সম্ভবত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবেই তারেক রহমান ভারতে যাচ্ছেন, যদিও এখন পর্যন্ত সফরটি চূড়ান্ত হয়নি। বাংলাদেশের সম্মতি আদায়- এক্ষেত্রে বাংলাদেশের 'কচিকাঁচা কুটনৈতিকদের' হারিয়ে ভারতীয় 'প্রবীণ কুটনৈতিকরা' জয়ী হয়েছে।
শেখ হাসিনার আমলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল, সেটা ছিল গভীরভাবে অসম। দিল্লির ইচ্ছা, অনিচ্ছা কিংবা নির্দেশই পালন করাই ছিলো ঢাকার নীতিনির্ধারণের অন্যতম প্রধান বিবেজ্য।
ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু বন্ধুত্ব আর নির্ভরশীলতা এক জিনিস নয়; সহযোগিতা আর অধীনতা এক জিনিস নয়।
শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে ভারত যেসব কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে, তার বিনিময়ে বাংলাদেশ সমপরিমাণ দূরের কথা, যতসামান্য পরিমাণও সুবিধা পেয়েছে কি না- এই প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও নিরাপত্তার বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও হতাশা জমেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সেই পুরোনো সমীকরণ ভেঙে গেছে।
বাংলাদেশ এখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে। জাতীয় সংসদে নির্বাচিত তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে জনগণের প্রত্যাশা, জাতীয় স্বার্থ এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা- এই তিনটি বিষয় সামনে রেখেই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। আজকের বাংলাদেশ সেই জায়গায় নেই।
শেখ হাসিনা আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের যে একতরফা সুবিধাভিত্তিক ধারণা তৈরি হয়েছিল, সেটা যদি সত্যিই দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মনে থেকে থাকে, তাহলে সেটা তাদের জন্য বড় ভুল হিসাব হবে।
বাংলাদেশ কারও শত্রু হতে চায় না। যদিও ভারত বাংলাদেশের বন্ধু নয়, ভারতও আমাদের শত্রু নয়। আমরা চাই স্থিতিশীল, বন্ধুত্বপূর্ণ, সহযোগিতামূলক এবং পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্ক হতে হবে সমমর্যাদার।
যে বাংলাদেশ একসময় ভারতের কাছে অনেক কিছু চেয়েও প্রত্যাশিত সাড়া পায়নি- সেই বাংলাদেশ যদি আজ নিজের স্বার্থ ও মর্যাদাকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাকে বৈরিতা বলা যাবে না; এটাই হবে স্বাভাবিক সার্বভৌম রাষ্ট্রের আচরণ। আর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বুমেরাং হয় তখনই- যখন কোনো রাষ্ট্র তার প্রতিবেশীকে চিরকাল নিজের প্রভাববলয়ের অংশ মনে করে।
বাংলাদেশ ভারতের প্রতিবেশী- কারও পরিশিষ্ট নয়, কারও আশ্রিত নয়। বন্ধুত্ব থাকবে, সহযোগিতা থাকবে, প্রয়োজন হলে কঠিন আলোচনাও হবে- কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে।
এটাই নতুন বাস্তবতা, নতুন বন্দোবস্ত।
আমার মতামত হলো- তারেক রহমানের ভারত সফর হলে সেটা বাংলাদেশের জন্য আত্মসমর্পণের সফরও হওয়া উচিত নয়, আবার ভারতবিরোধী শক্তি প্রদর্শনের সফরও হওয়া উচিত নয়। এটা হওয়া উচিত সমমর্যাদার দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনর্গঠনের সফর।
আমার মনে হয়, তারেক রহমানের ভারত সফরের প্রধান দৃষ্টি থাকবে- তিনি কী নিয়ে দিল্লি যাবেন এবং কী নিয়ে ফিরবেন।
সৌজন্য, হাসিমুখ, করমর্দন- এগুলো কূটনীতির অংশ। কিন্তু সফরের মূল্যায়ন হবে বাংলাদেশ কী পেল, কীভাবে পেল এবং কোন মর্যাদায় পেল- সেটাই।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভারতকে শত্রু বানানো বাংলাদেশের স্বার্থে নয়; আবার ভারতকে অভিভাবক বানানোও নয়।
বন্ধুত্ব চাই- কিন্তু মাথা নত করে নয়।
সহযোগিতা চাই- কিন্তু আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে নয়।
সম্পর্ক চাই- কিন্তু সমমর্যাদার ভিত্তিতে।
"সবার আগে বাংলাদেশ"- এটাই হতে পারে তারেক রহমানের ভারত সফরের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



