নামের আদ্যাক্ষর ‘আ’। এই মেয়েটির গল্পই শোনাবে আজ।
বয়স ১৪/১৫। খুব সুন্দরী বলতে যা বোঝায় তা ছিল না। তবে আকর্ষণীয় বলতে যা বোঝায়, ঠিক সেরকম। স্মার্ট, ফ্যাশনেবল, গ্ল্যামারাস।এক কথায়, তথাকথিত আধুনিক বলতে যা বোঝায়। তবে ভদ্র ছিল। উগ্র পোশাক কখনই পরত না। সমাজ,পরিচিতদের কাছে ভদ্র, স্মার্ট, সুন্দরী হিসেবে আলাদা একটা জায়গা করে নেয়। ছোট থেকে বড় সবাই তার তাকে ফলো করে। তার মত হওয়ার চেষ্টা করে। ছেলেরা তো অবশ্যই মেয়েরাও তার রূপমুগ্ধ। কাছের মানুষেরাও(মেয়েরা) তার রূপের কারনে অহেতুক তার সাথে শত্রুতা করতে পছন্দ করতে থাকে।
রাস্তায় বের হলেই চারপাশের মুগ্ধ দৃষ্টি দেখে ভালই লাগত। যারা নারী সবাই জানবেন, এমন যদি একটি মেয়ে রাস্তায় বের হয়, তাহলে সম্পূর্ণ পথটা নির্বিঘ্ন হয়না। চারপাশ থেকে অসংখ্য মন্তব্য শুনতে হয়। কিছু সহ্য করা গেলেও সব সহ্য করা সহজ হয় না। মোবাইলে সারাদিন অসংখ্য কল, এস এম এস, অসংখ্য মানুষের প্রেমের আকুতি। মেয়েটির কারো সাথে এধরনের সম্পর্কে জড়ানোর কোন ইচ্ছে ছিলনা। তাই যথাসম্ভব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত। বিশেষ করে তার পরিবারের অসম্মান সে করতে চায়নি।
কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও এড়িয়ে যাওয়া যেত না। কেউ কেউ তার পরিবার, তার সম্পর্কে সব কিছু জেনে এগোয়। এদের থেকে সহজে রেহায় পাওয়া যায়না। স্কুল, কলেজ থেকে যখন চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ নিয়ে বের হত, অত্যন্ত কষ্টের সাথে খেয়াল করত, তাকে ফলো করা হচ্ছে। ফলো করা থেকে রেহায় পেতে, মাঝেই নিজের বাড়ি আসার আগে বান্ধবীর বাড়ি থেকে ঘুরে আসতে হয়। প্রেম করতে রাজী না হলেই,কেউ কেউ নাম্বার বাজে কারো হাতে দিয়ে বাজে কথা বলতে বলেছে। বলেছেও । মেয়েটি সারারাত কেঁদেছে; নির্ঘুম থেকেছে; প্রচণ্ড অপমানিত হয়েছে। কিন্তু কিছুই করতে পারেনি। আর সাথে ‘রাজী না হলে, অমুক সময়ের মধ্যে আত্মহত্যা করছি’ এসব সহ নানান ধরনের হুমকি তো আছেই।
একসময়কার ভালো লাগার সে প্রশংসা বাক্যগুলি তার কাছে তির্যক শেলের আকার ধারন করল। সে আস্তে আস্তে বুঝতে পারল, রূপের প্রশংসা পাওয়া আসলে গৌরবের কিছু না। সীমাহীন লজ্জার । সীমাহীন অপমানের। রাস্তায় অনেক ধরনের লোকের চলাচল। একটা বিয়েবাড়ী, মোটকথায় যেকোনো পাবলিক প্লেসে অনেক রকমের লোকের উপস্থিতি থাকে। কারো চিন্তা ভাবনা উঁচুমানের কারো বা পশুকেও হার মানায়। একটি মেয়ে জ্ঞানশক্তি লাভ করার পরই পশু দৃষ্টি সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যায়।
ছোট পশু, মাঝারি পশু, বড় পশু। সমাজে বিভিন্ন সাইজের এইসব পশুরা ভদ্রতার মুখোশ পরে থাকে। স্বাভাবিক চোখে এরা ধরা পরে না। এরা ভদ্রতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, সুযোগ খোঁজে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছেতো ?! একটুও মিথ্যে নয়। আপনার চারপাশেই এসব পশুদের বাস। পশুরা পশুত্বকে বরণ করে অর্থ খরচ করে পতিতালয়ে যায়। এসব যুগ যুগ ধরে হয়ে আসছে। হতে থাকবে। মানুষরূপী পশুগুলো একটি মেয়েকে ভোগ্যপণ্য ছাড়া কিছু মনে করতে পারেনা। তাদের ভাষায় মেয়ে মানেই ‘মাল’। আর এভাবে বেপর্দা চলা মানে হচ্ছে, পশুগুলোকে চোখের তৃপ্তি দেয়া।
তাহলে একটা ভদ্র মেয়ের পর্যায় কোথায় গিয়ে দাড়ায় ? পতিতারা যে কাজ করে তার কাছাকাছি নয়কি ? মেয়েটি সব বুঝতে পারল।
