somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আন্তর্জাতিক নারী দিবস, বকুল আপা ও সুরা নিসা নিয়ে বিব্রত মুসলিম সমাজ

০৮ ই মার্চ, ২০০৬ রাত ৩:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পৃথিবী শাসিত পুরুষ প্রণীত প্রথায়। নারী তাই অল্প কিছু সমাজ ছাড়া চরম উপেক্ষিত। (অল্প কিছু সমাজ বললাম, এই কারণে যে, আমার নিজেরই দেখা একাধিক আদিবাসী সমাজ আছে যেখানে সমাজ মাতৃতান্ত্রিক। খাসিয়া রাজার ছেলে রাজেশ প্রধান তাই প্রাপ্তবয়স্ক হলে মায়ের পদবী গ্রহণ করে। আর সম্পত্তি সবসময় পায় বড় মেয়েরা।) । এই উপেক্ষিত নারীদের কথা বলা হয় না বছর জুড়ে। বছরে অন্তত: তাই একটি দিনকে বিশেষ করে রাখা হয়েছে এই কথাগুলো বলার জন্য। পুরো বছর জুড়ে যদি সেসব উপেক্ষার কথা বলা যায় তবে তো ভালোই, তবে যদি না বলা যায় সেজন্যই আন্তর্জাতিক নারী দিবস। যারা বুঝতে পারছেন না কেন এই বিশেষ দিবস তারা জাতিসংঘ ক্লাবে একটু যোগাযোগ করতে পারেন। বিশ্বের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী, গুরুত্বপূর্ণ ইসু্যকে বিশেষ করে স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য জাতিসংঘ বিভিন্ন তারিখকে এরকম দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়ে থাকে। যেমন 21 ফেব্রুয়ারিকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। তার মানে এই নয় যে, আমরা বছরের বাকী দিনগুলো মাতৃভাষায় কথা বলি না। বরং এই দিনটি একথা মনে করিয়ে দেয়ার জন্য বড় ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পাওয়া ভাষাগুলো ছোট ও সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাকে গিলে ফেলছে এবং সেগুলোকে উদ্ধার করা দরকার।

অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন পুরুষ দিবস নাই কেন? পুরুষ দিবস নাই একারণে যে পুরুষেরা, দিন, সপ্তাহ, মাস ও বছর সবই দখল করে নিয়েছে। যদি এমন দিন আসে যে নারীরা সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করবে আর পুরুষ হয়ে পড়বে তাদের দাসানুদাস তখন হয়তো প্রয়োজন পড়বে পুরুষ দিবসের।
পুরুষের এই নিয়ন্ত্রণকারী সম্পর্ক নিয়ে সবচে সমস্যায় আছে অনুন্নত ও পিছিয়ে পড়া সমাজসমূহ। যেখানে নারীকে তারা নিয়ন্ত্রণ করে বিভিন্ন অজুহাত। ধর্মকে প্রায়শ:ই ব্যবহার করা হয় এই অজুহাত হিসেবে। উদাহরণ দিতে পারি: আফগানিস্তানের তালিবানদের। নারীর জন্য বাইরের সবকিছু নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল তারা এবং পরিস্থিতি অনেক মুসলিম দেশে প্রত্যক্ষভাবে এরকম না হলেও খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। আর অনেক নারী আন্দোলনকারী মনে করেন মুসলিম পুরুষদের এই স্বৈরাচারী শক্তির উৎস সুরা আন নিসা (সুরা নং 4) এর 34 নং আয়াত। সব ধর্মের এমন বিধি-নিষেধগুলো সে ধর্মের অনুসারীরা আলোচনায় নিয়ে আসেন তা থেকে নিজেদের উত্তরণের জন্য। তবে সব ধর্মেই নারীদেরকে এমন করে দেখানো হয়েছে। এটা শুধু ইসলামের কোনো দোষ নয়। বরং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অন্তনির্হিত অন্যায় আচরণ। যদিও এখন ইসলামী পন্ডিতরা সুরা নিসা'র ঐ আয়াতের একটু নরোম ব্যাখ্যা দিয়ে প্রতিপক্ষকে সন্তুষ্ট করতে চান তবুও এর সরাসরি অর্থই তো পৃথিবীজোড়া মুসলিমদের প্রভাবিত করবে। নতুন ব্যাখ্যার কথা ক'জন জানার সুযোগ পায়? তো আসুন সেই আয়াতটা দেখি:

