
মর্গেই তবে হিমায়িত হবে আমাদের বিবেক!
ফকির ইলিয়াস
===========================================
‘দীপন’- নামটি যখন রাখেন অধ্যাপক পিতা, তখন তাঁর ভাবনা ছিল, পুত্র দীপময় হবে। আলো জ্বালাবে। সমাজে, মানুষে। কল্যাণ করবে মানবতার। ফয়সাল আরেফিন দীপনের অধ্যাপক পিতা আবুল কাসেম ফজলুল হক চেয়েছিলেন, তাঁর সন্তান মানুষের মনকে জাগাবে। তাই পুত্রের প্রকাশনা সংস্থার নামটিও তিনি দিয়েছিলেন ‘জাগৃতি প্রকাশনী’।
দীপনের সঙ্গে আমার আলাপ ছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সজ্জন, সুহৃদ একজন মানুষ। তাকে হত্যা করার মতো শত্রু থাকতে পারে- এটা আমি, আমরা কোনো দিনই ভাবিনি। অথচ তার মৃত্যুসংবাদটি যখন দেখলাম- তখন নির্বাক না হয়ে কিছুই করার থাকেনি আর।
দীপনকে খুন করা হয়েছে। প্রায় একই সময়ে ঢাকার লালমাটিয়ায় নিজ অফিসে আক্রান্ত হয়েছেন ‘শুদ্ধস্বর’-এর প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল। লেখক রণদীপম বসু ও লেখক তারেক রহিম। সন্দেহ নেই- খুনিরা এই তিনজনকে খুন করতেই গিয়েছিল। আল্লাহর করুণায় তারা বেঁচে গিয়েছেন। এই ঘটনা আবারো তাক লাগিয়ে দিয়েছে গোটা বিশ্বের বিবেকবান মানুষকে। কী হচ্ছে এসব বাংলাদেশে! কারা এসব করছে?
ঘটনার পর নিহত দীপনের পিতা বলেছেন- ‘আমি পুত্র হত্যার বিচার চাই না’। নিশ্চয়ই এটা তিনি বলেছেন প্রতীকী অর্থে। কোনো পিতা বিচার চাইবেন না- এটা তো কেউই বিশ্বাস করবেন না। কথাটি নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ এটার ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে, পরে আবার ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তার এই মানবিক বোধোদয় ধন্যবাদ পাওয়ার দাবি রাখে।
বিচার চাওয়া আর না চাওয়া বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের অনেক প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী হতাশা ব্যক্ত করছেন তাদের কথায়, তাদের কলমে। এটা কিসের আলামত? কেন এত শঙ্কা ঘিরে ধরছে আমাদের?
ঢাকায় গণজাগরণ মঞ্চের প্রতিবাদ সভায় সরকারেরই কাছের বুদ্ধিজীবী বলে পরিচিত ড. আবুল বারাকাতের হতাশা আমাদের স্তম্ভিত করেছে। প্রতিবাদ সমাবেশে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাত বলেছেন, ‘অর্থনীতির মধ্যে মৌলবাদের অর্থনীতি বলে একটা অংশ আছে। এ দেশের মূল অর্থনীতির মধ্যে মৌলবাদের অর্থনীতি ঢুকে পড়েছে অর্থাৎ এ রাষ্ট্রও একটা অংশ মৌলবাদীতে পরিণত হয়েছে। আর মৌলবাদের অর্থনীতির সঙ্গে যে সরাসরি জড়িত তার কাছে বিচার চাওয়া ভেলকিবাজি ছাড়া আর কিছুই না।’
তিনি বলেছেন, ‘সেই মৌলবাদী শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে যাকে যাকে হত্যা করা লাগে সবাইকেই হত্যা করবে। গত কয়েক বছরে এতগুলো জঙ্গি ধরা পড়েছে, কিন্তু একটি বিচারও হয়নি। তাই এ থেকে রেহাই পেতে রাজপথে ঐক্যবদ্ধ লড়াই ছাড়া কোনো পথ নেই।’
অবস্থা এতই নাজুক, যারা এর আগে বিচার প্রার্থী হয়েছিলেন- তারও এখন বলছেন, ‘আমরা বিচার চাই না’। মানুষ কতটা নিজেকে নিজে ধিক্কার দিলে এমন কথা বলতে পারে?
