somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কেয়া — এক অসমাপ্ত ভালোবাসা ।

২৯ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ঢাকার আকাশে সেদিন হালকা বৃষ্টি ছিল।
আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো গেটের সামনে এক কফির দোকানে একা, হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফি সাথে একটা সিগারেট , চোখে ক্লান্তি আর বুকভরা বহু বছরের নীরবতা।
চারপাশে ভেজা বাতাস, কৃষ্ণচূড়ার লাল পাপড়ি আর স্মৃতির ভার।
জীবনে অনেক কিছু বদলে গেছে।
বন্ধুরা হারিয়ে গেছে সময়ের ভিড়ে।
স্বপ্নগুলো কর্পোরেট অফিসের ফাইলে বন্দী।
কিন্তু একটা নাম আজও বদলায়নি— কেয়া।

কেয়াকে প্রথম যেদিন দেখেছিলাম, সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে বিকেলের আলো পড়েছিল।
সাদা সালোয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে দেখে মনে হয়েছিল, কেউ যেন শান্ত বিকেলকে মানুষের রূপ দিয়েছে।
তার চোখদুটো ছিল গভীর নদীর মতো শান্ত।
চোখে কোনো অহংকার ছিল না, ছিল অদ্ভুত এক কোমলতা।
তার হাসি এত নরম ছিল যে, মনে হতো পৃথিবীর সব রাগ গলে যেতে পারে।
কেয়া কথা বলত খুব আস্তে, যেন শব্দ দিয়েও কাউকে আঘাত করতে চায় না।
তার কণ্ঠে ছিল মায়া, ঠিক রবীন্দ্রসঙ্গীতের নরম সুরের মতো।
চুলগুলো বাতাসে এলোমেলো হলে মনে হতো বৃষ্টির ভেতর কালো মেঘ ভেসে যাচ্ছে।
তার মুখে খুব সাধারণ এক সৌন্দর্য ছিল, কিন্তু সেই সাধারণত্বই তাকে অসাধারণ করে তুলেছিল।
সে কখনো জোরে হাসত না, শুধু ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটত।
আর সেই হাসি দেখলে আমার বুকের ভেতর অদ্ভুত ঝড় উঠত।
কেয়া রাগ করলেও চোখে মায়া লেগে থাকত।
সে ক্যাম্পাসের কুকুরদের খাবার দিত, পথের ছোট বাচ্চাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিত।
কেউ মন খারাপ করে থাকলে সে চুপচাপ পাশে বসে থাকত।
তার ভেতরে ছিল এক অদ্ভুত শান্তি, যেন পৃথিবীর সব যুদ্ধের মাঝেও সে শান্তির ভাষা জানে।
আমি বহু সুন্দর মানুষ দেখেছি, কিন্তু কেয়ার মতো সুন্দর আত্মা কখনো দেখিনি।
তার সৌন্দর্য শুধু মুখে ছিল না, ছিল আচরণে, দৃষ্টিতে, শব্দে, নীরবতায়।
মাঝে মাঝে মনে হতো, মানুষ নয়—সে যেন প্রার্থনা।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দিনগুলো ছিল আমাদের ছোট্ট এক পৃথিবী।
প্রতিদিন সকালে আমি শুধু তাকে একবার দেখার জন্য ক্লাসে যেতাম।
ক্যান্টিনের শেষ বেঞ্চটা ছিল আমাদের প্রিয় জায়গা।
দুজন মিলে এক কাপ চা ভাগাভাগি করে খেতাম।
বৃষ্টির দিনে কেয়া জানালার পাশে বসে থাকত আর আমি চুপচাপ তাকে দেখতাম।
সে খাতার কোণায় ছোট ছোট ফুল আঁকত।
আমি মজা করে বলতাম, “তুমি পড়াশোনার চেয়ে শিল্পী বেশি।”
সে হেসে বলত, “তোমাকে দেখলেই আমাকে আঁকতে ইচ্ছা করে।”

