আজকে এমন একজন সম্পর্কে লিখছি যাকে নিয়ে লিখতে যেয়ে যে আবেগ কাজ করছে এমনটা এর আগে কখনও হয় নি। কিছুটা গর্বিত, কিছুটা লজ্জিত! মিশ্র অনুভূতি!আমরা কিছু স্বপ্নবাজ যখন স্বপ্ন দেখছি কিছু একটা করার তখন একজন স্বপ্নবাজ তার স্বপ্ন পূরণের গল্প রচনা করে ফেলেছেন! আজকে আপনাদের এমন এক সফল স্বপ্নবাজের কথা জানাব যার মহান কীর্তির কথা হয়তো আগে কখনও শোনেন নি।
মোঃ রফিকুল ইসলাম রফিক। পেশায় একজন চা বিক্রেতা। বাংলাদেশের সর্বপশ্চিমের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রাণকেন্দ্র বিশ্বরোড মোড়ে শাহ্ নেয়ামতুল্লাহ কলেজের ঠিক সামনেই চোখে পড়বে তার চা এর দোকানটি। তার দোকানে সবসময় চায়ের জন্য ভিড় লেগেই থাকে। তিনি সবার কাছে রফিক নামেই পরিচিত। তবে নিজ গ্রামে তিনি 'ভোলা' নামে পরিচিত।
দেখতে শুনতে ভোলা ভালা হলেও অনেক মহৎ একটা কাজ করে ফেলেছেন তিনি। যে শিক্ষার অভাবে তিনি জীবনের পদে পদে বাধা পেয়েছেন, গ্রামের জমিদারদের অবহেলার শিকার হয়েছেন, যে শিক্ষার অভাবে তার গ্রামে এখনও প্রকৃত উন্নয়নের ছোঁয়া লাগে নি, শত বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে সেই শিক্ষাকে তিনি নিয়ে গেছেন তার জন্মস্থান শিক্ষা বঞ্চিত ঠাকুরপালশা গ্রামে। ঠাকুরপালশা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরের একটি অনুন্নত গ্রাম। নিজে অশিক্ষিত বলে গ্রামের মহাজনদের অবহেলা সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে। তাই তিনি ছোট বেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন এই গ্রামে তিনি একটা স্কুল খুলবেন। কিন্তু যখন তিনি এই স্কুল প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিলেন তখন গ্রামবাসী তার কথাকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। তাঁকে গ্রামবাসী পাগল আখ্যা দিয়েছিল।তখন তার মধ্যে আরও বেশি জেদ চেপে বসল। তিনি হাল ছেড়ে দিলেন না। কেউ এগিয়ে না আসলেও শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের স্বপ্ন পূরণে তিনি ছিলেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তাই তিনি তার নিজের প্রিয় গৃহপালিত গরু বিক্রি করে আর চা বিক্রি করে সঞ্চিত কিছু টাকা দিয়ে গ্রামের জমি লিজ নিয়ে প্রতিষ্ঠা করে ফেললেন 'সোনামণি পাঠশালা' নামে এক বিদ্যালয়।
যে গ্রামে বিদ্যুতের আলো পৌঁছালেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগে নি শিক্ষার অভাবে সেই গ্রামকে তিনি আলোকিত করলেন সেই শিক্ষার আলোয়! অত্যন্ত সহজ সরল এবং সৎ এই মানুষটি স্বপ্ন পূরণে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। তিনি গর্ব করে বলেন যে তিনি তার স্কুলকে বাংলাদেশের পতাকার ছায়ায় রেখেছেন! বর্তমানে তার গ্রামেরই ডিগ্রী পড়ুয়া মেয়ে মরিয়ম নামমাত্র সম্মানীর বিনিময়ে প্রায় ৫০ জনকে নিয়মিত শিক্ষাদান করছেন। ভোলা ভাই সবকিছুর জন্যই সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কিন্তু তারপরেও তার মনে কষ্ট আছে। কারণ তিনি এখনও এই স্কুলে পড়তে আসা ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের বসার জন্য বেঞ্চের ব্যবস্থা করতে পারেন নি। বাচ্চাদের জন্য ব্ল্যাক বোর্ডের ব্যবস্থা করতে পারেন নি। পারেন নি বাচ্চাদের ঘণ্টার শব্দ শোনার সুযোগ করে দিতে। এসব কথা বলতে বলতেই তার চোখের কোণে জল জমে টলমল করতে লাগল।
আমরা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে লাখ লাখ টাকার মালিক হয়েও যে কাজ করতে পারি না, সেই কাজ এই চা বিক্রতা ভাই করে ফেলেছেন। আমরা যখন নিজেদের বাচ্চাদের এসি রুমে রেখেও আক্ষেপ করি যে তাদের কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা তখন ভোলা ভাই চোখের পানি ফেলছেন তার গ্রামের ছোট ছোট বাচ্চাদের বেঞ্চ- টেবিলের ব্যবস্থা করে দিতে না পারার আক্ষেপে। সত্যি ভোলা ভাই! আপনি আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছেন। আমরা আপনার কাছে লজ্জিত। তবে আপনার পদধূলিতে বাংলাদেশ আজ ধন্য। এইজন্য আমরা গর্বিত। আপনিই হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ স্বপ্নবাজ। এই দেশ ধন্য আপনার মতো দেশপ্রেমিক পেয়ে। ভোলা ভাই সম্পর্কে বলতে গিয়ে তার চা স্টলের পাশে অবস্থিত শাহ্ নেয়ামতুল্লাহ কলেজের প্রিন্সিপাল বলেন যে আমরা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও ভোলা ভাই আমাদের জন্য অনুকরণীয় ও অনুসরনীয়। এই মুহূর্তে সকলকেই তার সাহায্যে এগিয়ে আসা উচিত। 'স্বপ্ন' নামের একটি সংগঠন তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এখনও তিনি বাংলাদেশের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সেভাবে উঠে আসতে পারেন নি। তাঁকে তুলে ধরা খুব প্রয়োজন। তিনি আমাদের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারেন। সবশেষে দেশ নিয়ে আমরা যারা হরহামেশায় হতাশা প্রকাশ করি তাদেরকে বলব-যতদিন রবে ভোলা ভাইয়ের হাতে দেশ, পথ হারাবে না বাংলাদেশ।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জানুয়ারি, ২০১৪ রাত ৯:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



