জুলাই মিউজিয়ামঃ আলোর নিচে অন্ধকার!
জুলাই মিউজিয়ামে ঢুকলে প্রথমেই যে অনুভূতিটি হৃদয়কে স্পর্শ করে, তা হলো- এটা শুধু একটি জাদুঘর নয়; এটা একটি জাতির রক্তাক্ত স্মৃতির সাক্ষ্য।
পরিকল্পনা থেকে নির্মাণ- প্রতিটি পরতে ফুটে উঠেছে ফ্যাসিবাদী শাসনের নির্যাতন, নিপীড়ন, গুম, হত্যাকাণ্ড এবং মানুষের প্রতিরোধের ইতিহাস। Mostofa Sarwar Farooki ভাইয়ের সৃজনশীলতায় ঘটনাগুলো শুধু প্রদর্শিত হয়নি, অনেকটাই যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কাজ আর কেউ করেছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে।
আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায়, শুধু জুলাই মিউজিয়ামের এই অসাধারণ সৃষ্টির জন্যই মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী এবং তাঁর টিমের যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রয়েছে। স্বাধীনতা পদক কিংবা একুশে পদকের মতো রাষ্ট্রীয় সম্মান নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো- পদক তো দূরের কথা, প্রাপ্য স্বীকৃতিটুকুও যেন তাঁদের কপালে জোটেনি।
আর এখানেই শুরু হয় "আলোর নিচের অন্ধকার"!
যাঁরা গত দুই বছর দিন-রাত পরিশ্রম করে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন করেছেন, তাঁদের কারোরই এখন পর্যন্ত নিয়োগপত্র নেই। তাঁদের ভবিষ্যৎ কী- তাঁরা আদৌ স্থায়ীভাবে কাজ করার সুযোগ পাবেন কি না- তারও নিশ্চয়তা নেই।
এত বড় একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান অথচ নেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত গাইড। স্কাউট, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিংবা স্বেচ্ছাসেবকদের দিয়ে কোনোভাবে দর্শনার্থীদের সামলানো হচ্ছে।
আরও বিস্ময়কর- এত বিশাল প্রাঙ্গণ, এত বড় স্থাপনা, এত দর্শনার্থী; অথচ স্থায়ী পরিচ্ছন্নতা কর্মীও নেই। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই জাতীয় স্থাপনার বিভিন্ন জায়গায় ময়লা-আবর্জনা জমে থাকার দৃশ্য সত্যিই হতাশাজনক!
সাবেক গণভবন, বর্তমান জুলাই মিউজিয়ামের বিশাল পরিসর- প্রায় ১৭.৬৮ একর জমি, মূল ভবনের প্রায় ৫৭ হাজার বর্গফুট আয়তন, খোলা মাঠ, পার্কিং, লেক, রেস্টুরেন্ট, নিরাপত্তা স্থাপনা- সব মিলিয়ে এটি নিঃসন্দেহে একটি বিশাল জাতীয় সম্পদ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- এত বড় একটি জাতীয় স্মৃতি প্রতিষ্ঠানের যথাযথ ব্যবস্থাপনা কোথায়?
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, জুলাই মিউজিয়ামটি যেন সংশ্লিষ্টদের কাছে একটি 'গলার কাঁটা' হয়ে আছে- যেন তৈরি হয়ে গেছে, এখন কোনোভাবে চালিয়ে রাখলেই দায়িত্ব শেষ! আর 'শেষ হয়ে গেলে'তো ল্যাঠা চুকে যেতো!
জুলাই কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ঘটনা নয়।
জুলাই মানে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে অসংখ্য মানুষের রক্ত।
জুলাই মানে অগণিত পরিবারের কান্না।
জুলাই মানে গুম, হত্যা, নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটি জাতির পুনর্জন্মের ইতিহাস।
জুলাই মানে অসংখ্য প্রাণের আত্মত্যাগ এবং প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষের আহত হওয়ার নির্মম স্মৃতি।
★★এই রক্তাক্ত ইতিহাসের স্মারক যদি অবহেলায় পড়ে থাকে, যদি এর স্রষ্টা ও কর্মীদের প্রাপ্য মর্যাদা না দেওয়া হয়, যদি জাতীয় স্মৃতিকে সংরক্ষণের পরিবর্তে প্রশাসনিক উদাসীনতায় নষ্ট হতে দেওয়া হয়- তাহলে সেটা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনা নয়; এটি ইতিহাসের প্রতি অবমাননা।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাই বিনীত কিন্তু দৃঢ় আহ্বান-
★জুলাই মিউজিয়ামকে বোঝা হিসেবে নয়, জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে দেখুন।
★যাঁরা এটা নির্মাণ করেছেন তাঁদের মর্যাদা ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিন।
★প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ করুন।
★পরিচ্ছন্নতা ও দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করুন।
★সর্বপরি এই জাতীয় স্মৃতিকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব দিয়ে পরিচালনা করুন।
বিস্তারিত অনেক কিছুই এখন লিখতে চাই না। কিন্তু প্রত্যাশিত পরিবর্তন যদি না আসে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই- কার স্বার্থে জুলাইয়ের স্মৃতিকে এভাবে অবহেলা করা হচ্ছে?
মনে রাখতে হবে-
★জুলাইয়ের রক্তের কাছে সরকার ও রাষ্ট্রের দায় আছে।
★শহীদদের পরিবারের কাছে দায় আছে।
★আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করা মানুষগুলোর কাছে দায় আছে।
★আগামী প্রজন্মের কাছেও দায় আছে।
জুলাইকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। জুলাইয়ের স্মৃতি নিয়ে কোনো আপস নেই।
কারণ-
রক্ত দিয়ে অর্জিত ইতিহাসকে অবহেলায় মুছে ফেলা যায় না।
PMO Bangladesh - প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
Ministry of Cultural Affairs

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