আমরা ক্লাস ফাঁকি দিয়ে লাইব্রেরির পেছনের করিডোরে হাঁটতাম।
কখনো বিকেলে রিকশায় পুরো ঢাকা শহর ঘুরতাম।
কেয়া খুব পছন্দ করত বৃষ্টিভেজা রাস্তা আর ফুচকা।
আমি ইচ্ছে করেই ধীরে হাঁটতাম, যেন তার সাথে সময়টা দীর্ঘ হয়।
শীতের সকালে সে আমার জন্য গরম কফি এনে দিত, ছোট্ট ফ্লাক্সে করে।
পরীক্ষার আগে রাতে ফোনে পড়তে পড়তে কখন যে গল্প শুরু হয়ে যেত বুঝতেই পারতাম না।
আমি বলতাম, “তুমি না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়টা এত সুন্দর লাগত না।”
কেয়া হেসে বলত, “বিশ্ববিদ্যালয় সুন্দর না, তুমি আছো বলে সব সুন্দর লাগে।”
একদিন বৃষ্টির মধ্যে আমরা পুরো ক্যাম্পাস হেঁটেছিলাম।
কেয়ার চুল ভিজে মুখের ওপর পড়ে ছিল। আহ কি অপূর্বই না লাগছিল তাকে।
আমি সে দিন বলেছিল, “জানো, আমি চাই এই সময়টা কখনো শেষ না হোক।”
কেয়া কিছু বলিনি তখন।
কারণ হয়েত সে জানত, সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলোই সবচেয়ে দ্রুত শেষ হয়ে যায়।

আমরা একসাথে বইমেলায় গিয়েছিলাম।
কেয়া কবিতার বই খুব পছন্দ করত।
সে প্রতিটা বইয়ের পাতার গন্ধ নিত।
আমি তাকে দেখতাম আর মনে হতো, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হলো—একটা শান্ত মেয়ের বইয়ের পাতায় হারিয়ে যাওয়া।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদে বসে আমরা সূর্যাস্ত দেখেছি।
কেয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে বলত, “মানুষ কি সত্যিই সারাজীবন এক মানুষকে ভালোবাসতে পারে?”
আমি তখনও উত্তর দিইনি।
কারণ আমি ভয় পেতাম, সত্যি বললে হয়তো সে বুঝে যাবে আমি তাকে কতটা ভালোবাসি।

একদিন সে আমার হাতে একটা নীল কলম দিয়েছিল।
বলেছিল, “যখন আমাকে মনে পড়বে, এটা দিয়ে লিখবে।”
আজও সেই কলমটা আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি।
আমাদের ভালোবাসা খুব চিৎকার করে জন্ম নেয়নি।
ধীরে ধীরে, নীরবে, একে অপরের অভ্যাস হয়ে উঠেছিলাম আমরা।
তার পাশে বসলে মনে হতো পৃথিবীতে আর কিছু প্রয়োজন নেই।
কেয়া আমার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ অনুভূতি ছিল।
আমি তার চোখে নিজের ভবিষ্যৎ দেখতাম।
আর সে হয়েত আমার নীরবতাও বুঝে ফেলত।

কিন্তু সময় সব গল্প পূর্ণ হতে দেয় না।
বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হওয়ার কিছুদিন পর কেয়ার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়।
তার ফ্যামেলি ছিল খুবই রক্ষনশীল আর আমি তখন বেকার, চাকরি খুজছি,
আমি কেয়াকে বলছিলাম, চল আমরা পালিয়ে দূর বহু দূরে চলে যাই, কিন্তু সে নিশ্চুপ ছিল।
এক সন্ধ্যায় কেয়া খুব শান্ত গলায় আমাকে বলেছিল,
“সব ভালোবাসা একসাথে থাকার জন্য জন্মায় না।”
আমি সেদিন হাসার চেষ্টা করেছিলাম।
কিন্তু ভেতরে পুরো পৃথিবী ভেঙে পড়ছিল।

অনেক বছর পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রিইউনিয়ন,
আমি বুকের এক কোণে একটু আশা ছিল, কেয়া আসবে , তাকে দুচোখ ভরে দূর থেকে দেখব মন ভোরে।
কেয়া ঠিকিই আসল, আবার কেয়ার সাথে দেখা হল।
নীল শাড়িতে তাকে দেখে মনে হয়েছিল, সময় শুধু বয়স বাড়িয়েছে, সৌন্দর্য কমায় না।
তার চোখে এখনো সেই নরম মায়া ছিল।
শুধু কিছু ক্লান্তি জমে ছিল গভীরে।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম।
কারণ কিছু মানুষকে দেখলে ভাষা হারিয়ে যায়।

