র কন্যা রূপা রানী দে এবং তার চেহারার শ্রী তার মা অপেক্ষা অধিকতর সুন্দর৷খুব সুখের সংসার ছিল তাদের৷
একটা পুরাতন সাইকেলের পিছনের সীটে আরও লোহাকে গলিয়ে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে বাড়িয়ে সেখানে ঔষধের একটা বড় বাক্স দড়ি দিয়ে বেধেঁ বিভিন্ন গ্রামের হাটে যেত৷রোগী দেখা,ওষুধ দেয়া,পুরাতন রোগীর সাথে কথাবলা বা পরামর্শ দেওয়া এসব কাজ শেষে অল্প উপার্জিত অর্থ নিয়ে রাত করে বাড়ি ফিরত৷
অন্যদিকে কিছু যুবক ছেলের একটা দল আমাদের গ্রামে দেখা যেতে লাগল৷ তারা সবাই এ গ্রামের না তবে বন্ধুত্বের টানেই একত্রীভূত হত এবং এমনই বন্ধুত্ব যে আপন ভাইয়ের শিরঃচ্ছেদ করবে তবুও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে ছিন্ন করবে না৷দশম শ্রেণীতে উঠতে পারে নি কেউ,তার আগেই নাম কাটা পরেছে৷এত দিন পরীক্ষার ফি,খাতা কলম সহ আরো যে টাকা ছলে বলে কৌশলে তাদের পরিবারের কাছ থেকে খসিয়েছে সেগুলি অল্পপরিশ্রমে ও পুরোটায় সিনামার হল পর্যন্তই গড়িয়েছে৷এই কৃতবিদ্য ছাত্র গুলি তাদের স্কুল,ক্লাস, পরীক্ষাকে ডোবার জলে ফেলে দিয়ে দিনের পর দিন সিনামা হলে সিনামা দেখতে দেখতে তাদের মাথাগুলিকে বিগড়িয়ে ফেলেছে এবং তামাক পান চুন ও চা গ্রহনের মধ্য দিয়ে আধুনিক সভ্য গ্রামের বাসিন্দার খাতায় নাম লিখায়েছে৷ আসন্ন ভাদ্রের পহেলায় এ গ্রামের নদীর পারে একটা বিশাল যাত্রা অনুষ্ঠিত হবে এবং যাত্রার আয়োজন থেকে শুরু করে সমাপ্তি পর্যন্ত সবকিছুরই দ্বায়িত্ব এ যুবক ছেলের দল গ্রহন করবে ৷ কিন্তু সমস্যা একটাই হল এবং সেটা হচ্ছে অর্থের ৷কোনভাবেই এর সমাধান হল না কিন্তু যে করেই হোক গ্রামের জন্যে এ মহৎ কাজ তারা করিবেই সেজন্যে দৃঢ প্রতিজ্ঞ ৷ অবশেষে অনেক ভেবেচিন্তে, এই সিদ্ধান্তে উপনিত হল যে তারা তপনের বাড়িতে ডাকাতি করবে কারন তাদের নিজ চোখে দেখা অনেক রোগীর কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থ জমে জমে অনেক হবে ৷সভ্য পাড়াগায়ের ভবিষ্যৎ মাথা,সিনেমা থেেক প্রাপ্ত সীমাহীন জ্ঞান কে কাজে লাগিয়ে এবং একটা বিশাল,মহৎ কাজ গ্রামকে উৎসর্গ করার জন্যই এ সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছে৷
অবশেষে এক শ্রাবণ শর্বরীতে তপনের বাড়ীতে তাদের পরিকল্পনার তীর বর্ষিত হল৷সারাদিন ধরে টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছিল ,সন্ধ্যা হতে বৃষ্টি নাই তবে ভ্যপ্সা গরম ছিল৷গ্রামের সবাই তাদের গৃহের দ্বার রুদ্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছে ৷রাত্রী দ্বি প্রহরে তারা তপনের ঘরের জানালা ভেঙ্গে তার ঘরে প্রবেশ করল ৷শব্দে তাদের ঘুম ভেঙ্গে গেল এবং ভয়ে চিৎকার করতে লাগল৷এদের কয়জন তাদের মুখ কাপড় দ্বারা বেধে থামাতে চাইল,বাকীজন চাবি নিয়ে আলমারি খুলে টাকা খুজতে লাগল৷ চিৎকার কোন ভাবেই থামছেনা এবং উপায় বেগতিক দেখে প্রথমে হাত পরে ধারাল অস্ত্র দ্বারা আঘাত করতে লাগল৷ ধুপধাপ শব্দে আশেপাশের মানুষ জাগা পেল এবং এরা নিরুপায় হয়ে স্বল্প কিছু টাকা নিয়ে পালিয়ে গেল৷
তপন তার স্ত্রীর চেয়ে বেশী আহত হয়েছে,পেটেতে ছুরির আঘাতে অনেক বেশি যখম হয়েছে ৷তাকে হাসপাতলে নেওয়া হল,দুদিন অজ্ঞান থাকার পর সেখানেই মারা গেল৷
কিছুদিন পর হতে তার বাড়ীর আশেপাশে আর কাউকে দেখা গেল না৷ যে মানুষগুলোকে দধিচীর মত বুকের হার দিয়ে সেবা করত তারাও ভুলে গেল এবং তার স্ত্রী ও কন্যা কষ্টে দিনযাপন করতে লাগল ৷
শুনেছিলাম সেই ছেলেগুলোর উপর মামলা করা হয়েছিল কিন্তু কোন লাভ হয় নি,বছর দুই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে ছিল,তারপর এখানে ফিরে এসে কেউ আগের মতই আছে আবার কেউ বিবাহ করে সংসারী হয়েছে ৷
বছক তিনেক হয়ে এল তপনের স্ত্রী ও কন্যা সমন্ধে কোন খবর আমার জানা নাই ৷তবে এবার শীতের ছুটিতে বাড়িতে আসার সময় সেই কালিঘর, সুবিশাল দহল এবং দহলে তপনের স্ত্রী সোমা রাণী ও তার কন্যাকে দেখলাম৷ দুজনেই শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে,চোখেমুখে দরিদ্রতা ও কষ্টের ছাপ পরেছে এবং তারা জিনিসপত্র বোঝাই করে কোথায় যেন যাচ্ছে ৷পরে জানতে পারলাম অনেক কষ্টে ও মাঝেমধ্যেই অনাহারে দিনযাপন করত ৷সোমা রানীর একভাই কলকাতায় থাকে,তার সহযোগিতায় এখানকার বাড়ি ভিটা,জমি সবকিছু বিক্রি করে কলকাতায় তার ভাইয়ের কাছে চলে যাচ্ছে, ,,,

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


