আরাফাত উত্তর বঙ্গের ছেলে। উত্তর বঙ্গে যদি কেউ গিয়ে থাকেন, তাহলে নিশ্চয় জানেন, যতদুর দৃষ্টি যায় সমতল আর সমতল ভূমি। তাই উত্তর বঙ্গের কেউ একটা ছোট খাট টিলা দেখলেই চিৎকার দিয়ে উঠে, ওরে দেখ দেখ কত্ত উচুতে মাটি থেকে, একেবারে আকাশ ছুই ছুই। তাই স্বাভাবিক ভাবেই এরা যখন চট্টগ্রাম কিংবা সিলেট যায়, এদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। আরাফাত শুরুর দিকে কিছু হলেই দৌড় দিয়ে পাহাড়ে উঠে যেত। মন ভালো হইলে মন ভালো তাই, আর মন খারাপ হলে মন খারাপ তাই। কারনের অভাব হতো না। আমি চট্টগ্রামের ছেলে, তাই পাহাড় ঠিক ওর মতন করে আমাকে টানে না। তাও আমি যেতাম। ওর শিশুসুলভ আনন্দ দেখে মজা লাগতো। একবার, মাসের একেবারে শেষ দিকে, হাতে টাকা পয়সা একেবারেই নাই। ওর হঠাৎ সখ হলো পর্যটন বলে একটা জায়গা আছে সেখানে বেরাতে যাবে। জায়গাটা আসলে কিচ্ছু নাই, একটা পাহাড়ে ঢুক্তে টাকা দিতে হয় কারন সেখানে বসার জন্য কয়েকটা সিট দেয়া আছে। আর কিচ্ছু নাই, আফসুস।তাই মাসের শেষের অল্প কয়টা টাকা খরচ করে ওই জায়গায় যাবার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না।ও এক প্রকার জোর করে আমাকে নিয়ে গেল।যাবার সময় যতবার টাকা বের হচ্ছিল পকেট থেকে মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছিল। আর চুড়ান্ত মেজাজ খারাপ হলো যখন সে ২টা কোন আইস্ক্রিম কিনে নিয়ে আসলো। খুব বিরক্ত মুখ করে বসে ছিলাম আমি। আরাফাত চারপাশের সৌন্দর্য বর্ণনা করে কি কি যেন বলছিল। হঠাৎ সে বললো “দোস্ত ধর আমি এই পাহাড় থেকে পরে যাচ্ছে। একটা ঢাল ধরে ঝুলে আছি। যেকোনো মুহুর্তে ঢালটা ভেঙে পরতে পারে। আমি চিৎকার করে বলছি, রাকিব আমাকে বাঁচা। প্লীজ আমাকে বাঁচা। তুই তখন কি করবি?” আমি কর্কশ গলায় বলে উঠলাম, “তুই হাত দিয়ে ঢালের যেই জায়গায় ধরে রাখবি সেইখানে তোর হাতে পা দিয়ে চাপা দিব।” শুনে ও অনেক্ষন হেসেছিল। কিছু টাকা খরচ হলেও, পরের কয়েকটা দিন একটু কষ্টে কাটলেও, সময়টা ভালোই ছিল বলে মনে হয়।
আরাফাতের একটা খুবই মজার ব্যাপার আছে। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, উত্তর বঙ্গ যাদের বাড়ি তাদের বাংলা বিভক্তি প্রয়োগে সামান্য সমস্যা আছে। বিশেষ করে দ্বিতীয়া বিভক্তি নিয়ে ওদের যে প্রবলেম আছে এইটা ওরা বুঝতেই পারে না। যেমনঃ আরাফাতকে নিয়ে কেউ হাসাহসি করলে ও ক্ষেপে গিয়ে বলে আমাকে হাসে? অথচ হওয়া উচিত আমাকে নিয়ে হাসে। তারপর ধরেন ও চায় কেউ ওর ছবি তুলে দিক যেখানে ওর বলা উচিত ছবি তুলে দাও, সেখানে সে বলবে আমি ছবি উঠব। ধারাবাহিকতায় আমি ঘুমাব না বলে সে বলে আমি ঘুম পাড়ব (আরে বেটা ঘুম কি ডিম যে তুই পাড়বি?)। মশারী সবাই টাঙ্গায় আর আরাফাত মশারী ফেলে দেয় যদিও মশারী তোলা থাকতো না কোথাও। আমার তোমার কাছে আসতে হবে, এই বাক্য আরাফাত বললে বলতো, আমাকে তোমার কাছে আসতে হবে। আর কিছু কিছু বাংলা শব্দের অস্তিত্ব ওর কাছে ছিল না। যেমন সূর্যাস্ত। ও বলতো সূর্যোদয় আর সূর্য ডোবা। এবং এটা বোঝানোর জন্য সূর্যোদয় বলে হাত নিচ থেকে উপরে তুলতো যাতে করে সবাই বুঝতে পারে সূর্য উঠছে। আর সূর্য ডোবা বলে হাত উপর থেকে নিচে নামাতো। জন্মদিন, এই বাংলা শব্দটা ও কখনো উচ্চারণ করতে পারত না। বলতো জর্মদিন। তবে প্রথম প্রথম আমি ভাবতাম এটা বোধহয় আরাফাতের একার সমস্যা। পরে উত্তর বঙ্গের আরো কয়েকজনের সাথে পরিচয় হবার পর বুঝতে পারলাম এটা আসলে সমস্যা না, উত্তরবঙ্গের কথা বলার ধরনটাই এমন ।
যা বলার জন্য এই পোষ্ট লিখতে বসলাম তার কাছে ধারেও যেতে পারলাম না। তাতেই অনেকবড় হয়ে গেল। আজ এই টুকুই।
চলবে
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



