মনে পড়ে কত কিছুই, অতীতের পাওয়া-না পাওয়ার কত অনুভূতিই, আনন্দ-নিরানন্দের স্মৃতি-গাঁথায় ভরপুর জীবনের পেছনের পথটাকে মনে করিয়ে দিলেন।
ঝুলনের বাক্যপ্রয়োগগুলো দেখে প্রথমেই যা মনে পড়লো- ব্যাপারটা প্রথম ঘটে নারিকেল গাছে, গ্রীষ্মের দুপুরে মেঝে খালুর হঠাৎ আগমন গ্রামের পরিবেশে বেশ ঘাম পড়ে গেছে যেন, গাছ বাওয়া দুষ্ট(মজাকরে)গুলোর একটাকেও খুঁজে পাওয়া গেল না, কি আর করা তখনকার দিনের খালাম্মাদের বলা শ্বশুরের সম্মানে সবটুকু সাহসকে লুঙ্গির কোণায় বেঁধে নিলাম কাছা মেরে, অতঃপর শুরু হলো আমার ঊধর্্ব যাত্রা। ডাব পর্যন্ত পেঁৗছুতে পেরেছিলাম কি না এখন আর মনে পড়ছে না, তবে মাঝপথ পেরিয়েছিলাম এতটুকু ঠিক মনে আছে। অবস্থা তখন খুবই করুণ, শুনেছিলাম অতিভয়ে নাকি হাঁটু কাঁপে, দেখিনি তখনো, তবে দেখার খুবই ইচ্ছে ছিল, কিন্তু এই দেখাটা যে নিজের বেলাতেই ঘটবে এমনটি কখনোই কামনা করিনি। বয়স আর কত হবে দশ কি বার, যদিও গ্রামের দামালদের দেখেছি এর চেয়ে ছোট বয়সেই পাকা গেছো সেজে গেছে। কিন্তু ছোট বেলা থেকেই একটু ভিন্ন গোছের আমি তখন নারিকেলের ঐ লম্বা মাথা ছুঁই ছুঁই করছিলাম, হঠাৎ একি উভয় সংকট রে বাবা! না পারছিলাম ডাব ছুঁতে, না পারছিলাম প্রাণ নিয়ে নিচে নেমে আসতে, তখনি মনে হলো হাঁটু দু'টি যেন গাছের সাথে ঠুকোঠুকি করে যাচ্ছে আমাকে না জানিয়েই, চোখ নামিয়ে দেখি ব্যাপার মিথ্যে নয়। আরো যা দেখি, তাতে তো আক্কেল গুড়ুম, ছোট খালার হাসি দেখে কে? কি আর করা পিচ্ছিকালের সেই অসহায় অবস্থায় কোন হাড়ি-পাতিল কাছে পাইনি যে ভেঙ্গে-চুরে রাগটাকে একটু সামাল দেব, নতুন অভিজ্ঞতার সঞ্চয়, খালার উপহাসী হাসি নিয়ে দেখানো সাহস জমিয়েই কোনক্রমে ভূমিতে অবতরণ করি; প্রথম ঝুলা
।
তবে প্রচণ্ড গরমের দাহ-দুপুরে আমার চঞ্চল মনটা শুধু গাবগাছের মগডালটাই পছন্দ করতো, যেখানে ডালের ঘনত্বের কারণে বসা যেত আরাম করে এবং সহজেই ভেঙ্গে যেত বলে প্রায় 25/30 ডিগ্রি পর্যন্ত দোল খাওয়া যেত। মনে আনন্দ থাকলে হেঁড়ে গলা ছেড়ে দিয়ে পল্লীগীতির দু'একটা কলিও বলি বলি করা হতো নির্জনে। স্কুল ফাঁকি দেয়ার একটা নির্ভরযোগ্য জায়গা হিসেবেও মন্দ ছিল না গাব গাছ, ছায়ায়-মায়ায় ঘন্টার পর ঘন্টা পেরিয়ে টিফিন পিরিয়ড পর্যন্ত পেঁৗছুতে তেমন কোন কষ্টই হতো না
