somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোর উচিৎ কৃষকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঋণ দিয়ে আসা

২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ সকাল ৯:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



গ্রামে গিয়ে গত বছর এক স্কুল জীবনের সহপাঠির সাথে দেখা হল। নানান কথার ফেরে যেটা বুঝলাম- সে জীবিকার সংকটে আছে। একটা ভ্যান চালাত, বেঁচে দিতে হয়েছে। এখন সে বেকার। আমার কাছে কোনো সহযোগিতা চায়নি, কিন্তু সাহায্য তার দরকার সেটি গোপনও করেনি।

আমি ওকে আমাদের একটা পুকুরে মাছ চাষ করতে বললাম। টাকা দিতে চাইলাম। দিলামও। ও পুকুরে চৌদ্দ হাজার টাকার মাছ ছাড়ল। দুই হাজার টাকার জাল দিয়ে ঘিরে দিল। এক বছরে খাবার বাবদ নূন্যতম ২০০০০ টাকা ধরলে ঐ প্রজেক্টের খরচ দাঁড়ায় ৩৬ হাজার টাকা। সাথে ওর পরিশ্রম। টাকার অংকে তা মাসে ২০০০ টাকার কম তো নয় এই বাজারে। তাহলে যোগ হয় আরো ২৪০০০ টাকা। মোট বিনিয়োগ দাঁড়াল- ৬০০০০ টাকা।

ওর সাথে বসে একটা খসড়া হিসেব করে দেখলাম, সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে প্রজেক্ট থেকে ৪০০০০ টাকা লাভ হতে পারে। সমস্যা হচ্ছে, এই ‘যদিটা’ প্রায়ই বাস্তবে রূপ নেয় না। এক্ষেত্রে তো সব খরচ ঠিকমত ধরা হয়েছে, কিন্তু গ্রামের বেশিরভাগ ক্ষুদ্র (মাছ) চাষি আসলে এই টাকাটা বিনিয়োগ করার ক্ষমতা রাখে না। বিনিয়োগ করতে হয় ধার-দেনা করে। অথবা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে।

কৃষি ব্যাংকের ১০% -এর কৃষি ঋণ ঘুষসহ গিয়ে দাঁড়ায় ২০% এ। এর মানে সে ৩৬০০০ টাকা বিনিয়োগ করলে ওটা আসলে ৪৩২০০ টাকার সমান বিনিয়োগ হয়। এই ধরনের প্রজেক্ট ব্যর্থ হওয়ার একশোটা কারণ আছে, তার মধ্যে বৈজ্ঞানিকভাবে করতে না পারা অন্যতম কারণ।

আমাদের প্রজেক্টে কী হল? ব্যর্থ হল। সবকিছু বিজ্ঞানসম্মতভাবে করার পরও কেন ব্যর্থ হল? কারণ, হঠাৎ বন্যায় পুকুরটা ভেসে গেছে। এ দায় কার? নিশ্চয়ই কারো না। আবার কারো? দায়টা আসলে সবার নিতে হবে, যেহেতু কৃষক প্রাইমারি উৎপাদক এবং শ্রমজীবি। রাষ্ট্র দায় নেওয়া মানে দায়টা সবার নেওয়া হয় যেহেতু রাষ্ট্র জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলে।

এক্ষেত্রে টাকাটা যদি ঋণ ধরি, তাহলে আমার সহপাঠি ব্যাংকের টাকা এখন শোধ করবে কীভাবে? পরের বছর মাছ চাষ করবে কীভাবে? এই ঋণের চাপ সে এখন সামাল দেবে কীভাবে?

ব্যাংক কিন্তু তাকে ক্রমাগতভাবে চাপ দিয়ে যাবে এবং মাঝে মাঝে ব্যাংক থেকে পরিদর্শক এসে একটা কিছু বুঝিয়ে ২০০ বা ৫০০ টাকা নিয়ে যাবে যা জমা নাও হতে পারে পরিশোধের খাতায়। এভাবে একসময় লাল নোটিশ দেওয়া হবে তাকে, শেষ পর্যন্ত দালাল এসে বুঝিয়ে তাকে ব্যাংকে হাজির করবে, কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপক ব্যাংক ক্লোজিং-এ আদায় ভাল দেখাতে চায়।

(যে খবর মাঝে মাঝে আমরা প্রথম আলোর মত পত্রিকায় দেখতে পাই- “কৃষি ব্যাংকে লক্ষ্যমাত্রার ১০০ ভাগ ঋণ বিতরণ, ৯০ ভাগ আদায়”)