এক কথায় জীবন একেবারে অতিষ্ঠ; যন্ত্রণায় জর্জরিত হয়ে উঠল। পড়াশুনা, মানসিক স্বাস্থ্য সবকিছুর উপর চাপ পড়ল। পারিবারিকতায়, সামাজিকতায় সবকিছুতেই প্রতিফলন দেখা গেল। অতটুকুন একটা মেয়ের পক্ষে এ যে অনেক বড় ভার। সারাদিন নিরস বদনে থাকে আর এর সমাধান খোঁজে। ভেবে ভেবে সময় গড়ায়, সমাধান মেলেনা। মাঝে মাঝে এসব অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ভাবে, আত্মহত্যায় একমাত্র পথ।
না ! শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করতে হয়নি তাকে। সে এখন অনেক সুখী, তৃপ্ত ,আল্লাহ্র এক কৃতজ্ঞ বান্দা। কিভাবে ? বলছি…
আল্লাহ্র অসীম রহমত তাকে পথ বাতলে দেয়। যেন এক পর্দা সরে গিয়ে তার দৃষ্টি স্বচ্ছ করে দিয়ে গেল। সে আনন্দের সাথে অনুভব করল, পর্দাই এসব অপমান থেকে তাকে বাঁচাতে পারে, সম্মানিতা করতে পারে। তথাকথিত সমস্ত গ্ল্যামার, ফ্যাশন, আধুনিকতাকে সে ঝেটিয়ে দূর করল।
অত্যন্ত আশ্চর্যের সাথে বুঝতে পারল, তার চারপাশ তার সাথেই পরিবর্তিত হয়ে গেছে। এক নিমেষেই। আশপাশের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন তাকে আনন্দ দিল; অনেক শান্তি দিল। তার জীবনে আল্লাহ্র রহমত নেমে এল।
কাহিনীটি এখানেই শেষ হলে ভালো হত। তাইনা ? কিন্তু শেষ হইয়াও হইলনা শেষ।
পর্দা সে ঠিকই করত; মুখখানা শুধু দেখতে পেত সবাই। এতেই যত বিপত্তি !
প্রেম নিবেদন কমল বটে। কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ হলনা।
বান্ধবীর ভাই সম্পর্কীয় আত্মীয় নতুন বিয়ে করা বউকে নিয়ে বোনকে দেখাতে এসেছে। বান্ধবীর সাথে মেয়েটিও নতুন ভাবিকে দেখতে গেল। আর বান্ধবীর ভাইটি চট করে মেয়েটিকে বেজায় পছন্দ করে ফেলল। মেয়েটি দেখতে পেল, নতুন বউয়ের পাশে দাঁড়িয়ে, তার দিকে চেয়ে থাকা মুগ্ধ দৃষ্টি।
প্রচণ্ড আঘাত পেল। আহত হল। ভীষণ কান্নাকাটি করতে থাকল। তার কষ্ট লাগছিল, নতুন বউটির জন্য। সে তো কোন অন্যায় করেনি। পুরোনো স্মৃতি তার কানে দুর্যোগের পূর্বাভাস শুনিয়ে গেল। ভীষণ শঙ্কিত হল; প্রচণ্ড অস্থির হল। বান্ধবীকে সব খুলে বলার পর, বান্ধবী ও তার মা মিলে সামাল দিল। আল্লাহ্র অশেষ কৃপায় সে যাত্রায় রক্ষা হল। উপলব্ধি আসল, পর্দা শুধু এটুকুই যথেষ্ট নয়। সম্পূর্ণ পর্দা করতে হবে। অসম্ভব সুন্দর পর্দার বিধান আল্লাহ্ সম্মানিতা নারীদের জন্য করে রেখেছেন। সেটি মানতে হবে। তাহলেই এ ধরনের উটকো সব শয়তানি ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে পারে এবং অনেককে মুক্তি দিতে পারে। সে তার জীবনে ধারণ করে নিল শাশ্বত কুরআনের বাণী...
“হে নবী! আপনি আপানার পত্নীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবেনা। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু”।---সূরা আহযাবঃ ৫৯
শারীরিক পর্দা করার পর, আস্তে আস্তে তার মধ্যে মানসিক পর্দার তাগিদ আসল। বোধোদয় হল, এমন সম্মানজনক একটি পোশাক যে ধারণ করে, তাকে আরও অনেক পবিত্র হতে হবে। সে আল্লাহ্র দিকে হেঁটে অগ্রসর হয়েছিল; আল্লাহ্ তার দিকে দৌড়ে আসলেন। তার সমস্ত জীবনধারা পাল্টে গেল। ইসলামের সব কিছুই মেনে চলার চেষ্টা তার মাঝে। এখন সে অন্য যেকোনো মেয়ে থেকে ভিন্ন। সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ তার জীবন।
বিঃদ্রঃ গল্পটি সম্পূর্ণ সত্য।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


