somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

“আপনি কেমন আছেন?”

১৮ ই মার্চ, ২০১৫ রাত ১২:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ফেইসবুক ইনবক্সে, ওয়ালে, কমেন্টে আমাকে করা বহুল ব্যবহৃত একটি প্রশ্ন। এর জবাবে আমি সবসময় সবাইকে বলে আসছি, “আলহামদুলিল্লাহ্‌। আমি ভালো আছি”। কিন্তু এটুকু শুনে আমার শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধুরা স্বস্তি পান না। বিশেষ করে যখন এখনও মরণব্যাধি নামে পরিচিত ক্যান্সার নামক দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত। আমি আজ তাদের কিছুটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছি।





কেমোথেরাপি চলছে। এইমাত্র নার্স একটার পর একটা ইনজেকশন হাতে দিয়ে, স্যালাইন লাগিয়ে চলে গেছে। আমি শুয়ে থেকে পুরোটাই দেখেছি। সবশেষে দিয়েছে অ্যাড্রিয়ামাইসিন। কিন্তু একি ! আমার হাতটা পুড়ে যাচ্ছে কেন ? অ্যাড্রিয়ামাইসিনের প্রভাবে আমার সমস্ত হাত জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে আমার সমস্ত শরীরে পৌঁছে যাচ্ছে। সমস্ত শরীরে প্রচণ্ড জ্বলুনি। আমি পুড়ে যাচ্ছি। সহ্য করতে পারছিনা। ইচ্ছে করছে, একটানে ক্যানুলাটা খুলে ফেলি। তাহলে হয়ত নিস্তার পাব। না ! তা আমার করা উচিত হবে না। দ্রুত চোখ সরিয়ে নিই। কারণ বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে, বিশ্বাস নেই হয়ত নিজের উপর নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলব। প্রচণ্ড জ্বলছি আর একটু পর পর লোভীর মত ক্যানুলাটার দিকে তাকাচ্ছি। আহ ! আহ! কি কষ্ট !!





জানে খুব বমি পাবে তাই বমির ওষুধ ওরা একসাথেই দিয়ে দিয়েছে। ব্লিওমাইসিনের কাজ একটু পরই শুরু হল। প্রচণ্ড বমি পাচ্ছে। সমস্ত নাড়িভুঁড়ি ক্রমাগত দলা পাকাচ্ছে। ভীষণ ব্যাথা। ভীষণ !! সমস্ত ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। শুয়ে থাকতে পারছিনা। ছিটকে বসে গেলাম। সজোরে নাক চেপে ধরে আছি। প্রচণ্ডভাবে হাঁপাচ্ছি। মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে হচ্ছে। সমস্ত শক্তি লোপ পেয়েছে। এতটুকু নাড়াচাড়া করবার মত শক্তি অবশিষ্ট নেই। খুব অসহায় লাগছে। মনে হচ্ছে এমন কিছুই নেই যা এই মুহূর্তে আমাকে সাহায্য করতে পারে। বার বার পেট খামচে ধরছি। বুক চেপে ধরছি। খুব জোরে। রিফ্লেক্সলি। তবুও পেট থেকে গলা পর্যন্ত বিস্তৃত প্রচণ্ড যুদ্ধটার কোন থামাথামি নেই। নাকটা আরও জোরে চেপে ধরি। কিছুতেই হার মানা যাবে না। কিছুতেই না।





থর থর করে কাঁপছি। জ্বর এসেছে কি? প্রচণ্ড শীত লাগছে। গুটিসুটি হয়ে আছি। তবু হিট রিজার্ভ করা যাচ্ছেনা। এদিকে ভেতরকার যুদ্ধের প্রকাশ হিসেবে ঘামছি আমি। এয়ার কুলারের শীতল হাওয়া অনবরত জমতে থাকা ঘামের বিরুদ্ধে সুবিধা করতে পারছেনা। প্রচণ্ড কাঁপুনি বাঁধ মানছে না। কেউ যেন অনবরত আমাকে ধরে ঝাঁকিয়ে যাচ্ছে। থামতে চাইছেনা।





