
আমাদের ঝাল খাওয়ার ইতিহাস হাজার বছরের নয়, তবুও কেন আমরা ঝাল পাগল জাতি হলাম এইটা নিঃসন্দেহে গবেষনার বিষয়। পর্তুগীজেরা না আসলে আমরা হয়তো কাঁচা লঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা চিনতাম শুধু এটা সম্ভবত রন্ধনশালায় এভাবে একচেটিয়া অনুপ্রবেশ করতে পারত না। এটা ঠিক যে, গরমের বাসিন্দারা ঝাল আর টকের ভক্ত হয়- ও হ্যাঁ তিতে খাবারটাও উষ্ণ অঞ্চলের গুডবুকে আছে, কিছু বাঙ্গালীর অতি ঝালপ্রীতি দেখে মনে হয় আমাদের ডি এন এ তে 'ঝাল্লাগে ভাল্লাগের' আলাদা স্পেশাল ডায়াগ্রাম করা আছে।
এদেশের কিছু অংশের মানুষ চুইঝাল খায়, কিছু এলাকায় পিপুল , গোল মরিচ আর আদা সাথে বাঙ্গালীর আদি খাদ্য সরিষা সর্বসাকুল্যে এই ছিল আমাদের সারা উপমহাদেশের ঝালের মুল উতস- আর এখন এর সবগুলি মিশিয়ে আমরা একসাথে খাই তারপরেওসালাদে কখানা কাচালঙ্কা ঠেসে দিই কিংবা পাতে দুখানা লঙ্কা না হলে চলে না। ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা যেন আরো বেশী খ্যাপাটে ঝাল পাগল। এই বঙ্গে চটপটি নামের প্রায় অখাদ্যের উৎপাত একরকম তাদের উসিলাতেই।
ছোট বেলায় শুধু লাল মরিচ রা রশুন দিয়ে বেটে সেটায় খানিক সরিষার তেল দিয়ে মেখে লাল আউস চালের বাসি কড়কড়ে ভাত ভাল করে পিষে মেখে খেয়ে দাওয়ায় বসে ছয় ইঞ্চি জিভ বের করে লালা ঝড়াতাম। তারপরেও ওই যে মুজতাবা আলী সাহেবের বিখ্যাত উক্তি ' ঝাল্লাগে-ভাল্লাগে'। ঝালের ভাল লাগার মোহ থেকে নিস্তার ছিল না।
রাশিয়ায় গিয়ে বুঝলাম ওই তল্লাটে কস্মিনকালেও কলম্বাসের বংশধরদের পা পড়েনি। যে জাতির ভাষাতেই ঝাল বলে কোন শব্দ নেই সেই জাতির ঝাল পছন্দ হয় ক্যামনে!
ওখানে গিয়ে এই ঝেলো বাঙ্গালী কি পানসেকলেই ( ঝালহীন খাবার সব পানসে লাগে) না পড়লাম! মরিচ মনে করে যেটার উপরেই ঝাপিয়ে পড়ি সেটাই মিষ্টি মিষ্টি লাগে। প্রথমে ক্যাপসিকামে স্বপ্নভঙ্গ ( ওরা বলে সালাদকি পেরেতস বা বলগারিসকি পেরেতস- মিষ্টি মরিচ) এরপর অনেক সখ করে জেলোপিনো কিনে এনে চোখের শুধু জল ঝড়েছে নাকের জল আর ঝড়েনি, এটাকে রাশিয়ানেরা নাকি কটু মরিচ ঝাল মরিচ কিংবা তিতে মরিচ হিসেবে বরন করেছে, আশ্চর্যজনকভাবে এই মরিচ রাশিয়াতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় আমার অবস্থানকালেই।
এখন রাশিয়ার হেঁশেল এই মরিচ ছাড়া অচল প্রায়! ও পাড়ায় ঝাল বলতে বোঝে ওরা চিয়োরনি(কালা) পেরেতস মানে 'গোল মরিচ' বোঝে। এই মশলাটা আমাদের হেঁশেলে ঠান্ডা লাগলে চায়ে আর মাংসে ব্যবহার হোত।গুড়ো করে খাওয়া তখনো আমরা শিখিনি। কোথাও গিয়ে ঝালের জন্য মন আঁকুপাঁকু করলে ঐ ছাইভস্মের গুড়ো খানিকটা মিশিয়ে মনকে শান্ত করতাম।