। অন্যদিকে স্কুলে কখনো কখনো বেয়াড়া স্যারগুলো পুরো ক্লাসটাকেই একসাথে ঝুলিয়ে দিতেন ছুটির পরে, কারণটি ছিল সেদিনের রুটিনে ঐ স্যারের ক্লাসের পড়াটি আমাদের রপ্ত ছিল না, তাই পুরো এক ঘন্টা ঝুলে ঝুলে মুখস্থ করে তারপরে ছুটি।
ঝুলনের সাথে সাথে গতির কথাও বেশ আনন্দ চিত্তে মনে পড়ে, চলছিল স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, দৌড়-ঝাঁপ, মার-পিট, হৈ-হল্লা এমনকি চা-দোকানের টুং টাং আড্ডাতেও যার ছিল বিতৃষ্ণা, সে-ই কিনা 100 মিটার দৌড়ের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। উচ্চ ক্লাসের হলেও সাইজের কারণে পড়লাম মাঝারী গ্রুপে, লাগালাম কষে দৌড়, পাশ থেকে তখনকার গানের প্রিয় কণ্ঠটির উৎসাহটা আজো মনের সুখানুভূতির একটা সঞ্চয় মনে হয়, যদিও অল্পের জন্য থার্ড হতে হতেই বেঁচে গেলাম সেদিন। ক্লাস থ্রীতে থাকাকালের আরেকটি দৌড়ের কথাও মনের এখানে ওখানে খোঁচা দিচ্ছে, বলেই ফেলি, সেদিনের দৌড়ে একটা দুষ্ট (অনিচ্ছাতেই) তার নখর বসিয়ে দিল আমার পাঁজরে, কি দৌড় দিয়ে গন্তব্যে পেঁৗছুবো, আপাস্যারের (বেবী ম্যাডামকে আমাদের আদুরে ডাক) কোলে গিয়ে আছড়ে পড়েছিলাম সেদিনের আদুরে খোকাটি। রক্ত বন্ধ করাতে আপাস্যার, হেডস্যার আর পিচ্ছিবন্ধুদের রিফুজী পাতা(একটা লতাকে আমাদের এলাকায় এ নামে ডাকে, সঠিক নামটি জানা নেই, হাতে পিসে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলে রক্ত বন্ধ) নিয়ে সে কি হুলুস্থূলতা, তাদের সেদিনের স্নেহ মনে করে মনটা আজো শিশু হতে চায়।
সাইফুল ইসলাম স্যারের সাহিত্য ক্লাস আমার খুবই প্রিয় ছিল, আমার সাহিত্য-কাব্যমনের ফলক উন্মোচন তারই হাতে, ক্লাসের সব ছেলে-মেয়েদের অমনোযোগিতায়ও আমি একান্তভাবে গিলে খাচ্ছিলাম স্যারের জ্ঞানগর্ভ আলোচনাগুলো, স্যারও যেন তখন শুধু আমাকে বুঝাতেই লেকচার দিতেন। একদিন বলেছিলেন জীবনের স্মরণীয় ঘটনা লিখ সবাই, কি হবে স্মরণীয় ঘটনা? অবশেষে 91-এর সাইক্লোনে ঘরচাপা পড়ে ওপার জীবনের খুব কাছাকাছি থেকে ফিরে আসা ঘটনাটাই লিখে ফেল্লাম। জমা দিতেই অন্য যারা আগে দিল, তাদের কাগজে দু'একটু নযর বুলিয়েই ধরলেন আমার পৃষ্ঠাদু'টো, ডাকলেন ব্লাকবোর্ডের কাছে, অন্য কথায় দিলেন ঝুলিয়ে সবার সামনে ব্লাকবোর্ডের সাথে। তারপর শুরু হলো যেন আমার অগোছালো, বিষয়চু্যত লেখাটির পোষ্টমর্টেম, আর 'এই আশা করেছিলাম তোমার কাছ থেকে?' 'এটা বুঝি হলো স্মরণীয় ঘটনা?' এজাতীয় বাক্যাবলীতে মন বিষিয়ে তোলার প্রচেষ্টা করেছিলেন স্যার সেদিন, অন্যরাও বেশ মজা পেল যেন, কিন্তু আমি এসবকিছুর মাঝেও কোথায় যেন স্যারের একটু যত্ন অনুভব করলাম। তাই সংকল্প নিলাম পরবর্তীতে আবার কোন সুযোগ এলে স্যারকে দেখিয়ে দেব।
