somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আধখানা গজাঃ একটা জানালা, একজন দাদা আর আমার শৈশব...

১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আধখানা গজা
একটা জানালা, একজন দাদা, আর আমার শৈশব...



ক্লাস টুতে পড়ি।

স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় আমার ভীষণ তাড়া থাকত। বাড়ির কাছাকাছি এলেই দৌড় দিতাম। যতটা পথ দৌড়ে আসা যায়, দৌড়ে আসতাম।

স্কুলে বসে আমার প্রায়ই মনে হতো, আমি যখন স্কুলে বসে আছি, তখন বাড়িতে কত কিছু ঘটে যাচ্ছে! কত মানুষ আসছে, কত গল্প হচ্ছে, কত কিছু খাওয়া হচ্ছে। অথচ আমি কিছুই জানতে পারছি না।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে সেইসব অজানা ঘটনা জানার জন্য মনটা ছটফট করত।

আমাদের বাড়ির চারপাশে সীমানা ঘেরা ছিল। বাড়িতে ঢুকতে হতো পাটকাঠির বেড়ার পাশের একটা দরজা দিয়ে। দরজা দিয়ে ঢুকলেই চোখে পড়ত দাদার জানালাটা।

সেদিনও স্কুল থেকে ফিরেই দৌড়ে বাড়িতে ঢুকলাম।
ঢুকেই দেখলাম, দাদা মুখের মধ্যে কী যেন পুরে দিলেন।

জিনিসটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। তবে দাদার মুখ দেখে মনে হলো, খুব মজার কিছু একটা। এমন কিছু, যা খেতে নিশ্চয়ই খুব ভালো।

দাদার কাছে অনেক মানুষ আসতেন। বেশির ভাগই গরিব মানুষ। কেউ কেউ আসার সময় হাতে করে কিছু নিয়ে আসতেন। হয়তো নিজেদের সামর্থ্যের মধ্যে সামান্য কিছু। সেইসব জিনিসের মধ্যে থাকত কটকটা শক্ত টেস্ট বিস্কুট।

আর একটু দামী বিস্কুট বলতে ছিল কাগজের প্যাকেটে আল আমিনের পাইনঅ্যাপেল বিস্কুট। প্যাকেট খুললে ভেতরে কুচিকুচি কাগজ পাওয়া যেত। বিস্কুটগুলো যাতে ভেঙে না যায়, সেজন্য সেই ব্যবস্থা।

কিন্তু দাদা সেদিন যা মুখে পুরলেন, তা কোনো বিস্কুট নয়। আমার মনে হলো, এর চেয়ে লোভনীয় খাবার পৃথিবীতে খুব বেশি নেই।

গজা!

মচমচে গজা। চিনির শিরায় ডোবানো।

দাদার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তিনি বেশ মজা পাচ্ছেন।

আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল।

দাদা আমাকে দেখেছেন। অথচ কিছু বললেন না। একবারও জিজ্ঞেস করলেন না, ‘কুটি ভাই, কী খাইছো? কখন আসলা?’
আর মুখে পুরে দেওয়া সেই খাস্তা গজার কথা তো একেবারেই না!

আমার রাগ হলো। অভিমান হলো।
দাদার একবারও আমার কথা মনে পড়ল না?

আমি মন খারাপ করে ঘরে চলে গেলাম। জামাকাপড় বদলে আবার বেরিয়ে এলাম। তারপর দাদার জানালার আশপাশে ঘুরঘুর করতে লাগলাম।

হয়তো দাদার ভুল হয়েছে।
এখনই ডাকবেন।
বলবেন, ‘কুটি ভাই, এদিকে আসো।’

তারপর কাউকে বলবেন, কুটি ভাইয়ের খাবারটুকু দাও।

কিন্তু দাদা কিছুই বললেন না।

আমি জানালার কাছে ঘুরঘুর করতে করতে আরও রেগে গেলাম। দাদাকে আমার লোভী মনে হলো। এই বুড়ো বয়সেও গজার লোভ সামলাতে পারলেন না! দাদার তো এখন সাগুদানা খাওয়ার বয়স।

গজা খাওয়ার বয়স নাকি!

