শ খানিক মানুষের জমায়েত এ হাটে-কান্দুলীর হাট ৷ এটি একটি অতিপুরাতন প্রাথমিক শিক্ষালয়ের মাঠে সপ্তাহে দুইদিন বসে৷ অপরাহ্নের পর থেকে বসতে শুরু করে এবং গোধূলী পেরিয়ে যখনি ক্রমশ রাত্রি হতে শুরু করে তখনি এ হাট ভাঙতে থাকে৷দূর দেখে এ পুরাতন জীর্নশীর্ন বিদ্যালয় যেটা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও দন্ডায়মান আছে এবং তার পাশেই রাস্তার যার কিনারে অনেকগুলি দোকান চোখে পরে ৷শহর থেকে বহুযোজন দূরে গ্রামের এ হাট টিতে তরিতরকারী,শাকসবজি,মাছ,দুধ,পানসুপারী পাওয়া যায় এবং কয়েকটি মুড়িমুরকি, পিয়াজু,সিংগারা ও জিলাপির দোকান আসে৷অভাবগ্রস্থ কৃষিনির্ভর এ মানুষগুলি এ হাটের উপর অধিকাংশেই নির্ভরশীল ৷
রাস্তার পাশে যতগুলি দোকান ছিল তার মধ্যে একটা ছিল কলুর(oilman) দোকান৷ হরিহর বাবু নামক এক কলু এ দোকানটি ভাড়া নিয়েছিল৷
দারিদ্রতা গরীব ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে সব সময় দুঃখের সানাইয়ের মত বেজে ওঠে এবং তা যে সামনের আগমনী সময়গুলোতে কিছু নেই সেটারই প্রতীক৷কত যে নববধূর অশ্রু শাড়ির আচলকে সিক্ত করে রাখে,কত বৃদ্ধা অনাহারে শোকের পাথরকে বুকে বেধে রাত্রি যাপন করে তার ইয়াত্তা নাই৷
তাই দারিদ্রতা গ্রামের এ মানুষগুলিকে অভাবের তাড়নায় পৃষ্ঠ করে রূঢ়,একগুয়ে ও লোভী করে তুলছে৷
পার্শবর্তী দুই গ্রাম পরে হরিহরের বাড়ি৷স্ত্রী অনেক আগেই কলেরায় মারা গেছে৷তবে তার একটা ত্রয়োদশবর্ষী শুভ্র কায়ের সুশ্রী দীর্ঘাকৃতির ভোজনপটু কন্যা সুশীলা ছাড়া একুলে ঐকুলে আর কেউ ছিল না৷এই কষ্টার্জিত উপার্জন দিয়ে তাদের দিন কোনভাবে কষ্টে চলে যাচ্ছিল ৷মেয়ের বয়স যত বাড়ছে,তাকে সৎপাত্রে সম্প্রদান করে সমাজের নানান মানুষের কটুক্তি থেকে বেচে থাকার প্রতিক্ষাও তার তত বাড়ছে৷
কলুর বলদ শব্দদুটি আমরা অনেকেই শুনে থাকলেও কলুরা যে কি পরিমান পরিশ্রম করে বা খাটে তা স্বচক্ষে দেখা ছাড়া বলা মুশকিল যদিও কিছুটা ধারনা হত এই হরিহর বাবুকে দেখে থাকলে৷শীর্নকায় শুকনা,পেশীগুলো হাড়ের সাথে শক্তভাবে আবদ্ধ,পেটে চর্বির দেখাতো নাই বরং মনে হয় পিঠের সাথে মিশে গেছে৷কষ্ট পূর্বের তুলনায় অনেক লাঘব হয়েছে কেননা আগে সে গরু দিয়ে ঘানী টানত এখন গরু দুটা বিক্রি করে তেল ভাঙার মেশিন কিনেছে৷সপ্তাহে দুদিন যথা রবি ও বুধবারে এ হাটে আসে এবং সকাল থেকে তেল ভাঙার কাজ শুরু করে৷আশেপাশের গ্রামগুলি ছাড়াও অনেক দূরদূরান্ত থেকে মানুষ সরিষা নিয়ে এখানে আসত,কেউ বা আসত ভ্যানে করে কেউ বা মাথায় করে এবং হাটবারে মধ্যাহ্নে এতগুলি মানুষের সমাগম দেখে মনে হত নগরজীবনের অনন্ত ব্যস্তময় জীবনপ্রবাহ এ গ্রামে দেখা দিয়েছে৷কাজ করতে করতে কখন যে গোধূলী পেরিয়ে রাতের অন্ধকার নেমে আসত সেদিকে হরিহরের কোন দৃষ্টিপাত ছিল না৷হাটের শেষের দিকে তার কাজ শেষ হত এবং কিছু বাজার সদাই নিয়ে পরিশ্রান্ত দেহে একাকি বাড়ি ফিরত৷
