somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

@---তাবীজ-কবচ

০৫ ই জুলাই, ২০০৬ রাত ২:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




অজ্ঞতা এবং কুসংস্কার মানুষকে এমনসব কাজে উদ্বুদ্ধ করে যা তার নিজের জন্যই ক্ষতিকর, অথচ অজ্ঞানতার ফলে কল্যাণের মনে করেই সে তা পালন করে যাচ্ছে পূর্ণ আস্থার সাথে। তেমনি একটা ব্যাপার হলো তাবীজ বা এ জাতীয় বস্তুনিচয় শরীরে বা ঘর-দোরে ঝুলানো। এর আরবী প্রতিশব্দ 'তামাইম' একবচনে 'তামীমাহ্'। তাবীজের পর্যায়ে অন্যান্য যেসব বস্তু ব্যবহার করা হয় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে, কাগজে লিখিত কিছু শব্দাবলী, চামড়া, শামুক, ঝিনুক, পুঁতি ইত্যাদি। ঘর-দোর কিংবা গাড়ীতে ব্যবহার করা হয় ভালুক-হরিণের মাথা, শিং, কালো কাপড়, চোখাকৃতির ছবি ইত্যাদি ইত্যাদি।

যে কোন বিপদ-মুসীবতই মানুষকে বিচলিত করে থাকে কম-বেশী, জ্ঞান-বুদ্ধি থাকলে ব্যক্তি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে সহজেই আর অজ্ঞান-অর্বাচীন তখন হারিয়ে ফেলে অবশিষ্ট দিগ্বিদিক জ্ঞানটুকুও। সমূহ অবান্তর বস্তু ও বিষয়াদিকেও নিজের জন্য কল্যাণের মনে করে সেসবকে গ্রহণ করে বসে নির্দ্বিধায়। বিশেষ করে ছোট বাচ্চা ও গর্ভবতী মহিলাদের গলায় দেখা যায় তাবীজের মহড়া, অনেক সময় সেগুলো বহন করাটাও বেচারীদের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায় কারণ, আশ-পাশের দশ গ্রামের ওজা-বৈদ্য কাউকেই বাদ দেয়না তাদের মূর্খ অভিভাবকরা। প্রেম-ভালবাসা লাভ অথবা বিচ্ছেধ ঘটানোর উদ্দেশ্যেও এসবের ব্যবহার লক্ষ্যণীয়।

তাবীজ দু'প্রকার। প্রথম প্রকারে রয়েছে পবিত্র কুরআনের আয়াত কিংবা মহান আল্লাহ্র নাম ও সিফাত বা গুণাবলীসমূহ; যা লিখে আরোগ্য লাভের উদ্দেশ্যে ঝুলিয়ে দেয়া হয়।

এ প্রকার সম্বন্ধে উলামাদের দু'টি মত রয়েছে- 1) এটি জায়েয বা বৈধ। এ ব্যাপারে মতামত দান ও সমর্থনে রয়েছেন আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহার হাদীস, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল প্রমুখ।

2) জায়েয নেই বা অবৈধ। এ ব্যাপারে মতামত দান ও সমর্থনে রয়েছেন আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু ও তার কিছু তাবেয়ী সঙ্গী-সাথী, হুযাইফা, উকবা বিন আমের, ইবনে আকীম এবং পরবর্তী উলামাগণ যারা ইবনে মাসউদ বর্ণিত হাদীসটি দলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে ঃ 'ঝাড়ফুঁক, তাবীজ, যাদু-টোনার মধ্যে শির্ক রয়েছে।' [আহ্মাদ, আবু দাউদ] মূলতঃ সন্দেহ-সংশয় ও জানা-অজানায় শির্কে নিমজ্জিত হওয়া থেকে বেঁচে থাকার জন্য দ্বিতীয় মতটিই অধিক গ্রহণযোগ্য, যেখানে রয়েছে তাবীজের নামে যাচ্ছেতাই ঝুলিয়ে ফেৎনায় নিপতিত হওয়ার আশংকা, মল-মূত্র ত্যাগ ও অন্যান্য অপবিত্রাবস্থাতেও সাথে করে রাখার মাধ্যমে কুরআনের অবমাননার মত ধৃষ্টতা ইত্যাদি।

দ্বিতীয় প্রকারে রয়েছে কুরআন-হাদীস ব্যতীত অন্য কিছু ঝুলানো। এসবের মধ্যে হতে পারে শামুক, ঝিনুক, হাড়, দানা, সূতো, জুতো, তার, ইবলীস ও দুষ্ট জিনদের নাম, মুনী-ঋষীদের জপ-মন্ত্র ইত্যাদি এবং এসবগুলোই শির্ক যা সম্পূর্ণ হারাম।

তাবীজ ঝুলানো বা এ জাতীয় কাজ মূলতঃ মানুষের সাহায্য প্রার্থনার আন্তরিক আহ্বান। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ্ কুরআনে বলেন ঃ "বলুন ঃ তোমরা ভেবে দেখেছ কি, যদি আল্লাহ্ আমার অনিষ্ট করার ইচ্ছা করেন, তবে তোমরা আল্লাহ্ ব্যতীত যাদেরকে ডাক তারা কি সে অনিষ্ট দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমার প্রতি রহমত করার ইচ্ছা করলে তারা কি সে রহমত রোধ করতে পারবে?" [সূরা আয্-যুমার ঃ 38] এখানে ডাকা বা দো'আ শব্দটি প্রার্থনামূলক ও ইবাদাতমূলক উভয় অর্থেই ব্যবহৃত।

