শৈশবের বেশ কিছুটা কাটিয়েছি ঢাকার মুগদায় । ঐ এলাকায় তখনও পুরান ঢাকার ফ্লেভার ছিল ।
শবে বরাত মানে আমাদের মতো শিশুকিশোরদের জন্য তখন আতসবাজি পুড়ানোর রাত । দোকানে দোকানে পসরা সাজিয়ে বসতো লাল, নীল, হলুদ, কমলা, সবুজ ইত্যাদি রঙের পটকা । কোনটি ছোট্ট গোলআলু আকৃতির, কোনটি কালোজামের মতো ছোট । মাটিতে জোরে আঘাত করলে সশব্দে বিস্ফোরিত হতো সেগুলি আধুনিক ককটেলের মতো । কিছু পটকা থাকতো এক হাত দীর্ঘ কঞ্চির মাথায় । দেয়ালে বাড়ি মেরে ফাটাতাম ওসব ।
শক্তিশালী পটকাগুলি ছিল শাদা রঙের । দেখতে হোয়াইট বোর্ড মার্কারের মতো । আকৃতিতে একই রকম কিংবা আরও কয়েকগুন বড় । পটকার মাথায় লেজের মতো বেরিয়ে থাকতো ফিউজ । সে ফিউজে আগুন লাগিয়ে দূরে ছুঁড়ে দিয়ে কানে আঙুল ঢুকাতাম আমরা ।
বুম্ । পিলে চমকানো শব্দে ফাটতো ওগুলো । নষ্ট হয়ে গিয়ে থাকলে স্মোক বম্বের মতো হুশশ্ করে বেশ কিছু ধোঁয়া উগড়ে দিয়ে নিস্ক্রীয় হয়ে যেতো ।
আরেকটি আকর্ষনীয় বস্তু ছিল তখন ‘তারাবাতি’ নামে । সিলভার কালারের দাহ্যবস্তুর মিশ্রনের প্রলেপ লাগানো কয়েক ইঞ্চি দীর্ঘ দন্ড । মাথাটিকে আগুনে উত্তপ্ত করলে হাজারো স্ফুলিঙ্গ চতুর্দিকে ছড়িয়ে বেশ কিছুক্ষন তা অন্ধকারে আলোক বিকিরন করতে করতে জ্বলতো । নিভে যাওয়ার আগে আমরা সেই সব স্ফূলিঙ্গস্ফুরিত দন্ডগুলিকে আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিতাম কার মাথায় পড়বে তা সামান্যতম চিন্তা না করে ।
সে সময় নরসীংদি ছিল এসব পটকা বানানোর জন্য বিখ্যাত । পটকার অসংখ্য দোকান ছিল নরসিংদী বাজারে । সারা বছরই পটকা বিক্রী হতো সেগুলিতে । বিয়ে শাদী জন্মদিন উপলক্ষ্যে মানুষ সেসব কিনে নিয়ে যেতো ।
আমার দাদাবাড়ি নানাবাড়ি ওদিকে হওয়াতে শবে বরাতের আগে আগে আমি কমলাপুর রেল স্টেশনে গিয়ে ট্রেনে চেপে নরসিংদী যেতাম কেবলমাত্র পটকা কেনার উদ্দেশ্যে । কারন শবে বরাতের আগে আমাদের ডানপিটে গ্রুপের বিরাট প্রস্তুতি নেয়ার ব্যাপার ছিল ।
শবে বরাতের রাতে লোকেরা মসজিদে যেতো । আমরা দুষ্ট ছেলের দল রাস্তার পাশে অন্ধকারে আচমকা পটকা ফাটিয়ে তাদের পিলে চমকে দিয়ে পালিয়ে যেতাম । মানুষকে ভয় দেখানোতে মনে হয় শিশুদের বিরাট আনন্দ ।
সে বয়সেই আমরা টাইম বোম্বের প্রচলন ঘটিয়েছিলাম । ফিউজ লাগানো সাদা ও লম্বা পটকাগুলির ফিউজের সাথে জ্বলন্ত আগরবাতি জুড়ে অন্ধকার রাস্তায় নিরিবিলি কোন স্থানে সুবিধামতো যায়গায় পেতে রেখে আলগোছে সট্কে পড়তাম । তারপর দূরে গিয়ে দুরুদুরু বক্ষে অপেক্ষা করতাম সেসব ফাটবার আশায় ।
ওগুলি ফাটতো এবং আচানক আতংকিত পথচারীদের মুখ থেকে ছোটা গালির তুবড়ি শুনে আমরা খিক খিক করে শয়তানের হাসি হাসতাম । মানুষের গালি খেয়েও সে বয়সে মজা পেতাম ভীষন ।
মুগদাপাড়ার কাছ দিয়ে গেলে পুরানো সেসব দিনের কথা আজও মনে পড়ে । ঢাকা এখন অনেক বদলে গেছে । যদিও পুরানো ঢাকা নিজেদের পুরানো কিছু ঐতিহ্যকে এখনও টিকিয়ে রেখেছে ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



