হঠাৎ বিদু্যৎ চলে যায়, চারদিকে নেমে আসে অন্ধকার, এত সুন্দর দু'টি চোখ যেন বিকল, দৃষ্টিহীনতায় দৃষ্টিসম্পন্নতার মত চোখ আর তথ্য প্রেরণ করতে পারছিল না মস্তিষ্কে, বন্ধ হয়ে গেল দেহ নামক এই জটিল কারখানাটির একটা গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। দৃষ্টির অন্ধকারের মত আমাদের জীবনে আরেকটি অন্ধকার অধ্যায় রয়েছে, আর তা হচ্ছে জ্ঞানের অন্ধকার। দৃষ্টি আমাদেরকে দেখায় যা কিছু তার সামনে পায়, কিন্তু আড়ালের কোন বস্তু কিংবা অন্ধকারের কোন কিছুতেই তার অধিকার নেই। এই দেখুন না, বিদু্যত চলে যাওয়াতে এমনি একটি অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলাম আমরা। আলো পেলেই শুধু দৃষ্টি পারে তার বাহকের জীবনকে রঙে রঙে সাজাতে, পারে পথ দেখাতে, ভাল-মন্দ বেছে নিতে, একের সাথে অন্যের পরিচয় ঘটাতে; অন্যথায় সবকিছু ভুল, অন্ধকার।
দৃষ্টি খোঁজে যুক্তি, তথাপি যদি আলো তাকে দেখতে সাহায্য করে, নয়তো সে মূল্যহীন। বলাবাহুল্য, এই আলো অবশ্যই সত্যজ্ঞানের আলো। আর তাই দৃষ্টিবাদী কিংবা যুক্তিবাদীরা ঝড়ের রাতের অন্ধকার পথের পথিকের মতই অসহায়, করুণার পাত্র; আকাশে বিদু্যৎ চমকালে তারা তাদের পথে একটু চলার সাহস পায়, তারপর আবার থমকে দাঁড়ায়, বজ্রপাতের শব্দে তারা তাদের কানে আঙ্গুল দেয়, ভাবে- হয়তো শব্দ শুনতে না পেলে বেঁচে যাবে বজ্রাঘাত থেকে। কারণ, এর বাইরে তো যাবার কোন সুযোগ নেই তাদের। জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশের সিংহদ্বার যে তাদের জন্য মোহরাঙ্কিত সিন্দুকের মতই অপ্রবেশ্য সত্য, অন্যকথায় সে নিজেই অজ্ঞানতা-অহংকারবশতঃ তার মস্তিষ্কে সত্যের জ্ঞান বা আলো প্রবেশের পথে কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে রেখেছে।
মহান আল্লাহ্ এদের সম্পর্কে বলেন ঃ "তারা বধির, বোবা, অন্ধ, কাজেই তারা ফিরে আসবে না। কিংবা আকাশ হতে মুষলধারে বৃষ্টির ন্যায়, যাতে রয়েছে ঘোর অন্ধকার, বজ্রধ্বনি ও বিদু্যৎ চমক। বজ্রধ্বনিতে মৃতু্যভয়ে তারা তাদের কানে আঙ্গুল দেয়। আর আল্লাহ্ কাফেরদেরকে পরিবেষ্টন করে রয়েছেন। বিদু্যৎ চমকে তাদের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেয়ার উপক্রম হয়। যখনই বিদু্যতালোক তাদের সামনে উদ্ভাসিত হয় তখনই তারা পথ চলে এবং যখন অন্ধকারে ঢেকে যায় তখন তারা থম্কে দাঁড়ায়। আল্লাহ্ ইচ্ছে করলে তাদের শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি হরণ করতে পারেন। আল্লাহ্ সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান।" [সূরা আল-বাকারাহ্ ঃ 18-20]
পক্ষান্তরে, মানবের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ যে মহামূল্যবান বিবেক, এখানে যদি রূপক-দৃষ্টিতে সেই বিবেককে এই দেহরাজ্যের রাজা ধরি, তাহলে দৃষ্টি মূলতঃ সেই জ্ঞানসমৃদ্ধ বিবেক-মহারাজের অধীন এক আজ্ঞাবহ ভৃত্য মাত্র। আমাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা পথ-বিপথের যে ধারাতেই চলুক না কেন, সত্যজ্ঞানসমৃদ্ধ বিবেকই তাকে দিতে পারে সঠিক সিদ্ধান্ত আর এ সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য চোখ বিবেকের দরবারে যে তথ্য পেশ করে, সেটার ভাল-মন্দ বিচার-বিশ্লেষণ করতে বিবেক সাহায্য নেয় জ্ঞানের এবং জ্ঞানের অনুপাত, সত্য-মিথ্যা ও প্রখরতা অনুযায়ী বিবেক সিদ্ধান্ত দান করে থাকে। আবার কখনো কখনো বিবেক তার প্রয়োজনেই কাজে লাগায় চক্ষুকে। চোখ তাকে তথ্য প্রদান করে যে, গাছের পাতা নড়ছে, কিন্তু কেন নড়ছে এটা দেখার-বলার-বুঝার ক্ষমতা তার নেই; অথচ চোখের দৃষ্টির বা দৃষ্টিবাদীর কিংবা অন্য