ব্লুগার ও এক্টিভিস্ট নিহত অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা লিখেছেন- ‘দীপনের বাবার মতো আমিও বিচার চাই না। আমি নিশ্চিত জানি টুটুলের স্ত্রী, দীপনের স্ত্রী, অনন্তের বোন, রাজিব, বাবু, নীলয়ের বন্ধুরাও আর বিচার চান না। বাবাকে (ড. অজয় রায়) ফোন করলে উনি এখনো আশার কথা বলেন, জীবন যে থেমে থাকে না সেটা বলেন, আমাকে অনুপ্রেরণা দেন যাতে আমি থেমে না যাই, আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে বলেন। আশি বছরের একজন সন্তানহারা পিতার কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে যাই, নিজেকে বলি, ওনারা এরকম ছিলেন বলেই তো একাত্তরে ঝাঁপিয়ে পড়তে পেরেছিলেন। কিন্তু আমরা পারিনি, আমাদের প্রজন্ম পারেনি, সংখ্যায় ওরা ক্রমাগত বাড়ছে, খালি মাঠে যেভাবে আগাছা বেড়ে ওঠে প্রবল উদ্যমে। আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতাই ওদের এভাবে আগাছার মতো বাড়তে দিচ্ছে।
এই সরকারের কাছ থেকেও কিছু চাওয়ার নেই আমাদের, একটাই অনুরোধ ওনাদের কাছে, দয়া করে দিনরাত আর ‘আমরা সেক্যুলার পার্টি’ বলে গলা ফাটিয়ে নিজেদের এনার্জি নষ্ট করবেন না’।’
প্রিয় পাঠক, ভাষা আন্দোলনের প্রথম কবিতার কথা আপনাদের মনে আছে? ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতাটি লিখেছিলেন কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী। তিনি লিখেছিলেন- ‘যারা আমার মাতৃভাষাকে নির্বাসন দিতে চেয়েছে/তাদের জন্য আমি ফাঁসি দাবি করছি।/ যাদের আদেশে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে তাদের জন্য/ ফাঁসি দাবি করছি।’ সেটা ছিল ’৫২-পরবর্তী সময়। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে। সেই দেশে আমাদের বিচার চেয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হবে কেন? কেন মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার পরও আজ এভাবে লেখক-প্রকাশককে খুন হতে হচ্ছে?
দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো। বিদেশি হত্যা ও একের পর এক লেখক, ব্লুগার, প্রকাশক হত্যাকাণ্ডকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেনি বলেও দাবি করেছেন তিনি। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ দাবি করেন। মন্ত্রী বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো, অবশ্যই ভালো। এ যুগে কোন দেশে এ ধরনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে না, সেটা আমাকে বলবেন? এ ধরনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা সব দেশেই ঘটে থাকে। অন্যদিকে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, গোপন-অতর্কিত হামলা থেকে কেউই নিরাপদ নয়, আমিও নই। পুলিশ নাশকতা দমনে যেভাবে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে সেভাবে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে দক্ষতা দেখাতে পারেনি। আমাদের মনে আছে, এটা বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি গতানুগতিক কথা। যদি সেটাই হতো, তবে এতগুলো খুনের খুনিদের ধরা গেল না কেন?
হুমকি অব্যাহত রেখেছে খুনিচক্র। বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্র মৈত্রীর সাবেক সভাপতি ও গণজাগরণ মঞ্জের অন্যতম সংগঠক বাপ্পাদিত্য বসুকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। ‘সময় প্রকাশন’-এর স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। এরা সবাই মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাদী কর্মী ও সংগঠক। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলছি। তাহলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে হুমকিদাতাদের শনাক্ত করা হচ্ছে না কেন? অথবা এক্সপার্টদের সাহায্য নিতে সরকার এগিয়ে আসছে না কেন?
বলা হচ্ছে, সিসি ক্যামেরা দেখে দীপন হত্যাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। কী এক বীভৎস অবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে বাংলাদেশ। যারা সরকারি নিরাপত্তা পেয়ে যাচ্ছেন, তারা ছাড়া পুরো দেশের মানুষ আজ আতঙ্কিত। তাই এই প্রশ্নটি আসছে খুব সঙ্গত কারণে। কার কাছে বিচার চাইব, কেন চাইব?
