
১৯৯৭ সাল।
আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি।
স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে মামুন ভাইয়ের একটা অডিও ক্যাসেটের দোকান ছিল। পাশেই মির্জা ভাইয়ের কনফেকশনারি। টিফিনের সময় ওখানে প্যাটিস খেতাম।
সেই সময় অডিও ক্যাসেটের দোকানগুলোতে গান বাজত। প্রিয় গান কানে এলে হাঁটার গতি কমে যেত। কখন যে দাঁড়িয়ে পড়তাম, নিজেও বুঝতাম না। গান শেষ হলে আবার হাঁটতে শুরু করতাম।
এমনটা শুধু আমার একার হতো না। অনেকেরই হতো।
কোনো একটা গান হয়তো দোকান থেকে ভেসে আসছে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়েছে। তার গন্তব্য আছে, বাড়ি ফেরার তাড়া আছে। তবু গানটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে দাঁড়িয়ে থাকবে।
গান শেষ হলে আবার হাঁটা।
মামুন ভাইয়ের দোকানে এমনই একদিন বাজছিল *Ghulam-E-Mustafa* সিনেমার গান—‘Tera Gham Mera Gham’।
রাজেশ রোশনের মিউজিক । হরিহরণের বিষণ্ন কণ্ঠ, কবিতা কৃষ্ণমূর্তির মায়াবী গলা।
গানটা আমার বরাবরই ভীষণ বিষণ্ন লাগত। আজও লাগে। তখনও লাগত। গানটার মধ্যে কী এমন ছিল, কেন শুনলে মন খারাপ হয়ে যেত, তা কখনো ভেবে দেখিনি। শুধু গানটা শুনতাম। আর কোথাও একটা মন খারাপ জমে থাকত।
তারপর কত বছর পেরিয়ে গেছে।
মামুন ভাই আর অডিও ক্যাসেটের ব্যবসা করেন না। এই সময়ে ক্যাসেটের দোকান টিকিয়ে রাখাই বা সম্ভব কীভাবে! এখন গান শোনার কত ব্যবস্থা। অথচ প্রিয় গান কানে এলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ার সেই অভ্যাসটা যেন অন্য কোনো সময়ের গল্প হয়ে গেছে।
মির্জা ভাইয়ের সেই কনফেকশনারিটাও আর নেই। তবে তিনি আছেন। গত বছর তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। কী অমায়িক হাসি মানুষটার!
তাঁর নতুন দোকান হয়েছে।
তাঁকে দেখে ভালো লেগেছিল। অথচ কোথায় যেন পুরোনো দোকানটার কথাও মনে পড়ছিল। যে দোকানে দাঁড়িয়ে প্যাটিস খেয়েছি, যে রাস্তা দিয়ে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেছি—সেই জায়গাগুলো আর আগের মতো নেই।
মানুষগুলো কেউ কেউ আছেন। তাঁদের জীবনও এগিয়ে গেছে। শুধু আমাদের স্মৃতির ভেতরে পুরোনো দোকানগুলো ঠিক আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
এত বছর পর আবার সেই গান শুনছি।
এবার গানটার সঙ্গে নানা পাটেকরের স্মৃতিও জড়িয়ে গেছে। তাঁকে নিয়ে কত সিনেমা দেখেছি, কত অভিনয় মনে রেখেছি। একসময় যাঁকে দেখে বুঝেছিলাম, সিনেমায় শুধু হিরো থাকেন না, একজন অভিনেতাও থাকেন—সেই মানুষটিকে ঘিরেই আজ মনটা খারাপ হয়ে আছে।
আর গানটা বাজছে।
সেই একই বিষণ্ন সুর।
মনে হচ্ছে, আবার স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছি। মামুন ভাইয়ের দোকান থেকে গান ভেসে আসছে। পাশেই মির্জা ভাইয়ের কনফেকশনারি। আমি হাঁটছি, তারপর গতি কমে আসছে। কখন যে দাঁড়িয়ে পড়েছি, বুঝতে পারছি না।
গান শেষ হলে আবার হাঁটতে শুরু করব।
শুধু এবার জানি, সেই রাস্তাটা আর আগের মতো নেই। সেই দোকানগুলোও নেই। ক্লাস নাইনে পড়া ছেলেটা অনেক বড় হয়ে গেছে।
তবু গানটা রয়ে গেছে।
কিছু গান বোধহয় এভাবেই আমাদের জীবনে থেকে যায়। সুরের মধ্যে শুধু কথা আর মিউজিক থাকে না। আটকে থাকে একটা সময়, একটা রাস্তা, পরিচিত কিছু মুখ, আর আমাদের জীবনের সেই মানুষটা—যে একদিন কোনো এক বিকেলে গান শুনতে শুনতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়েছিল।
আজও গানটা শুনলে সে দাঁড়িয়ে পড়ে।
শুধু এবার তার মনে পড়ে যায়, কতটা পথ হেঁটে এসেছে সে।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