ব্যবস্থাপক এবার তার লোন রিশিডিউল করে দেবে। ধরলাম, সে ঋণ নিয়েছিল ৩৬০০০ টাকা। ব্যাংক এবার তার নামে লোন পাশ করবে ৪২০০০ টাকা (ধরলাম)। তার পূর্বের ঋণ শোধ হয়েছে, সাময়িক ঝামেলা মুক্ত হয়ে স্বস্তির নিশ্বাঃস ফেলে এখন সে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি এসে ঘুম দেবে।

আগে তার ঋণ সুদাসলে ছিল ৩৯০০০ টাকা, যা শোধ হল। তাহলে তার নামে ৪২০০০ টাকা এবার পাশ হল কেন? বাকি টাকাটা কোথায় গেল, তাকে তো দেওয়া হল না?

একবার ভরাডুবি হয়েছে বলে মাছের চাষ করতে আর সে যাবে না। এখন হয়ত সে ৫০০ টাকার তরকারী সকালে কিনে সারাদিন বেঁচে ২০০ টাকা লাভ করে সংসার চালাচ্ছে, অথবা পরের বাড়িতে কাজ করছে, কিন্তু ঋণ শোধ করার টাকা তার হাতে কোনোভাবেই জমে না। পরের বছর আবার রিশিডিউল-এর প্রশ্ন। চক্র এক সময় গিয়ে শেষ হয়, যখন প্রাথমিক ঋণ সুদাসলে ডাবল হয়ে যায়, কারণ, তারপরে আর সুদ যোগ করা যায় না। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, কৃষি ব্যাংকের (অবশ্যই অন্য ব্যাংকও) লেজার ঘাটলে এই জায়গাটিতে হাজার হাজার ঘাপলা পাওয়া যাবে।

আচ্ছা, ধরা যাক, তার প্রজেক্টটি সফল হল। পরিকল্পনা ছিল মোট ১০০০০০ টাকার মাছ বিক্রী হবে। ধরুণ, কই মাছ। আজকে ঢাকার এক বাজার থেকে বড় সাইজের এক কেজি চাষের কই কিনলাম ১৫০ টাকা দরে। কিনে আমি বিস্মিত এবং সন্তুষ্ট! কীভাবে সম্ভব?

এক্ষেত্রে উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থার কারণে ক্রেতা লাভবান হল, আর লাভবান হল মাছের খাবার ব্যবসায়ী। মাছ/মাংসের কাঁটাকোটা দিয়েই মাছের খাবার তৈরি হয়, যার দাম ক্ষেত্রবিশেষ ওঠা-নামা করলেও গড়ে ৪০ টাকা কেজি বিক্রী হয়। খাবারের বাজার দর মাছচাষী চাইলেও নামাতে পারবে না, কারণ, মাছের খাবার পঁচনশীল নয়, আর মাছের খাবারের ব্যবসায়ী প্রান্তিক চাষীর চেয়ে স্বচ্ছল, তার অপেক্ষা করার সুযোগ আছে।

মাছ বড় করতে হলে খাবার দিতেই হবে। আবার মাছ বেশি বড় হলে তা বেঁচতেও হবে, কারণ, বড় হয়ে গেলে এক সময় মাছে খাবার খাবে বেশি কিন্তু বাড়বে কম। ফলে দ্রুত ধরে বেঁচতে হবে। কৃষক তো আর এই মাছ হাটে গিয়ে খুচরো বেঁচবে না। গ্রামের বাজারে কয়েক মণ একই মাছ ওভাবে বিক্রি করার সুযোগ নেইও। সে দেবে পাইকারকে।

এখন ভেবে দেখুন তো, আমি যদি ঢাকায় বসে এক কেজি মাছ ১৫০ টাকায কিনি, তাহলে কৃষক কত টাকায় বিক্রী করতে বাধ্য হয়েছে? ধরলাম, সে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রী করেছে। হিসেব করে শেষ পর্যন্ত দেখা গেল প্রজেক্ট সফল হওয়া স্বত্বেও সে কোনোমতে আসল বাঁচাতে পেরেছে। তাহলে সে এখন ঋণ শোধ করবেই বা কী করে আর খাবেই বা কী?

