ছেলে বেলা থেকেই, সবসময় একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি। আমার সহপাঠিদের মধ্যে একেবারেই শুরুতে যাকে আমার সবচেয়ে অপছন্দ হয়, সময়ের সাথে সাথে সে আমার সবচেয়ে কাছের মানুষদের মধ্য একজন হয়ে যায়। এটা কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দিতে পারছিনা, কারন বার বার আমার সাথে এমনটাই হয়েছে। আর যতবারই এমন ঘটনা ঘটে ততবার আমার দিপু নাম্বার টু এর কথা মনে পড়ে যায়। নোংরা ময়লা দেঁতো মাস্তান প্রকৃতির ছেলেটার সাথে দিপুর অসাধারন বন্ধুত্ব, যার শুরুটা হয়েছিল অপছন্দ দিয়ে। দিপু ছিল একটা কিশোর চরিত্র। তাই ব্যাপারটা একেবারেই অস্বাভাবিক নয়। তবে কৈশোর উত্তীর্ন বয়সেও এমন ঘটনা আমাকে আজো মনে মনে অনেক হাসায়। ভাবতে ভাবতে হাসতে থাকি। আর হাসতে হাসতে কিছুটা লজ্জাও লাগে। [লজ্জার ইমো হবে]
ইউনিতে মাত্র ভর্তি হয়েছি। এক মাসও হয়নি। ক্লাস করি, বাসায় আসি, সারাদিন মন খারাপ করে ঘুরে বেড়াই। কোনো পরিচিত মানুষজন নেই। বন্ধুরা সব অনেক অনেক দূরে। আর আমি একা। খুব খারাপ সময় যাচ্ছিল তখন। ইউনির বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছি বাসস্টপে। জায়গার নাম লন্ডনী রোড। [না না, আমি লন্ডনের কোনো ইউনিতে পড়তাম না। সিলেটের শাহ্ জালাল ইউনিতে পড়তাম। সিলেট বলে কথা। লন্ডনের নামে একটা রাস্তা থাকতেই পারে নাকি?
“দেখেছিস দোস্ত ঈশিতা এইটা কি করলো?”
“ঈশিতা কে?”
“আরে এ সেকশনে পড়ে, তুই চিনিস না?”
“না চিনি না। কি করেছে সে?”
“আরে নবীন বরনে আমি যেই গান গাইব বলে সিলেক্ট করেছি সে ওই গানটাই নাকি গাইবে। মেজাজ খারাপ হয় না বল?”
“হমম্। কোন গান?”
“বেলা বোস। অঞ্জনের। আচ্ছা তুই বল, বেলা বোস গানটা একটা মেয়ে কেন গাইবে?”
“তাতো বটেই। এটা একটা ছেলেরই গাওয়া উচিত।”
কথা বলেই যাচ্ছে, বলেই যাছে। আর আমি বার বার ঘড়ি দেখছি কখন বাস আসবে।
“তুই কোন কলেজে পড়াশুনা করেছিস?”
“চিটাগাং কলেজ।”
“ও তোর বাড়ি চট্টগ্রাম। ভাল। আমি কোনোদিন চটগ্রাম যাইনি।”
আমি চুপ করে রইলাম। তারপর মনে হলো ভদ্রতা বসত একটা পালটা প্রশ্ন করা উচিত
“তোমার কলেজ কোনটা?”
“আরে, তুই জানিস না আমি কোন কলেজে পড়ি?”
“নাহ্ জানি না। এইটা জানার কি কোনো কারন আছে? তুমিতো আমাকে বলোনি কখনো।”
“আরে তুই দেখিস না আমি কাদের সাথে চলাফেরা করি?”
“কাদের সাথে?”
“সজীব, সেলিম, আশেক ব্লা ব্লা ব্লা”
“ওওও। তা ওরা কোন কলেজের?”
এইবার সে খুব কষ্ট পেল মনে হলো। মুখ অন্ধকার করে বললো
“এন,ডি,সি”
“এন,ডি,সি মানে?”(মফস্বলের ছেলে আমি। ইউনির নাম সংক্ষেপিকরন জানতাম। কলেজেরটা জানা ছিল না। আশা করি সবাই এই অপরাধ ক্ষমা করবেন।)
চুড়ান্ত হতাশা ছড়িয়ে পড়ল ছেলেটার চোখে মুখে।
“নটরডেম কলেজ।”
“ওওও।” মনে মনে বলি আমিতো ভেবেছিলাম নোয়াখালী ডিগ্রি কলেজ
এই রকম একটা পরিচয়ের পরও সময়টা মনে হয় অনেক দ্রুত এগোতে থাকলো। ছেলেটার নাম আ,স,ম হারুনুর রশিদ। খলিফার নামে নাম হলেও চলাফেরা খলিফার মতন সাদাসিদা ছিল না। ভয়ঙ্কর বৃষ্টির দিনে যেখানে সবাই পারলে স্পঞ্জের স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে আসে সেখানে সে অলমোস্ট স্যুটেড বুটেড হয়ে আসে। কেউ ওর কাধেঁ হাত রাখতে পারত না। আর ভুলে রাখলেও এক ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে নিত সে। শার্টের ভাজঁটা যে নষ্ট হয়ে গেল বলে। সব কিছুর সাথে বিকৃত উচ্চারনে রুবি রায় গান ফ্রী। ওর এসব ব্যাপার নিয়ে মজা করেই দিন কাটছিল। একদিন সে তার সমস্ত বাক্স প্যাটরা নিয়ে আমাদের বাসায় চলে এল। মুখে সেই বিখ্যাত চিকচিকে হাসি ধরে রেখে বললো
“তোদের সাথে থাকবো আজ থেকে।”
খুবই ফুর্তিবাজ ছেলে আমাদের হারুন। আমি অনেক ভালো করে ওকে অবর্জাভ করে দেখলাম, সবই ঠিক আছে, শুধু হারুন নামটা ওর ইমেজের সাথে ঠিক যায় না। ঠিক করলাম ওর নামটা চেঞ্জ করতে হবে। খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। হ্যারি পর্টার তখন খুব জনপ্রিয় ছবি। প্রথম যেদিন ওকে হ্যারি নাম দিলাম তার পর থেকে কেউ ওর আসল নাম ধরে ডাকেনি। এই নামেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পার করে দিল সে। হারুন থেকে আমাদের হ্যারি।
(চলবে)
ছবিঃ চার বছরের অনার্স কোর্সের পঞ্চম বর্ষ পূর্তির আনন্দে চা পার্টি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