রাগে-দুঃখে ঘরে ঢুকে বিছানায় শুয়ে পড়লাম।

কিছুক্ষণ পর আম্মা রান্নাঘর থেকে ফিরে এসে জিজ্ঞেস করলেন,

‘কিছু খাইছো?’

আমি মুখ ভার করে বললাম,

‘কী খাবো? সাগুদানা?’

কথাটা বলেই আমার চোখ ভিজে উঠল।

আম্মা কিছুই বুঝতে পারলেন না। আমি কেন কাঁদছি, কেন সাগুদানার কথা বলছি, তার কিছুই তো তিনি জানেন না।

তিনি মিডসেলফ খুলে একটা পিরিচ বের করলেন। পিরিচটা সরপোশ দিয়ে ঢাকা ছিল।

আম্মা বললেন, ‘দেখ তো।’

আমি সরপোশটা তুললাম।

গজা!

সেই মচমচে গজা। চিনির শিরায় ডোবানো।

তবে পুরো গজা নয়। আধখানা।

আম্মা বললেন, ‘তোর দাদা ডেকে দিয়েছে। কে যেন একটা এনেছিল। তোর জন্য অর্ধেক রেখে দিয়েছে।’

আমি আধখানা গজার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

কিছুক্ষণ আগেও এই গজার জন্য আমার কী লোভ! দাদা কীভাবে একা একা খেয়ে ফেললেন, সেই রাগে আমার বুক ভরে ছিল। আমি ভেবেছিলাম, দাদার নিজের খাবারের লোভ আছে, আমার কথা মনে নেই।

অথচ দাদা আমার জন্য রেখে দিয়েছেন।

আমি জানতাম না।

দাদা আমাকে বলেননি। আমি নিজেও জিজ্ঞেস করিনি। মাঝখানে শুধু একটা জানালা ছিল, আর ছিল আমার ছোট্ট পৃথিবীর একরাশ অভিমান।

সেই অভিমানের ভেতরেই দাদা আমার জন্য আধখানা গজা তুলে রেখেছিলেন।

আমি আর গজাটা খেতে পারলাম কি না, সেই কথা এখন আর মনে নেই। মনে নেই, চিনির শিরায় ডোবানো গজাটা মুখে দিলে কেমন মচমচ শব্দ হতো, কিংবা তার মিষ্টি স্বাদ কতক্ষণ জিভে লেগে থাকত।

শুধু মনে আছে, আধখানা গজার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার ভেতরের কোথায় যেন কী একটা বদলে গিয়েছিল।

যে খাবারের জন্য এতক্ষণ আমার এত লোভ, সেই খাবারটাই হঠাৎ কেমন যেন অন্য রকম হয়ে গেল।

ক্ষুধা ছিল। লোভও ছিল।

কিন্তু সেসব ছাপিয়ে অন্য একটা অনুভূতি এসে দাঁড়িয়েছিল সামনে।

সেই অনুভূতির নাম তখন জানতাম না।

ক্লাস টুতে পড়া একটা ছেলে কী করে জানবে, ভালোবাসারও একটা আলাদা স্বাদ আছে? যে স্বাদ চিনির শিরায় ডোবানো গজার চেয়েও মিষ্টি, অথচ মুখে দিলেই গলে যায় না। বহু বছর পরেও বুকের ভেতর কোথাও লেগে থাকে।

আজ দাদার সেই জানালাটা আর নেই।

দাদাও নেই।

কিন্তু মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, শৈশবের দিকে তাকানোর জন্য দাদা আমাকে একটা অদৃশ্য জানালা দিয়ে গেছেন। সেই জানালার পাশে দাঁড়ালে আজও দেখতে পাই, একটা ছোট্ট ছেলে বাড়িতে ঢুকেই দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। দাদা কিছু একটা খাচ্ছেন। ছেলেটার মন খারাপ হচ্ছে। সে অপেক্ষা করছে, দাদা একবার ডাকবেন।