১৫০ টাকায় বাজারে চাষের কই বিক্রী হওয়া মন্দ নয়। তাতে কম আয়ের একটা শ্রেণির আমিষের চাহিদা মেটে। কিন্তু প্রান্তিক কৃষকের হবে কী? তাদের জন্য তো একটা সমাধান বাতলাতে হবে। নইলে তো তারা মরতেই থাকবে। আধুনিক সভ্যতা তো কারো শবদেহের উপর ভর করে টিকে থাকতে চায় না, চাওয়ার কথা নয়।

এইক্ষেত্রে আমি যেটা বুঝি-

১। কৃষককে ঋণ দিতে হবে নামমাত্র সুদে (হতে পারে, ১০০০০০ টাকা পর্যন্ত ২% সুদে);

২। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকবে, প্রতি বছর এলাকা বিশেষ নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রান্তিক কৃষককে ঋণ দিতে হবে;

৩। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হলে অতি-প্রান্তিকদের ঋণ নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত মওকুফ করতে হবে। যেমন, ১০০০০ টাকা পর্যন্ত মওকুফ করা যেতে পারে। এর মানে এই না- যে ১০০০০ টাকা বা তার কম ঋণ নিয়েছে সে শুধু মওকুফ পাবে। ১০০০০০ টাকা পর্যন্ত ১০০০০ টাকা মওকুফ করা যেতে পারে।

৪। বীজ, খাবার ইত্যাদি কৃষককে বিনামূল্যে দিতে হবে। নিশ্চয়ই অনেক না। মেম্বার-চেয়ারম্যানকে বাছাইয়ের দায়িত্ব দিয়ে ঝামেলা বাড়ানোর দরকার নেই। যেমন, জন প্রতি ১০০০ পোনা (ধানের বীজ বা অন্য কিছু, যা-ই হোক না কেন, তা নির্দিষ্ট পরিমাণ) ১০০ কেজি খাবার বা সার-কীটনাশক ইত্যাদি বিনামূল্যে দেওয়া যেতে পারে। এটা ধনী গরীব সবাই পাক, ক্ষতি নেই। কেউ যদি কিছু বীজ আর ১০০ কেজি খাবারের জন্য পুকুর মাছ চাষ করে সে তো ভালোই।

৫। ঋণের, বিশেষ করে ক্ষুদ্র কৃষি ঋণের পুনঃতফসিলিকরণের উপর গভীর পর্যবেক্ষণ দরকার;

৬। ঋণ প্রদানে ঘুষ নেওয়া এবং ভুয়া কাগজপত্রের উপর ঋণ দেওয়া বন্ধ করার জন্য কার্যকর উপায় খুুঁজে বের করা দরকার।

নিশ্চয়ই আরো অনেক কার্যকর উপায় খুঁজে পাওয়া যাবে দরদ দিয়ে ভাবলে। কৃষক ঋণ নিতে ব্যাংকে যাবে না (মানে না গেলেও), ব্যাংক ব্যবস্থা এমন হতে হবে, ব্যাংক প্রতিনিধি ঐ এলাকায় এমন কৃষক খুঁজে বের করবে যে কে বা কারা সামান্য টাকার অভাবে চাষাবাদ করতে পারছে না।

আধুনিক ব্যাংক ব্যাবস্থা যদি শুধু টাকা লেনদেন আর হিসেব-নিকেষের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে তো তা সভ্যতার সাথে বেমানান। সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সম্ভাব্য সমতা বিধানে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে ব্যাংক, কিন্তু সেই খাতটি আমাদের দেশে একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থায় আছে। মরছে প্রান্তিকরা, কারণ, তারা ঋণ খেলাপি হতে পারে না। তারা ভয় পায়, তারা ভয়ে ব্যাংকে হাজির হয়। তাদের মাঝে মাঝে ঋণের দায়ে পুলিশে ধরেও নিয়ে যায় মামলা হলে!
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ সকাল ৯:১৪
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

”আমার রাজনীতির রূপরেখা” -- জিয়াউর রহমান

লিখেছেন প্রামানিক, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
আমি তখন দৈনিক দেশ পত্রিকায় চাকরি করি। এটা আমার দ্বিতীয় চাকরি। প্রথম চাকরি নিয়েছিলাম ব্রিটিশ আমলের প্রকাশিত দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। আজাদ পত্রিকাটি ব্রিটিশ আমলে মুসলমানের পক্ষের একমাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

শহীদ জিয়া ২৭ মার্চের ভাষণে 'জয় বাংলা' বলেছিলেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১১





সূত্রঃ আমার রাজনীতির রূপরেখা
লেখকঃ জিয়াউর রহমান
পৃষ্ঠাঃ ১৭৭

...বাকিটুকু পড়ুন

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস... ...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×