somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রাথমিক সহকারি শিক্ষকের হতাশা ও দুর্দশার কারন :

১২ ই অক্টোবর, ২০১৫ বিকাল ৪:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রতিটি দেশের প্রাথমিক শিক্ষা হলো সে দেশের শিক্ষার ভিত্তি। যা হুবহু বহুতল ভবনের মত। যে ভবনের ভিত্তি যত মজবুত ও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে আধুনিক সে ভবনের স্থায়ীত্ব ও ধারন ক্ষমতা ততটা শক্তিশালী। এজন্যই উন্নত বিশ্বের দেশগুলো তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা তথা প্রাথমিক শিক্ষায় অধিক বিনিয়োগ করে। কারন প্রাথমিক শিক্ষাই উচ্চতর শিক্ষার বুনিয়াদ।

উপরের এই সূচনার অবতারনা করলাম আমার লেখার বিষয়টা পাঠকের অনুমানযোগ্য করার জন্য। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো তাদের প্রাথমিক শিক্ষাকে যতটা গুরুত্ব দেয় আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষা ঠিক ততটাই অবহেলিত! পাঠক নিশ্চয় ভাবছেন এটি কিভাবে সম্ভব! আমার ভুল হচ্ছে না তো! না আমার ভুল নয় আমি ঠিকই বলছি। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাকে এতটাই অবহেলা করা হয় যে প্রাথমিক শিক্ষকদের এখনো শিক্ষকই মনে করা হয় না! আমাদের দেশে শিক্ষক বলতে এখনো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরই বোঝানো হয়!!

আর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক হলো সে পদ যে পদের উপর চলছে যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও হতাশা বঞ্চনার পাহাড়সম বৈষম্য! অথচ এই সহকারি শিক্ষকেরাই করে চলেছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান ছাড়াও সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যেমনঃ শিশু জরিপ, খানা জরিপ, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে ভোট গ্রহন, উপবৃত্তি প্রদানসহ আরো অনেক কাজ। কিন্তু বিনিময়ে তারা কি পাচ্ছেন?

পাঠক জেনে অবাক হবেন যে দেশের সরকারি হাসপাতালের নার্স বোনেরাও দ্বিতীয় শ্রেনির মর্যাদায় আসীন সে দেশের প্রাথমিক সহকারি শিক্ষকেরা এখনো তৃতীয় শ্রেনির কর্মচারী! ভুমি অফিসের তহসিলদার যারা সহকারি শিক্ষকদের নিচের গ্রেডে ছিলেন তারাও আজ দ্বিতীয় শ্রেনির কর্মকর্তা। কিন্তু প্রাথমিক সহকারি শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধির কোন প্রয়োজনীয়তা কারোই নজরে আসছে না! অথচ এই তৃতীয় শ্রেনির সহকারি শিক্ষকেরাই তৈরী করছেন ভবিষ্যতের প্রথম শ্রেনির নাগরিক!

একসময় ছিল যখন প্রাথমিক সহকারি শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল খুবই কম। কিন্তু বর্তমানে মহিলাদের জন্য এইসএসসি যোগ্যতা চাওয়া হলেও আদতে যারা নিয়োগ পাচ্ছে তারা সকলেই মাস্টার্স ডিগ্রিধারী। পুরুষদের নূন্যতম যোগ্যতাই হলো ম্নাতক। তবে তুমুল প্রতিযোগিতায় টিকে আসতে হলে অধিক মেধাসম্পন্ন হতে হয়।

প্রবল আগ্রহ নিয়ে মেধাবীরা সহকারি শিক্ষক পদে যোগদান করে খুব বেশিদিন তাদের আগ্রহ ধরে রাখতে পারেনা। কারন হতাশা, বঞ্চনা, নিগ্রহ আর চরম বৈষম্য। ফলে চাকরীর বয়স থাকতেই চেষ্টা করতে থাকে কিভাবে অন্য চাকরীতে চলে যাওয়া যায়!! আসলে এর কারনটা কি? আমরা কি কেউ জানি? জানার কি চেষ্টা করেছি?