প্রায় বছর খানিক হয়ে এল হরিহর এ গ্রামে এসেছে৷ ইতিমধ্যেই অনেকের সাথে খাতির জমেছে কারন প্রাতঃকালের মুড়ি মাখার জন্য এক বা আধা ছটাক তেল তার কাছ থেকে বিনামূল্যেই পাওয়া যায় কারন সে ঐ দিকে একটু উদার ছিল এবং বাকীতে তেল বিক্রিতো আছেই এ জন্যেই হয়তবা এ খাতির টা বেশ জমে উঠেছে৷স্কুল মাঠের এক কোনায় রাস্তার ধারেই রুস্তম মহাজনের দোকান৷হরিহর এর কাছ থেকেই জিনিসপত্র ও বাজার সদাই বাকী নিত ও বছরের শেষে পরিশোধ করত৷
বছর দুয়েক পর, সেইবার বৈশাখে হঠাৎ করেই অতিবৃষ্টিতে বন্যার দেখা দিয়েছে এবং আবাদ বা ফসল সবই বন্যার পানিতে খেয়ে গেছে৷কৃষিনির্ভর এ মানুষগুলির মধ্যে চরম অভাব দেখা দিল এবং সেই সাথে তাদের স্বভাবও নষ্ট হতে লাগল৷ হরিহরের দোকানে এতই বাকী পড়েছে যে ব্যবসা বন্ধ হওয়ায় মত অবস্থায় পরিণত হয়েছে এবং সেও অনেক বাকী করেছে রুস্তমের দোকানে৷নববর্ষ ও সেই সাথে বর্ষার আগমনে দোকানে দোকানে হালখাতার আমেজ দেখা যেতে লাগল এবং হরিহর নিজে গুনে দেখল যে সে চার হাজার টাকার মত জিনিস বাকী নিয়েছে রুস্তম মহাজনের কাছ থেকে যদিও এত টাকা হবার কথা না এবং মহাজন যে তার সরলতার সুযোগ নিয়ে এক টাকার জায়গায় পাচ টাকা লিখে রাখছে সেটা বুঝতে বাকী রইল না৷অভাবের দিনে অনেক কষ্টে সে টাকা যোগার করে একদিন রাত্রে পিতার অনুপস্থিতে তার ছেলের নিকট টাকা বুঝাইয়ে দিয়ে সে বাড়ি চলে গেল ৷কিন্তু পরের হাটেই সে রীতিমত অবাক হল যখন রুস্তম তার কাছে টাকা চাইল এবং সবচেয়ে বড় অবাক হল যখন রুস্তমের ছেলে বিনম্রচিত্তে টাকা নেয়া অস্বীকার করল৷ এই অভাবের দিনে এত বড় মিথ্যা নববর্ষার প্রকান্ড শব্দের বজ্রের মত তার মাথায় পড়ল৷সে দৃঢ় মনোবল নিয়ে বলল- আমিতো গত হাটে টাকা পরিশোধ করেছি৷হেনকালেই বাজখাই গলায় তাকে মিথ্যুক ও ভন্ড আরো কত কি বলে সম্মোধন করে সজোরে একটা কপোলে চপোটঘাত করল৷সে ছলছল নেত্রে সেখান থেকে প্রস্থান করে তার দোকানে দিকে চলে আসল৷সেদিন তার কাজে আর মন বসল না,অভাবের দিনে এতগুলি টাকা জলে যাওয়া ও অপমানের জ্বালায় দগ্ধ হয়ে বাড়ি ফিরে আসল৷
অন্যদিকে বাকীতে তেল ভাঙা ও বিক্রি না করায় হরিহরের বিপরীতে আরেকটি দল দেখা যেতে লাগল৷কেউ গালাগাল করে কেউবা হাত তুলে কেউবা দোকান ও ব্যবসা বা গ্রাম ছেড়ে দেওয়ার জন্যে হুমকি দেয় কারন একটাই সে ভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা৷এদিকে কাজে অনিয়মিত হওয়া ও বাকীর টাকা না তুলতে পারায় তার অবস্থা খুবই খারাপ হতে লাগল৷কোন দিন একবেলা কোনদিন আধাবেলা আবার কোনদিন না খেয়েই দিনযাপন করতে লাগল৷