কথায় যুক্তিবাদীদের এহেন শোচনীয় অবস্থায় জ্ঞানই তার অন্যান্য সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বিবেককে এই সিদ্ধান্ত দেয় যে, গাছের পাতা নড়ার কারণ হচ্ছে বাতাস; যে তথ্য তাকে দিয়েছে বিবেকের স্নায়ূ নামক ভৃত্য বা তথ্যসংগ্রাহক, যদিও স্নায়ূর আবার দেখার শক্তি নেই। তেমনি আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়ের কারুরই নেই নিজস্ব কোন সম্পূর্ণতা; বরং প্রত্যেকেই নিজ নিজ কাজ বুঝে নিয়ে শুধু আদেশ পালন করে যাচ্ছে মাত্র। তাই কোন সচেতন মানুষই জ্ঞানসমৃদ্ধ বিবেকের মত শক্তিধর মহারাজকে অবজ্ঞা করে চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও স্নায়ূ নামক ভৃত্যদেরকে নিজের জন্য সহায় ভাবে না। উল্লেখ্য যে, এখানে বিবেক মূলতঃ বিশ্লেষক, পঞ্চইন্দ্রিয় প্রদত্ত তথ্যাবলীকে জ্ঞানের দ্বারা বিশ্লেষণ করে মানুষকে কোন সিদ্ধান্তে পেঁৗছতে সাহায্য করে থাকে।
আমাদের সমাজের অনেকেই রয়েছেন যাদের কারো চোখ নেই, কেউ কানে শোনে না, কারো শরীরের কোন একাংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত, কিন্তু তারা যদি হন সুস্থ বিবেক ও সুস্থ জ্ঞানের অধিকারী তাহলে এই জ্ঞান দ্বারা অন্য সবার মতই সমাজদেহের একটা বিরাট অংশ হয়ে নিজেদের ভূমিকা সমুন্নত রাখেন। অন্যদিকে এই পঞ্চইন্দ্রিয়ের সবগুলো সুস্থ-সম্পূর্ণ থাকার পরও যদি শুধুমাত্র জ্ঞান লোপ পায়, তাহলে তার সবকিছুই নিঃশেষ হয়ে গেল। চোখ, কান, নাক, জিহ্বা, ত্বক তারা প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করে তথ্য সংগ্রহ ও প্রেরণ করে বিবেকের সমীপে, কিন্তু জ্ঞান কার্যকর না থাকায় বিবেকও তখন সঠিক বিশ্লেষণ-ক্ষমতা হারিয়ে এসব তথ্যের কোনই সদ্বেবহার করতে পারে না। বিশেষজ্ঞরা তাই মানুষের ষষ্ট বা সবচেয়ে সেরা ইন্দ্রিয় হিসেবে জ্ঞানসমৃদ্ধ বিবেককে আখ্যা দিয়ে থাকেন; যার কারণেই মানুষ সত্যিকারের মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয় দান করতে পারে। এর অভাব ঘটলে বাকী সুস্থ-সবল দেহটির জন্য আমরা পাগল, উন্মাদ এজাতীয় শব্দাবলীই খুঁজে পাই অভিধানে।
যুগ যুগ থেকে আজ অবধি যারাই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, তাদের পঞ্চইন্দ্রিয় যে তথ্য দান করবে তার ভিত্তিতেই তারা যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, অন্যকথায় জ্ঞানের যে নিজস্ব স্বকীয়তা রয়েছে, রয়েছে দেখার, শোনার, অনুভব করার, স্বাদ-গন্ধ নেয়ার যোগ্যতা, তাকে নিতান্তই হীন মনে করে আপনাপন ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে বাহ্যিক বিচার-বুদ্ধি খাটিয়ে বিবেককে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে, তারা নিজেরাই মূলতঃ অজ্ঞতা, মূর্খতা আর গোঁড়ামীর আবরণের পর আবরণ বিছিয়ে ঢেকে রেখেছে তাদের বিবেকের সকল সত্যবাদীতাকে এবং স্রষ্টা-প্রদত্ত জ্ঞানের মহাসীমান্তের বহুলাংশ, যার কোন ব্যবহার নেই তাদের জীবনে। সবকিছুকেই বিশ্লেষণ, ব্যবচ্ছেদ আর জটিল থেকে জটিলতর করে বুঝার চেষ্টায় নিরন্তর প্রাণান্ত তারা। সহজ করে বুুঝার ক্ষমতা তারা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলে। কারণ, যদি কিছু না দেখে তো সাথে সাথেই সিদ্ধান্তে আসে যে, তা নেই, আবার যদি শুধু শোনে তো বলে, দেখি না কেন, সুতরাং তাও অবিশ্বাস্য, আরো আরো পঁ্যাচানো ধারা-বর্ণনায় ভরপুর তাদের সমস্ত প্রকাশ।
পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, পঞ্চইন্দ্রিয়ের কাজ শুধুমাত্র তথ্য প্রদান। আর সিদ্ধান্ত প্রদান করে থাকে সুচিন্তিত-বিজ্ঞ-সত্যজ্ঞানসম্পন্ন বিবেক-বিচারক; যার উপর প্রতিটি মানুষের পূর্ণ আস্থা বিদ্যমান, চাই সে তা মুখে স্বীকার করুক আর নাই করুক। বিবেক, প্রকৃতিগতভাবেই সত্যবাদী ও সুবিচারক, জ্ঞান যাকে আরো বেশী সমৃদ্ধ করে তোলে, অবশ্য যদি তা হয় সত্য এবং যথাযথ। অন্যথায়, হাঁড়িতে যা আছে তাই বেরুবে, এর বেশী কিছু নয়। এখন ব্যক্তি যদি তার কোন একটি ইন্দ্রিয় প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পেঁৗছুতে চায় তো বিবেক তাকে অবশ্যই বাধা দেবে, কিন্তু অজ্ঞানতা-মূর্খতার কারণে এই বাধা এতই দুর্বল হয় যে, তখন ব্যক্তির অসদিচ্ছার কাছে দুর্বল বিবেকের এই বাধা প্রবল জোয়ারে তুচ্ছ খড়-কুটোর মতই ভেসে যায় এবং তার নিজের ভুবনে ঘটে সত্যের পরাজয়; যদিও ইচ্ছের প্রাবল্য তখন তাকে এই বুঝিয়ে থাকে যে, এটাই তো সত্য; এছাড়া আবার সত্য কি? কিন্তু আগ্নেয়গিরির সুপ্ত লাভার মতই আজীবন তাকে ভেতরে ভেতরে পুড়িয়ে খাক করতে থাকে তার বিবেক-বিরুদ্ধতা।
একারণেই সবসময় দেখতে পাবেন যে, যারাই শুধুমাত্র ইন্দ্রিয়লব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে চায়, তাদের কথা-বার্তা, আচার-আচরণ, লেখনী ইত্যাদিতে দারুন অসহায়ত্ব, প্রাণান্ত সন্ধান, হতাশা অবশেষে আদি-অন্ত একটাই থেকে যায় 'প্রশ্ন', যার উত্তর পৃথিবীর আদি থেকে খুঁজেও তারা আজো খুঁজে পায়নি। তাদের যুক্তির অবতারণা করে ভাবলে যে কেউ স্পষ্ট দেখতে পাবে যে, তারাও এক অর্থে পঙ্গু বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত; ষষ্ট ইন্দ্রিয়ের অভাবে, অব্যবহারে কিংবা ভুল ব্যবহারে। যাকে তারা প্রকৃতি বলে ডাকে, তাদের উচিত সেই প্রকৃতির চিরন্তন নিয়ম-নীতিগুলো সকল কদর্যতা ও পক্ষপাতিত্বহীন (তাদের ভাষায়) মুক্তমনে একটু পর্যবেক্ষন করে দেখা। তারা অবশ্যই দেখতে পাবে যে, আকাশে-যমীনে-অন্তরীক্ষে সবকিছুই ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় তাদের নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলছে, এমনকি তার নিজের দেহাখানাও। তাহলে কি চাও? কেন চাও? ফলাফল কি? কেন ভেবে দেখ না এইসব প্রশ্নের ভবিষ্যৎ ফলাফল?
মানব সমাজের এহেন সদস্যদের এখনো ভেবে দেখতে বলছি, ভেবে দেখুন আপনার-আমার স্রষ্টা আল্লাহ্ রাব্বুল 'আলামীন কি বলেছেন, তিনি বলেন ঃ
"তারা কি চায় আল্লাহ্্র দ্বীনের পরিবর্তে অন্য দ্বীন? অথচ আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে সবকিছুই ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে! আর তাঁর দিকেই তাদের ফিরিয়ে নেয়া হবে।" [সূরা আলে-ইমরান ঃ 83]
এখানে দ্বীন বলে জীবন ব্যবস্থাকে বুঝানো হয়েছে, আর "অন্য দ্বীন" হতে পারে নিজের মনগড়া কোন মতবাদ বা পথও। প্রতি পদে পদে আমরা আমাদের স্রষ্টার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি, সুতরাং কেন এই বিভ্রান্তি? মানুষের জীবনের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করলে বিবেচক মাত্রই নিশ্চিত যে এমন একটি সময় দুনিয়াতেই আসে, যখন মানুষ তার অতীতের জন্য অনুতপ্ত হয়। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটির ব্যাপারে যদি সে ভুল করে বসে আর অনুতাপ-সংশোধনের সময়ও না পায় অবশেষে, তাহলে কি বলবেন আপনারা এই হতভাগার ব্যাপারে? আহা! বেচারা ভুল বুঝতে পেরেও প্রায়চিত্ত করে যেতে পারলো না! এই নয় কি? পৃথিবীর প্রতিটি বস্তুর কোন না কোন স্রষ্টা, একত্রিকারক, রূপদানকারী বা পরিচর্যাকারী থাকে, তাহলে মানবজীবন কি এতই মূল্যহীন যে তার কোন স্রষ্টা থাকবে না, থাকবে না পরিচর্যাকারী প্রতিপালক?
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