ঝাল আলু টম্যাটো সব পর্তুগীজদের অবদান। টম্যাটো একটু ধীরে সুস্থে আমাদের রান্নাঘরে যায়গা করে নিলেও আলু আর লঙ্কা নিয়ে এখনো আমরা লঙ্কাকান্ড ঘটাচ্ছি। টম্যাটো কে আগে বাঙ্গালীরা বলত 'টক বেগুন'। এটা বিষাক্ত কোন সবজি ভেবে অনেকেই ঠিক সাদরে গ্রহন করতে পারেনি কিন্তু খেয়াল করে দেখবেন টম্যাটো নয় বরং আলু আর লঙ্কা আমাদের সাস্থ্যের সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে। আমরা দেশী টম্যাটো বলে যেটা খাচ্ছি সেটা আদৌ আমাদের দেশীই নয়।
ওদিকে আমাদের দেশী ধাইন্যা মরিচ কিভাবে আমাদের মরিচ হোল আর শুকনো মরিচ ঠেসে আলু ভর্তা কে শিখাইল সেইটা আমার বড্ড জানতে অন চায়??
বাঙ্গালী পরনন্দা পরচর্চার বিশ্বরেকর্ডধারী জাতির পাশাপাশি কিন্তু চরম পরসহিষ্ণু জাতি।
লক্ষ্য করে দেখবেন যে, যে জাতি এদেশে এসেছে তাদের খাবার পোশাক ধর্ম আর ভাষা নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে গেছে!!
আমাদের আদৌ নিজেদের কোন পোশাক নেই, সংস্কৃতি নেই, ধর্ম নেই, ভাষা নেই, দর্শন নেই, খাবার নেই, পছন্দ অপছন্দ কিচ্ছু নেই। খাদ্যে আমরা তেলাপোকা সম; সর্বভুক।
ইদানিং যদিও বাঙ্গালী মুসলিমরা হারাম-হালাল খাবারের চক্করে ধর্ম জাত দুটোই হারানোর আশংকায় ঘন ঘন হালাল দেশ সৌদিতে যায় উমরাহ্ করতে।
শালার বৈদেশে গেলে হালাল খাবার খুজতে খুঁজতে ভ্রমনের রসটাই মাঠে মারা যায়। দেশে এসে একই গল্প; যে কোন খাবার খাইতেই ভয় করে মনে হয় গরুর মাংস শুয়োরের তেল দিয়ে ভাজছে। সেদিন দেখলাম চীনে মুসলিম পাড়ায় এমন কি উইঘুরে পর্যন্ত মুসলমান রেস্টুরেন্ট মালিকেরা দেদারসে শুয়োরের মাংসের পদ বিক্রি করছে; লে ঠ্যালা সামলা!!
ডিম আগে না মুরগী আগে সেটার মত আলু আগে না সিঙ্গারা আগে কিংবা আলু আগে না আলুর দম আগে। আমাদের সিঙ্গারা পাগল 'ভুয়া মফিজ' ভাই এটার উত্তর দিতে পারলেও পারেন।
যাই হোক আজ দুপুরে ভাত খাবার সময়ে দুইখানা কাঁচা লঙ্কা(আচ্ছা ওপারের বাঙ্গালীরা কেন লঙ্কা বলে আর আমরা বলি মরিচ?) চিবাইতে চিবাইতে ঘুরে ফিরে আমার মনে একটাই প্রশ্ন আসে - রাশিয়ানেরা কেন ঝাল খায় না আর বাঙ্গালীরা কেন ঝাল পাগল হইল? কেউ কিছু কইতে পারেন?
ফুটনোটঃ শাহ্ আজিজ ভাই বেজায় অসুস্থ ! উনি সম্ভবত দীর্গদিন ব্লগে আসেন না।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