একদিন এক হাটবারের গোধূলীর লগ্নে একজন বাকীতে তেল নেয়ার জন্য খুবই পীড়াপিড়ি করছে অপর দিকে হরিহর কিছুতেই দিতে উদ্যত হচ্ছিল না এসময় হরিহর তিক্ত ও বিরক্ত হয়ে তাকে বের করে দেয়ার জন্য ধাক্কা দেয় ফলে লোকটির গা টিনেতে একটু কাটা পরে৷মিনিট পাচেকের মধ্যেই রুস্তম সহপাচ সাত জন জড়ো হয়ে হরিহরকে মারতে শুরু করে৷এলোপাথারী কিল ঘুষিতে তার কিছু না হলেও সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছিল মেশিনের চাকা দ্বারা মাথায় আঘাত পাওয়ার ফলে৷মাথায় যখম হওয়ার পড়ে সে অজ্ঞান হয়ে পরে৷সবাই তাকে তার দোকানে ফেলে রেখে চলে যায় এবং সারারাত রক্তক্ষরনের পর হরিহর সেখানেই প্রাণত্যাগ করে৷
পরদিন সকালে গ্রামকে নিস্তদ্ধ মনে হল এবং একটা জনতার ভীড়ে সেই হরিহরের মেয়েকে ডুকড়ে কাদত দেখা গেল আশেপাশে কয়েকটি মহিলা যাদের হয়তবা একটু হলেও মাতৃত্ববোধ আছে তারা নিস্তদ্ধ হয়ে এসব দেখল৷
হরিহর মরার কয়েকদিনের মধ্যেই তার জমিজমা ও বাড়িভিটা সবকিছুই মানুষে দখল করে নিল এবং সুশীলা অন্য বাড়িতে কাজের মেয়ে হিসেবে নিযুক্ত হল কিন্তু এতে সমস্যা না কমে বাড়তেই লাগল কারন সে বাড়ির গৃহিনী ছিল দর্জাল,অত্যাচারী এবং সুশীলার উপর অত্যাচার উৎপীড়ন ও কষ্টের মাত্রা দিনদিন দ্বিগুন হাড়ে বারতেই লাগল৷
মাস ছয়েক পরে সেদিন আশ্বিনের আকাশে ফুটফুটে জ্যোৎস্না উঠেছিল৷সুপ্ত ও কষ্টের জীবনের ক্লান্তি হরন করে দক্ষিণে বাতাস বইছিল৷সেই শান্তির বাতাসে হঠাৎ করেই সুশীলার গভীর রাত্রে ঘুম ভেঙে গেল,চেতনা হয়ে সে দেখে চাদের আলো জানালা ভেদ করে তার মুখের উপর এসে পড়েছে যেন অজানা কোন মায়াবী আলোক শক্তি তাকে কষ্ট ও গ্লানির জগৎ থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য হাতছানি দিচ্ছে৷মূহুর্তেই মনে পরে গেল তার পিতার কথা,দারিদ্রপিরিত কিন্তু শান্তশিষ্ট সুখের সংসারে কিভাবে যেন চিরদুঃখের অনল জ্বলে ওঠল৷কি যেন মনে করে সে ঘর থেকে বের হয়ে পরল৷চন্দ্রালোকের আলোয় গ্রাম্যপথ হেটে হেটে সে বাজারের সেই তার পিতার দোকানটির কাছে আসামাত্র দুই চোখ ঝরে দুই কপোল বয়ে অশ্রু পড়তে লাগল৷পৃথিবীর মায়া মমতা ভালবাসা তাকে ঘিরে ধরার পূর্বেই এই গ্রাম্যবালিকা গ্রামের সেই পথ ধরে হাটতে হাটতে লোকালয়ের ভিতর কোথায় যেন হারিয়ে গেল,,,,,,,

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