এড়িয়ে গড়িয়ে চলে গেল আরো কিছুদিন, এলো যেন সেই কাংখিত লগ্ন। বুধ বারেই স্যার ঘোষণা করে দিলেন ঃ "আগামীকাল ছুটির পর সবাই থাকবে এবং পল্লী কবি জসীম উদ্দিনের 'পল্লীজননী' কবিতার ভাবার্থ লিখবে"। মনে মনে পূর্বেই শিহরণ অনুভব করলাম, আমার প্রিয় একটি কবিতার ভাবার্থ লিখতে বললেন স্যার, যে কবিতাটি ভোর রাতে জেগে যখনি পড়তে যেতাম মনে হতো যেন সেই এঁদো ডোবার গন্ধ পাচ্ছি, যেন অসুস্থ খোকা আমি আর মা আমার কপোলে হাত রেখে সুস্থতা কামনা করে যাচ্ছেন। তো সেদিনের স্যারের সে আদেশে সুযোগ এবং প্রিয়তা দু'টোই যেন আসছে একত্রে, খুব কাছাকাছি। আজো সকলের শেষেই প্রায় জমা দিলাম, কিন্তু একি! ঝুলনের ডাক তো দেখি আজো পড়লো, শুধু আমারই। আসন্ন অপমানের ভয়ে, কিছু আশা নিয়েও অবশেষে যখন ঝুলে পড়লাম বোর্ডের কাছাকাছি, তখনি স্যারের মুখ থেকে যেন ফুল ঝরে পড়ছে আমার সমস্ত সত্তায়, বিশেষ বিশেষ প্যারাগুলো দেখিয়ে দেখিয়ে স্যার বলে যাচ্ছেন অন্যদের 'এভাবে লিখবে, এরূপ উপমা পেশ করবে, ইত্যাদি ইত্যাদি'। ক্লাসের সেদিনের চুপচাপ [মেয়েদের ভাষায় অহংকারী, আসলে হাবাগোবা
] ছেলেটি যেন একদিনের জন্য হিরো হয়ে গেল। এরপর থেকে সহপাঠী-পাঠিনীরা বলাবলি শুরু করলো যে, সাইফুল ইসলাম স্যার তোকে তার মেয়ের জামাই বানাবে; যদিও স্যারের কোন মেয়ে ছিল না, এখনো আছে বলে জানি না, তার দু'ছেলে।
আড়মোড়া ভেঙ্গে ঘুম ঘুম চোখ কচলে আজ যখন ব্লগ পেইজটা রিফ্রেশ দিলাম, একি! ত্রিভূজ ভাইয়ের সাথে দেখি আমিও ঝুলে আছি। এই ঝুলন, তার উপর মাধবীর 'অভিনন্দন' পোষ্ট ও পোষ্ট-পাঠকদের ঝুলন-কচড়াসব দেখে আমার অতীত ঝুলন পর্বগুলো মনে পড়ে গেল, আপনাদের সাথে ভাগাভাগি করলাম
। ব্লগ পরিবার যতটা সম্মান দিয়ে আমাকে নির্বাচিত করেছেন, আমি তার চেয়ে বহুগুণ সম্মাননা চিত্তে তাদেরকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ। আরো ধন্যবাদ পাঠক মানে আপনাদেরকে, পড়ে মন্তব্যের সম্মাননা আপনারা যারা সর্বদাই দিয়ে থাকেন আমাকে, একান্ত অশ্লীল না হলে সব ধরনের মন্তব্যকেই আমি আমার পাথেয় মনে করি। সবার জন্য আমার শুভ কামনা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