দাদা ডাকছেন না।

ছেলেটা রাগ করে চলে যাচ্ছে।

তারপর একসময় ফিরে আসছে আধখানা গজার কাছে।

সেই ছেলেটা আর কেউ নয়।

আমি।

কখনো কখনো ভাবি, সেদিন যদি দাদা আমাকে দেখেই বলতেন, ‘কুটি ভাই, তোমার জন্য গজা রেখেছি’, তাহলে কি এই স্মৃতিটা এত বছর আমার ভেতরে বেঁচে থাকত?

জানি না।

শুধু জানি, দাদার কাছে সেদিন আমি আধখানা গজা পেয়েছিলাম। আর তার বিনিময়ে দাদা আমাকে এমন একটা স্মৃতি দিয়ে গেছেন, যার স্বাদ আজও ফুরায়নি।

দাদা, আপনার জানালাটা আর নেই। আপনার কাছে আসা মানুষগুলোও হয়তো একে একে হারিয়ে গেছেন সময়ের ভেতর।

কিন্তু তোমার সেই কুটি ভাই আজও মাঝে মাঝে শৈশবে ফিরে যায়।

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।

আর মনে মনে ভাবে, আহা, দাদা যদি আর একবার ডাকতেন!

বলতেন—

‘কুটি ভাই, আসো। তোমার জন্য গজা রাখছি।’


— স্বপ্নবাজ সৌরভ
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:১৭
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এ আগুন আপনাদেরও একদিন গ্রাস করবে।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১৩


আজ যারা ধর্ম, জাতীয়তা ইত্যাদির ভিত্তিতে ও তাঁর কথিত “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা”, “মুসলিম বিদ্বেষী” সহ নানা মিথ্যা অভিযোগ আর অজুহাতে রবীন্দ্রনাথ বিদ্বেষের ব্যাপারে চূড়ান্ত বাড়াবাড়ি ও ইতরামি দেখিয়ে বেড়াচ্ছে তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাটায় - পুটায় ঘষাঘষি, মাঝখানে মরিচদের জীবন শেষ?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩১

আওয়ামী তথা ভারতীয়দের নমস্য রবী বাবুর চিত্রে কালিমা লেপন।
দুই দিন পরে, আওয়ামী বিরোধীদের 'রবী' ইউনুস সাহেবকে গালাগালি!!!
এ যেন পাটাপুটায় ঘষাঘষি করে অভাগা মরিচদের জীবন শেষ করার চেষ্টা?
কিন্তু, রবী বাবু কিংবা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতা প্রেমিকদের কলমে সময়ের বিবেক : বিশ্ব কবি রবিন্দ্র নাথ ঠাকুরের গ্রাফিতেতে কালী লেপন প্রসঙ্গ

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৩৪


যে কবির গানে ভোরের আকাশ জেগে ওঠে প্রতিদিন
যাঁর সুরে আজও অশ্রু ঝরে হাসে হৃদয় রঙিন
সেই রবীন্দ্রনাথের ছবির বুকে কালি মাখায় যারা
তারা কি জানে তাঁরই গানে বাঙালির প্রাণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাসূল (সা.), আহলে বাইত ও সাহাবায়ে কেরামের (রা.) অনুচিত কাজের সমালোচনা ও সমর্থন করা যাবে না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৪১




সূরাঃ ৮ আনফাল, ৬৭ থেকে ৬৯ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬৭।দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবির উচিত নয়। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর। আল্লাহ চান... ...বাকিটুকু পড়ুন

রঠার মুসলিম বিদ্বেষ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:১৮



রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর সংক্ষেপে রঠা এর ছোট গল্প "রীতিমত নভেল" এ রঠা মুসলমান শব্দের সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করেছেন ‘যবন’। যবন অর্থ অসভ্য, ম্লেচ্ছ, অপবিত্র, বর্বর জাতি, যেকোনো বিদেশি ইত্যাদি ইত্যাদি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×