"পুরুষেরা হচ্ছে নারীদের রক্ষাকারী ও ব্যবস্থাপনাকারী। কারণ তাদের একজনকে আরেকজনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে। এও কারণ যে তাদের (স্ত্রীর) খরচ করার জন্য অর্থ তারা (পুরুষরা) দিয়ে থাকে। সুতরাং সতীসাধ্বী মহিলারা অনুগত থাকে (আল্লাহ ও স্বামীর কাছে)। এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে আল্লাহ তাদেরকে যা পাহারা দিতে বলেন তা পাহারা দেয় (যেমন তাদের ইজ্জত, তাদের স্বামীর সম্পত্তি ইত্যাদি)। যদি কোনো নারীর মধ্যে তোমরা অসদাচরণ দেখো, তাদেরকে শাসন করো (প্রথমে), (পরে) তাদের সাথে এক বিছানায় শোয়া বন্ধ করো, (এবং শেষে) তাদেরকে মারো। যদি তারা আবার বাধ্য হয়ে যায় তবে অন্য কোনো উপায় নিও না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবার উপরে শ্রেষ্ঠ।"

অনেকেই হয়তো এই আয়াতের মধ্যে কোনো অসুবিধাই খুঁজে পাবেন না। তা না পেতেই পারেন কারণ তিনি হয়তো ধর্মগ্রন্থ দিয়েই মূল্যবোধকে চিনেছেন এবং ধর্মগ্রন্থকে প্রশ্ন করার সাহস এখনও অর্জন করতে পারেননি। তো যুগে যুগে মুসলিম শাসক ও মৌলবাদী ইসলামী দল (যেমন তালিবান) এই আয়াত ব্যবহার করেই মুসলিম নারীর ভূমিকা ঠিক করে দেয়। তারা ঘরে থাকবে, ইজ্জত বাঁচিয়ে রাখবে ও স্বামীর সম্পত্তি রক্ষা করবে। এবং পুরুষরা তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব পেয়েছে এবং নারীদের নিয়ন্ত্রণের অধিকারও তারা এখানে পেয়েছে। তারা এমনকি ধর্মগ্রন্থ অনুসারে তাদেরকে প্রহার করতে পারে।