সমস্ত রক্তনালীতে প্রচণ্ড যন্ত্রণা, কেমো ড্রাগ গুলোর সচল উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। আর পারছিনা। নিদারুন হতাশায় দেখি সালাইনের ব্যাগ খালি হতে এখনও অনেক দেরি। মাত্র একটু খানি শেষ হয়েছে। আর কতক্ষণ পারব জানিনা। যন্ত্রণা চেপে রাখা আরও কষ্টকর ঠেকে। ইচ্ছে করছে চিৎকার করি। তাতে যদি কিছুটা শান্তি পাই। না। তাও করতে পারিনা। শুধু কাতরাতে থাকি। মাঝে মাঝে অস্ফুট স্বরে অব্যক্ত ব্যথাগুলি মিনতি জানায় ।





মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে নিতে, মুখ গলা সব শুকিয়ে গেছে। কেউ আমাকে একটু পানি দাও। একটু। শুধু এক ঢোক। না ! এ আমি কি করছি ! পানি খেলে যে এখন আরও বমি পাবে। আগেও হয়েছে। নাহ ! পানি খাওয়া আর হয় না। দাঁতগুলি বারবার লেগে যাচ্ছে। ভাষা জড়িয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর চলমান সমস্ত বস্তু স্থির হয়ে গেছে। কোন অস্তিত্বই নেই। শুধুমাত্র একটি বস্তুর অস্তিত্ব টিকে আছে। খুব ভালোভাবেই টিকে আছে। যন্ত্রণা ! প্রচণ্ড যন্ত্রণা !





তোমরা কেউ আমাকে একটু সাহায্য কর। একটু দয়া কর আমাকে। এমন কিছু এনে দাও যাতে এই যন্ত্রণা আমি আর বুঝতে না পারি। না। বিষের কথা বলছিনা। একটু খানি হ্যালোথেন তো এনে দিতে পার। আমি একটু ঘুমাতে পারব। ভীষণ শান্তিতে।





নার্স এসে জিজ্ঞেস করে, ইজ ইট পেইনিং ?কোন জবাব দিতে পারিনা। শুধু বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা প্রচণ্ড জোরে চলতে থাকে। নীরব অভিমানে বুকের খাঁচা সজোরে ধাক্কায়। ডুকরে কেঁদে উঠে প্রতি মুহূর্তে বলতে থাকে, ইউ নেভার নো... ইউ নেভার নো...





আমার কি শেষ সময় সমাগত? আমি কি মারা যাচ্ছি ? তবে কি আমি আমার প্রিয় মানুষগুলোকে দেখে যেতে পারব না ? শেষ মুহূর্তেও না? নিদারুণ হতাশা গ্রাস করে আমাকে।





যন্ত্রণার সহ্যসীমার শেষ ধাপটিও পেরিয়ে গিয়ে, প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে হৃদয় নিংড়ে অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ে। অঝোরে। আমি অবিরত শুনতে থাকি ‘টপ টপ টপ’।





সেই শব্দে হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পাই। মনে হয়, আমি কাঁদছি ? ছি ছি ! শত ধিক্কার আমাকে! আমি তো পঙ্গু নই, জন্মান্ধ বা বধির নই। এই জীবনের অনেক গুলো বছর আমি সম্পূর্ণ নীরোগ কাটিয়েছি। তাহলে ? যে জন্মের পর থেকে এই পৃথিবীর রূপ, রস, গন্ধ সমস্ত কিছু থেকে বঞ্চিত, আমার কষ্ট কি তার কষ্টকে ছাপিয়ে যেতে পারে? কখনই না।





হ্যাঁ ঠিক আজ আমি অনেক বেশী অসুস্থ। জীবনের ভার বইতে না পেরে আমি এলিয়ে পড়েছি। কিন্তু আমার স্রষ্টা আমাকে পরম ভালবেসেই এই নিয়ামত দিয়েছেন। তা কি করে আমি ভুলে গিয়েছি। হীরা আর কয়লার মূল একই। আমার প্রিয়তম কয়লার আবরণ সরিয়ে হীরের দ্যুতিতে উজ্জ্বল করতে চাইছেন বলেই তো আমাকে এই কষ্ট সহ্য করতে হবে। পাপী বান্দাকে রাহমানুর রাহিম নিষ্কলুষ, স্বচ্ছরূপে চাইছেন। আর আমি কিনা অবুঝের মত...। ছি !