আসুন কিছুটা জানার চেষ্টা করি:
১। স্বাধীনতার পর থেকেই প্রধান শিক্ষক আর সহকারি শিক্ষকের মাঝে বেতনের তফাৎ ছিল মাত্র এক স্কেল। ২০০৬ সালে ঘোষিত পে-স্কেল তা বাড়িয়ে করা হয় দুই স্কেল। আর ৮ম পে-স্কেলে তা আরো বেড়ে দাড়ায় তিন গ্রেড!!! আবার এরই মাঝে প্রধান শিক্ষকের পদকে দ্বিতীয় শ্রেনি ঘোষনা করা হয় কিন্তু সহকারিদের তৃতীয় শ্রেনিতেই রেখে দেয়া হয়!! ফলে প্রতিনিয়ত প্রধান শিক্ষক কর্তৃক সহকারি শিক্ষকেরা অপমানিত হতে থাকে! অথচ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল কার্যক্রম পরিচালিত হয় সহকারি শিক্ষক কর্তৃক।

২। মাননীয় প্রধান মন্ত্রী তাঁর পূর্বসূরির মতই প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতির জন্য ২৬ হাজার বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়কে এক ঘোষনায় জাতীয়করণ করে নেন। যা তাঁর ঐতিহাসিক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে সরকারি প্রাথমিক সহকারি শিক্ষকেরা আশার আলো দেখতে শুরু করেন। কারন বিভিন্ন জটিলতা ও শূণ্যপদের অভাবে দীর্ঘ সময় ধরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পদোন্নতি বন্ধ আছে। কিন্তু ছাব্বিশ হাজার বিদ্যালয় নতুন করে জাতীয়করন হওয়ায় ছাব্বিশ হাজার প্রধান শিক্ষকের পদ সৃষ্টি হবে বলে সহকারি শিক্ষকেরা ধরে নিয়েছিলেন। তারা আশায় বুক বেধেছিলেন এবার হয়তো ছাব্বিশ হাজার সহকারি শিক্ষক দ্রুত পদোন্নতি পাবেন। কিন্তু অবাক ব্যাপার দেশের পদোন্নতির সকল নিয়ম ও রেকর্ড ভেঙ্গে জাতীয়করনকৃত বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরই প্রধান শিক্ষকের পদে আসীন করা হয়!! কোন অদৃশ্য ক্ষমতাবলে এই অনিয়ম করা হয় তা সহকারি শিক্ষকেরা বুঝতে পারেনি। অথচ জাতীয়করনের পর ঐসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করাই ছিল নিয়ম। ফলে সহকারি শিক্ষকদের সকল আশা ছাই চাপা পড়ে।

৩। সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পদোন্নতির জন্য গ্রেডেশন তালিকা প্রস্তুত করার আদেশ জারি করা হয়। সেক্ষেত্রেও জাতিয়করন বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বিপত্তি সৃষ্টি করে। আইন অনুযায়ী যেদিন হতে তাদের জাতীয়করন করা হয়েছিল সেদিন হতেই তাদের যোগদান ও জৈষ্ঠতা হিসেব করার কথা। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য হাতের ইশারায় তাদের প্রদর্শিত পূর্বের যোগদানের তারিখ হতে ৫০ শতাংশ সময়কালকে তাদের চাকুরীকাল হিসেবে গণ্য করার আদেশ জারি করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। ফলে গ্রেডেশন তালিকাতেও তারা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সরকারি প্রাথমিক সহকারি শিক্ষকের সিনিয়র বনে যান!!!! গ্রেডেশন তালিকায় পিছিয়ে পড়া সহকারি শিক্ষকেরা আজ গভীর হতাশায় নিমজ্জিত।