তাবীজ বা এ জাতীয় বস্তুনিচয় ঝুলানো প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসেও সুস্পষ্টতা রয়েছে। উকবা ইবনে আমির রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন ঃ 'যে ব্যক্তি তাবীজ ঝুলাবে, আল্লাহ্ তার সেটি (সে ইচ্ছাটি) পূরণ করবেন না। আর যে ঝিনুক ঝুলাবে আল্লাহ্ তাকে স্বস্তিতে রাখবেন না।' [মুসনাদে আহমাদ ঃ 154/4] অন্য বর্ণনায় রয়েছে, 'যে ব্যক্তি তাবীজ ঝুলালো সে শির্ক করলো'। [মুসনাদে আহমাদ ঃ 156/4] আরো রয়েছে, 'যে ব্যক্তি তাবীজ ঝুলাবে তাকে ওটির (তাবীজের) উপর ছেড়ে দেয়া হবে'। [আহ্মাদ, তিরমিজি] এর অর্থ হলো ব্যক্তি তার মহান পালনকর্তা আল্লাহ্কে বাদ দিয়ে যা কিছুর উপর ভরসা করেছে ও আশা করছে, আল্লাহ্ তাকে নিজের দয়া-রহমতের ছত্রছায়া থেকে বিমুক্ত করে সেই বস্তুর উপরই ছেড়ে দিয়েছেন যার উপর সে ভরসা করেছে বা যার কাছে সে আরোগ্যের কিংবা কোন কিছু লাভের আকাংখা করেছে।

তাবীজ-কবচ সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরামের অবস্থানও ছিল রাসূলের আদর্শ অনুসরণের সর্বোত্তম নমুনা। ইবনে আবী হাতীম হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণনা করেন ঃ 'তিনি এক ব্যক্তির হাতে জ্বরের সূতা দেখতে পেয়ে তা কেটে ফেললেন এবং তিলাওয়াত করলেন ঃ "অধিকাংশ মানুষ আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে কিন্তু সাথে সাথে শির্কও করে থাকে।" [সূরা ইউসুফ ঃ 106]' [ইবনে কাসীর ঃ 342/4]

উল্লেখ্য যে, রোগ-ব্যাধির জন্য যেমন প্রকাশ্য চিকিৎসা নেয়া ও ঔষধ-পত্র গ্রহণে কোন দোষ নেই তেমনি আল্লাহ্র পবিত্র কালাম ও তাঁর সুমহান নাম ও গুণাবলী দ্বারা ঝাড়-ফুঁকেও কোন দোষ নেই। সকল অনিষ্টতা রয়েছে অজ্ঞানতা ও কুসংস্কারচ্ছন্নতায় ভরা অস্পষ্ট মন্ত্রাবলী, কুফরী কথাবার্তা, চিহ্নাবলী ইত্যাদিতে তৈরী তাবীজ-কবচ ঝুলানোতে; যেসবের কোন সুস্পষ্ট ফলাফল দেখা যায় না শুধুমাত্র মনের সান্ত্বনা ছাড়া।

আমাদের উচিত মহাসত্যের জ্ঞান অর্জন করে নিজেদের জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলার চেষ্টা করা, অন্যথায় অন্ধকারে হাতড়ে ফিরে ফিরে যেখানে যা কিছুই পাওয়া যাবে সেটাকেই অাঁকড়ে ধরে মুক্তি লাভের বৃথা চেষ্টা করা হবে মাত্র। মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে বিশ্বাসে এবং ইবাদাতে তাঁর প্রতি বিশুদ্ধ বিশ্বাসী হওয়ার তৌফিক দান করুন।

05.07.2006, মদীনা, সৌদি আরব।

ছবিটির জন্য কৃতজ্ঞ যেখানে ঃ
http://www.catgen.com
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুলাই, ২০০৬ রাত ২:৩৭
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সবাই জামাতের পক্ষে জিকির ধরুন, জামাত বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে!

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৩১



চলছে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ভোট গণনা, তুমুল লড়াই হচ্ছে জামাত ও বিএনপির মধ্যে কোথাও জামাত এগিয়ে আবার কোথাও বিএনপি এগিয়ে। কে হতে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ সরকার- জামাত না... ...বাকিটুকু পড়ুন

নির্বাচন তাহলে হয়েই গেল

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৪:১৬


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। ২৯৯টি আসনের মধ্যে এখন পর্যন্ত বেসরকারি ফলাফলে ১৭৫টি আসনে জয় পেয়েছে দলটির প্রার্থীরা।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা ৫৬টি আসনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মেটিকুলাস ডিজাইনের নির্বাচন কেমন হলো?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:২৪


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ২১৩ আসনে জয়ী হয়েছে। তবে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ভালো ফলাফল করেছে জামায়াত ! এগারো দলীয় জোট প্রায় ৭৬ টি আসনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশ চুরান্ত লজ্জার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:১৮



অনেক জল্পনা কল্পনার পর শেষ পর্যন্ত বিএনপির ভূমিধ্বস বিজয় হয়েছে- এ যাত্রায় দেশ চুরান্ত লজ্জার হাত থেকে বেঁচে গেলো। চারিদিকে যা শুরু হয়েছিলো (জামাতের তাণ্ডব) তা দেখে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০ বছর সামহোয়্যারইন ব্লগে: লেখক না হয়েও টিকে থাকা এক ব্লগারের কাহিনি B-)

লিখেছেন নতুন, ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৪২



২০২৬ সালে আরেকটা ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেগেছে একটু আগে।

ব্লগার হিসেবে ২০ বছর পূর্ন হয়ে গেছে। :-B

পোস্ট করেছি: ৩৫০টি
মন্তব্য করেছি: ২৭০৭২টি
মন্তব্য পেয়েছি: ৮৬৬৭টি
ব্লগ লিখেছি: ২০ বছর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×