ব্যক্তিগতভাবে আমি একবার পাশের ফ্ল্যাটের এক দম্পতির এরকম আচরণ দেখেছিলাম। হঠাৎ দেখি তাদের 3/4 বছরের ছোট ছেলেটি কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে আসছে। আমি ওকে ফিরিয়ে দিতে গিয়ে দেখলাম আমরা যাকে আপা বলে ডাকতাম সেই বকুল আপা মেঝেতে দাঁড়িয়ে আছেন আর একটি টুলের উপর দাঁড়িয়ে দুলাভাই তাকে বেত দিয়ে আঘাত করছেন। বকুল আপা কোনো বাধা দিচ্ছেন না। দৃশ্য টি সহ্য না করে আমি বের হয়ে আসি। দু'য়েকদিন পরে আমি বকুল আপাকে বল্লাম আপনি কেন এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার খাচ্ছিলেন আপনি তো সরে যেতে পারতেন বা বেতটি ভেঙে দিতে পারতেন। আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে বকুল আপা বললেন, 'স্ত্রীরা ভুল করলে স্বামীর তাকে মারার অধিকার আছে। স্বামীর ও শিক্ষকের আঘাতের জায়গা বেহেশতে যাবে'।
আজ বুঝতে পারি বকুল আপা এই আয়াতের কথা বলেছিলেন। তার সাথে যোগ হয়েছে কোনো কাঠমোল্লার বয়ান। না জানি জীবনভর স্বামীর কত অন্যায় অত্যাচার এভাবেই মেনে নিয়েছেন বকুল আপা। আরো কত পরিবারে, সমাজের আরো বৃহৎ পিছিয়ে থাকা অংশে আরো কত বেশি অত্যাচার ধর্মের নামে নিদ্ধিধায় মেনে নিচ্ছেন এরকম কত বকুল আপা। ধর্মের নামে, ধর্মগ্রন্থের নামে, নারীর উপর পুরুষের এই পাশবিক শ্রেষ্ঠত্বপুরুষ হিসেবে আমাকে লজ্জায় নত করে দেয়। শরীরের জোরে, ধর্মগ্রন্থে দেয়া অধিকারের জোরে, শ্রেষ্ঠত্ব ফলানোর এই মধ্যযুগীয় ব্যবস্থায় আমার তাবৎ ঘৃণা। জানি পৃথিবীর সিংহভাগ নারীই এই অবমাননা থেকে মুক্ত নয়। পুরুষ হওয়ার পরও, এই সুযোগ আমাকে দেয়া হলেও আমি শতকোটি আন্দোলনরত নারীদের সাথে এককাতারের যোদ্ধা। আজ নারী দিবসে জগতের সকল বকুল আপাদের কাছে আমার আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনা।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
২৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হিন্দু মুসলমান ভুলে গিয়ে, আমরা সবাই মানুষ হই

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা মে, ২০২৬ দুপুর ১:৫৭



আমি জন্মগত ভাবে মুসলমান।
অবশ্য ধর্মীয় নিয়ম কানুন কিছুই মানতে পারি না। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। এখন তো আর এটা ফকির লালনের যুগ না। মানবিক এবং সচেতন... ...বাকিটুকু পড়ুন

নান্দাইলের ইউনুস ও স্বপ্নভঙ্গের বাংলাদেশ

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০


নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় একটি নাটকে একজন ভাড়াটে খুনীর চরিত্র ছিল। খুনীর নাম ইউনুস - নান্দাইলের ইউনুস। গ্রামের চেয়ারম্যান তার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন ভালো মানুষ স্কুল শিক্ষককে হত্যার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বনির্ভর অর্থনীতি থেকে ঋণনির্ভর, আমদানিনির্ভর, পরনির্ভর রাষ্ট্রে পরিনত হতে যাচ্ছি।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪




মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতজানু হয়ে যে রাষ্ট্রগুলো নিজের অর্থনীতি, কৃষি আর ভবিষ্যৎ বিক্রি করে দেয়- তার পরিণতি কী, তার জীবন্ত উদাহরণ পাকিস্তান। কোটি কোটি মানুষকে ভিক্ষুক বানানোর সেই পথেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

এরা খুবই বিপদজনক

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ০৩ রা মে, ২০২৬ রাত ১১:০১

যে তোমার সাফল্য দেখে হিংসে করে,
যে তোমার বিপদ দেখে খুশি হয়,
যে তোমার সামনে এক আর পেছনে আরেক।
তাকে তোমার গোপন কথা কিংবা তোমার কোনো পরিকল্পনার কথা বলতে যেও না।
সবসময় তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্পিরিট শোন বাই আমেরিকান এয়ারলাইন্স-এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত!

লিখেছেন ঢাকার লোক, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ ভোর ৪:১৫

গতকালের একটা বড় খবর ছিল আমেরিকার একটি অন্যতম জনপ্রিয় বিমান সংস্থা স্পিরিট এয়ারলাইন্স দেউলিয়া হয়ে তাদের সব সেবা তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরেই স্পিরিট অর্থনৈতিক সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছিলো,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×