এতসব সমস্যা সহকারি শিক্ষকেরা সমাধানের কোন পথ খুজে পাচ্ছেন না। অথচ এসব সমস্যা সমাধান না হলে তাদের ভবিষ্যৎ বলে কিছুই থাকবে না!! ফলে যেসকল সহকারি শিক্ষক নিয়োগের পর এসব সমস্যা বুঝতে পারেন তারা অতিদ্রুত সময়ে এ ডিপার্টমেন্টে ত্যাগ করতে অস্থির হয়ে উঠেন। উল্লেখিত সমস্যাগুলোর কারনে মেধাবীরা যেমন প্রাথমিক সহকারি শিক্ষকের পেশায় থাকতে চাইছেন না তেমনি তরুন মেধাবীরা এ পেশায় আসতেও চাইছেন না। চাইবেন কিকরে! যে পেশায় ভবিষ্যতের কোন নিশ্চয়তা নেই সে পেশায় তারা কেন আসতে চাইবেন!? অথচ মেধাবীদের এ পেশায় টেনে আনা দেশের প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ।

তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য উপরিল্লেখিত সমস্যাগুলো সমাধানের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষক ও সহকারি শিক্ষকের বেতন বৈষম্য যেমন দুর করতে হবে তেমনি পদোন্নতির ক্ষেত্রে অনিয়মের মাধ্যমে সৃষ্ঠ এসব বাধাও দুর করা জরুরী।

লেখক: মোঃ ইমরান হোসেন ইমু, সহকারি শিক্ষক, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ক্যায়া হুয়া ? হুক্কা হুয়া; হুক্কা হুক্কা হুক্কা হুয়া

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২৫


২৪ বছর ধরে ঢাবিতে অনার্স পড়ছে; তা-ও নাকি ভাষা শিক্ষা বিভাগে উর্দূ নিয়ে !!! আজতক তার পড়া শেষ হয় নাই !!! এ ভার্সিটিতে নাম লিখালে পন্ডিত মশাই'রা কি কোনও... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুঃখ খচিত পতাকা আমার

লিখেছেন এম ডি মুসা, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র প্রাঙ্গণে
আজ হঠাৎ কার ছায়া নামে?
কার দুঃসাহসী কালো হাত
ইতিহাসের বুকের ওপর আঁকে পরাধীনতার নাম?

যে নাম একদিন ভাষার কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চেয়েছিল,
যে শাসন একাত্তরে ছড়িয়েছিল মৃত্যুর অন্ধকার
আজ কেন তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ হতো হায়দ্রাবাদ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫

।।হায়দারাবাদের নিজাম।।


১৯৪৭ সাল ভারতবর্ষের মুসলমানরা যখন নির্যাতনের শিকার অনেকগুলো গণহত্যা হয়েছিল দাঙ্গা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে বা তারও আগে এই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাজনীতি শুরু করেছিল কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়ে তিনি কংগ্রেসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বৃষ্টির ডায়েরি: অধ্যায় শূন্য

লিখেছেন চারাগাছ, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৬




বৃষ্টির ডায়েরি: অধ্যায় শূন্য


​আজকের বৃষ্টিটার কোনো ছন্দ নেই। কোনো ব্যাকরণ নেই। স্রেফ আকাশ ভাঙা জল, যা এই শহরের বুকে সশব্দে আছড়ে পড়ছে। মানুষজন তাড়াহুড়ো করে ছাতা মেলছে, আশ্রয়ের খোঁজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগীটি মারা গেলো

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩৩



বাংলাদেশে ডাক্তারদের অবহেলায় কি পরিমাণ প্রাণ অকালে ঝরে গিয়েছে তা কল্পনাতীত। এবং আমাদের দেশের ডাক্তার এই অপরাধে নূন্যতম অনুশোচনা বোধ করে না।

ডাক্তারদের অবহেলার কারণে দেশের পাঠ্য বই ইংরেজি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×