এই অবস্থা যদি মোকাবেলা করা না যায়, অনেক অর্জনই ধ্বংসের মুখোমুখি হতে বাধ্য হবে। যা দেশকে বিছিয়ে দিতে পারে বহুগুণে। তাই মুখে যাদেরই দোষ দেয়া হোক না কেন- ওদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। একটি দেশে কোনো জনগোষ্ঠী পালিয়ে থাকতে পারে না। থাকা উচিতও নয়। যে কথাটি এখন আমাদের বেশি ভাবাচ্ছে, তা হলো ঘাতকরা কি কাউকে ছাড় দেবে? আমাদের বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ কথা বলছেন সুবিধাজনক অবস্থান থেকে। তারা বলতে চাইছেন, রন্ধ্রে রন্ধ্রে রাষ্ট্র কাউকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, কোনো রাষ্ট্রই পারবে না। তারা বলতে চাইছেন, সবচেয়ে নিরাপত্তাহীন রাষ্ট্র হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যেখানে অমন দুটো টলেস্ট বিল্ডিংকে ধ্বংস করেছে। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমনটা হয়নি। এর উত্তরে আমি একটা কথা বলতে চাই, যুক্তরাষ্ট্র নাইন-ইলেভেন হামলার পর পাল্টে দিয়েছে বিশ্বের ভূচিত্র। কয়টা যুদ্ধ করেছে- সবই আমরা জানি। যে কোনোভাবেই হোক তাদের প্রতিপত্তি খাটিয়েছে। তাই কথায় কথায় ইউরোপ-আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা যারা করেন, তারা দেশের গণমানুষের আইওয়াশ করতে চাইছেন মাত্র।
মার্কিনি দৈনিক দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ১ নভেম্বর ২০১৫ রোববার তাদের অনলাইন সংস্করণের এক প্রতিবেদনে বেশ কিছু তথ্য প্রকাশ প্রকাশ করেছে। ‘আলকায়েদা ক্লেইমস রিসপনসিবিলিটি ফর অ্যাটাকস অন টু পাবলিশার্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে দৈনিকটি জানিয়েছে, আলকায়েদা তাদের টুইটে উল্লেখ করেছে, লেখকদের চেয়েও ওই দুই প্রকাশক খারাপ। কেননা তারা ওই বই দুটি প্রচারে সাহায্য করেছিলেন। ধর্ম অবমাননাকারী লেখকদের ওই লেখার জন্য মোটা অঙ্কের টাকাও দিয়েছিলেন তারা।
নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, গত মাসে বাংলাদেশে হামলা ও হুমকি আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস বাংলাদেশে নিজেদের কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে বলে এক মাস আগে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তথ্য পায়। দেশীয় জঙ্গিগোষ্ঠী আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে একটি চিঠি পাঠিয়ে গণমাধ্যমে পর্দা ছাড়া নারীদের কাজ করা থেকে বিরত রাখার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে তাদের নির্দেশনা না মানলে সেখানে হামলা চালানোর হুমকি দেয়া হয়। গেল ২৪ অক্টোবর ঢাকায় শিয়া মুসলিমদের একটি সমাবেশে বোমা হামলা চালানো হয়। এতে এক কিশোর নিহত হয়। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, অনলাইনে প্রায়ই ধর্মনিরপেক্ষ ব্লুগারদের হিটলিস্ট প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে অনেক লেখক ও সাংবাদিক লেখা প্রকাশ নিয়ে সংশয়ে ভুগছেন। জীবনের ঝুঁকি বাড়ায় এক্টিভিস্টদের পশ্চিমা দেশগুলোতে আশ্রয়ের আবেদন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
খবর বেরিয়েছে, সন্ত্রাসী কার্যকলাপের মাধ্যমে কারাবন্দি যুদ্ধাপরাধীদের মুক্ত করতে এবং বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করতে একটি ‘সন্ত্রাসী গ্রুপ’ যে কোনো ভিআইপিকে অপহরণ ও হত্যার পরিকল্পনা করেছে। এ ছাড়া গ্রুপটি দেশের যে কোনো বিমানবন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাইয়েরও নীলনকশা করেছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের এক চিঠিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। গত ২৬ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তর ওই চিঠিটি ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার, সব পুলিশ কমিশনার, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, র্যাবসহ পুলিশের সব ইউনিটে পাঠায়। চিঠিতে সারা দেশে নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীকে এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। এসবের অর্থ কি? বিজ্ঞজনরা মানবিক বোধোদয়ের কথা বলছেন। কে শুনবে কার কথা? আর যারা বলছেন- দেশ এখন শান্তিতে ভাসছে, তারা কি তা বুঝে বলছেন?
বাংলাদেশের বিবেকবান মানুষ এখন শবদেহের প্রহরী। এ ছাড়া তাদের চেন কিছুই করার নেই। এসব দেখার জন্য তো বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। মনে রাখতে হবে, এই ঘাতকদের হাত থেকে কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপক, চিকিৎসক, রাজনীতিক কেউই একদিন রেহাই পাবেন না। কি বলব আর? মর্গেই তবে হিমায়িত হবে বাঙালির একসময়ের জাগ্রত বিবেক?
--------------------------------------------------------------------------------------------
দৈনিক ভোরের কাগজ ॥ ঢাকা ॥ শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০১৫
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই নভেম্বর, ২০১৫ সকাল ১১:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