“কেমন আছো?”
কেয়া ধীরে জিজ্ঞেস করল।
আমি মৃদু হাসলাম।
“ভালো থাকার মুখোশ পড়ে বেচে আছি।”
কেয়া তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
“তুমি এখনো আগের মতোই কথা বলো।”
নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে আমি কেয়াকে বললাম চল আমরা আবার পুরোনো ক্যাম্পাসে হাঁটি।
তারপর পুরোনো ক্যান্টিনে বসে চা খেলাম।
কেউই অতীত নিয়ে কথা বলিনি।
কারণ কিছু স্মৃতি স্পর্শ করলে মানুষ ভেঙে যায়।

রাত বাড়ছিল।
ঢাকার আকাশে বৃষ্টি নামছিল ধীরে ধীরে।
গাড়ির জানালার পাশে বসে কেয়া হঠাৎ বলল,
“জানো … জীবনে সবাই সংসার পায়, কিন্তু সবাই ভালোবাসা পায় না।”
আমি চুপ করে রইলাম।
কারণ, এই একটা কথার ভেতরে বহু বছরের কান্না লুকিয়ে আছে।
বিদায়ের আগে শেষে কেয়া ধীরে বলেছিল,
“যদি আবার কোনো জন্ম হয়… তখন আমাকে আর হারিয়ে ফেলো না।”
আমি কিছু বলতে পারিনি।
কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে কষ্টের অনুভূতি হলো—
যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো, তাকে ঠিক সময়টাতে না পাওয়া।
________________________________________
কেয়া চলে যায়।
রাস্তার আলো ভেজা বৃষ্টির ওপর পড়ে ঝাপসা হয়ে যায়।
আমি দাঁড়িয়ে থাকি একলা দীর্ঘক্ষণ।
তারপর , একটি সিগারেট টান দিয়ে , খুব ধীরে চোখ বন্ধ করি, কারণ কিছু ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না—
শুধু মানুষগুলো একসাথে থাকতে পারে না।
আজও বৃষ্টি নামলে আমি কেয়াকে মনে করি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর, কফির কাপ, ভেজা চুল, নরম হাসি—সব মনে পড়ে।
আর বুঝতে পারি—
কিছু মানুষ জীবনে আসে না থাকার জন্য।
তারা আসে মানুষকে ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ শেখানোর জন্য।
আর আমার জীবনের সেই অর্থের নাম— কেয়া।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৪৬
৫টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে যে-সব সাবেক চ্যাম্পিয়নদের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবার সম্ভাবনা একেবারেই নাই

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৮ শে জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২

এ দলটি ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৮২ ও ২০০৬ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। ২০১৪ সালে তারা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। ২০১৮ ও ২০২২ সালে তারা মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আহা! ছবি।

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ২৮ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:০০

কত দিন হয়ে গেলো....................


এ মাসেতো একটাও পোস্ট দেওয়া হলো না........................


ইদে গ্রামের বাড়ি গিয়ে কিছু ছবি তুলেছিলাম।







আজকের ছবি ব্লগে থাকছে সেই ছবিগুলো।








---------------------------------------------------
































---------------------------------------------------------------



















------------------------------------------------------------------






















... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৩

মেট্রোরেল পুরো বাংলাদেশের জন্য শান্তির বিষয়।
শুধু মেট্রোরেল না পদ্মাসেতুও। দারুণ এক কাজ হয়েছে। আগে মতিঝিল থেকে মিরপুর বা উত্তরা যেতে খবর হয়ে যেতো। তিন ঘন্টার বেশি সময় লাগতো। এখন মুহুর্তেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারণে অকারণে ছবি

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ২৮ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৬

আমি ছবি তুলি। পরে সেগুলো দেখি। বেশ ভালো লাগে। ফোনের স্টোরেজ এ আজ দেখলাম মোট ছবি ৬৮৯৩ টি। ব্লগে কখনোই ছবি দিয়ে লেখা হয়নি। আজ মাইদুল ভাইয়ের লেখা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ বাবার প্রত্যাবর্তন

লিখেছেন সামিয়া, ২৯ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:০৩



একটা মাস হয়ে গেল।
ইউনাইটেড হাসপাতালের সিসিইউর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলেছে রিপা। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে, নার্সরা ডিউটি বদলাচ্ছে, ডাক্তাররা আসছেন, যাচ্ছেন। শুধু একটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×