যেন এক দমকা হাওয়া আমার সামনে থেকে একের পর এক পর্দা উঠিয়ে, আমার প্রিয়তমের অভিসন্ধি জানিয়ে দিয়ে গেল। যন্ত্রণা টের পাচ্ছি এখনও। তবে তা আগের মত শক্তিশালী নয়। যে অশ্রু যন্ত্রণার ছিল, সেটিই এখন স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতার ভাষা হয়ে ঝরতে লাগল। অবিশ্রান্ত। আমি থামাতে পারছিনা। অবশ্য চাইছিওনা। ঝরুক যত ইচ্ছে।





এমন সময় নার্স এসে আবার জিজ্ঞেস করে, ইজ ইট পেইনিং?আমি সহাস্যে বলি, নো।





পুনশ্চঃ ভালো থাকাটা কক্ষনো একা শারীরিক নয়। আত্মিকও বটে। এবং আমার কাছে এটাই প্রবল ও সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ।
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দিল্লির রাজপথে তরুণদের ‘জেনজি ২.০’ অভ্যুত্থান এবং বাংলাদেশের জুলাই-পরবর্তী রূপান্তরের নির্মম বাস্তবতা

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৮

ভারতের রাজধানী দিল্লির বুকে যা ঘটে গেল, তা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সত্যিই অভূতপূর্ব। ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে ‘তেলাপোকা’ বা ককরোচ জনতা পার্টির... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিমানবন্দরে নির্ঘুম রাত (সাময়িক পোষ্ট)

লিখেছেন কাছের-মানুষ, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৭

আমার এখানে বাজছে রাত প্রায় দুটা! এখনো জেগে আছি। জেগে থাকার শানে নুযুল হলো, আমি অনেকটা ফাইসা গেছি! হায়দার সাহেবের গানের মতো, "আমি ফাইসা গেছি, আমি ফাইসা গেছি মাইনকা চিপায়!"... ...বাকিটুকু পড়ুন

মতামত পোস্ট: ১ আগস্ট ২৪ এ লেখা: আমার কথা ৯৫ ভাগ মিলে গেছে

লিখেছেন অর্ক, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৭



এবারের ছাত্র আন্দোলনের মূল যে দাবি বা উদ্দেশ্য, তা আসলে অত্যন্ত সাধারণ। সে সব সকল মাধ্যমে বহু চর্চিত, প্রচারিত ও আলোচিত। তাই পুনরাবৃত্তি থেকে বিরত থাকছি। আন্দোলনের নেতৃত্ব যারা দিচ্ছে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ম্যান মেড প্রাণীজ দুগ্ধ......

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৯



ম্যান মেড প্রাণীজ দুগ্ধ......

বির উনি একজন গোয়ালা (গোয়ালিনী)। তাহার নিজের কোনো গরু(গাভী) নাই। তারপরও তিনি দৈনিক প্রায় একশত লিটার দুধ বিক্রি করেন। নিজের 'কয়েকজন বান্দা কাস্টমার আছে'।... ...বাকিটুকু পড়ুন

এলপিজি কার্ডে সংকট কমবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:১৬


অনেক হতাশার মধ্যেও মাঝেমধ্যে সরকারের কোনো ভালো উদ্যোগের খবর দেখলে ভালো লাগে। অন্তত মনে হয়, সাধারণ মানুষের কষ্টের জায়গাগুলো নিয়ে সরকার কিছুটা হলেও ভাবতে শুরু করেছে। তেমনই একটি খবর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×