প্রিয় প্রজন্ম,
পৃথিবী আগেও বহু ভাগে বিভক্ত ছিল, এখনো আছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। কিন্তু যে ভূ-খণ্ডটিকে প্রথম আমার সত্তার স্পর্শ ছুঁয়েছে, তার ভালবাসাই আলাদা। তার সবকিছুকেই সদা সুন্দর দেখতে চাই, যদিও অসুন্দরের মাঝেই সুন্দরের ঔজ্জ্বল্যতা বিদ্যমান, তবুও আকাংখাগুলো তো একচোখা, এক পথেই চলতে ভালবাসে। বাংলাকে ভালবাসতে পেরেছি বলেই বিশ্বকে আমি চিনতে পেরেছি, আমার কাছে পৃথিবীর প্রথম প্রকাশ- জন্মভূমি। দূরে আছি বহুদিন, তবু মনে পড়ে প্রতিদিন, প্রিয়জনের মতই প্রিয় অনুভবে। প্রবাসের এই শুষ্ক মরুজীবনে এক সময় স্বদেশী কাউকে পেলেই যেন জয় করে ফেলতাম কোন হারানো মরুদ্যান, কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আর অভিজ্ঞতার পরিপক্কতায় এখন আর তেমনটি মনেই হয় না; বরং থাকি অপরিচিত বিদেশী হয়েই।
আজ স্বদেশীদের কথা শুনাই তোকে, আমার স্বদেশীরা এই প্রবাসে আমার সাহস, আমার মাতৃভাষা, আমার আঞ্চলিক সংস্কৃতির সাক্ষাত, বিপদে-আপদে আমার পক্ষপাত; এই সব ভেবে ভেবেই পুলকিত হতাম শুরুর দিনগুলোতে, স্বদেশী ভাইদের প্রতিটি সাক্ষাতে। কিন্তু দিনকাল যেন নিজের মনেই পাল্টে গেছে আজকাল। দেখা যায় যে, অফিসের কোন একজন চা বানানোর কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি তার স্বদেশী কর্মকর্তাকে ততই অবহেলা করে যতটা সেই কর্মকর্তার অধিনস্থ আরব বা অন্যান্য দেশীয় কর্মচারীদের ডাকে যতটা প্রাণপণ দৌড়ায়। বয়সে ছোট হওয়ার পরও স্বদেশী মোটামুটি শিক্ষিত ছেলেটিকে যে এখনো আপনি বলে সম্বোধন করি, কারণ তিনিও তাকে ও তার শিক্ষাকে সম্মান দিতে চান, চান তার স্বদেশীকেও সম্মানিত করতে; অথচ সে মাঝে মাঝেই তুমি বলেই পরে সংশোধনের জন্য আপনি উচ্চারণটা করে। সেই কর্মচারীর ব্যাপারটা এমন, যেন বিদেশীদের গোলামীটা পরম সুখের-স্বস্তির আর স্বদেশীর জন্য নিজের চাকুরীগত দায়িত্বটা পালনেই যত লজ্জা, মানহানীকর(?)। একটা দোকানে গিয়ে যতক্ষণ আরবী-উদর্ু-হিন্দি বলি ততক্ষণে যদি চিনতে না পারে তো স্বদেশীর কাছ থেকে পাবো মনিবের সেবামূলক আচরণ, আর যেই না জিজ্ঞেস করে বসলাম 'ভাই কি বাংলাদেশী' ব্যস্ তখনি শুরু হয়ে গেল ব্যবধান খোঁজা, কে বড়, বিক্রেতা বাংলাদেশ না ক্রেতা বাংলাদেশী?
আরো মজার ব্যাপার কি জানিস্, আমার প্রবাসী অবস্থানে স্থানীয় আরবীর পর বিদেশীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত হয় উদর্ু ভাষা, বিশেষ করে বাংলাদেশীরাই গর্ববোধ করে যদি সে উদর্ু বলতে পারে। যদি কোন বিদেশী একজন বাংলাদেশীর কাছে বাংলা শেখার আব্দার করে তো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার ধারক আমার স্বদেশীরা তাদেরকে শেখায় কতগুলো গালাগাল (যা এখানে লিখতে রুচিতে বাধে) অথবা 'শালা', 'দুলাভাই' ইত্যাদি ইত্যাদি। অদ্ভুত ব্যাপার কি জানিস্, যখন এই লেখাটি লিখছি ঠিক তখনি এটিএন বাংলার তারকাদের আলোচনা অনুষ্ঠানে এই ভাষা নিয়েই কথা হচ্ছিল, পৃথিবী যাদের ভাষাকে এত মূল্যায়ণ করেছে, তারাই নিজেদের সেই গর্বিত ভাষা মুখে আনতে লজ্জিত হয়। একজন পাকিস্তানীকে যদি বলা হয়- 'আমি কেন উদর্ু বলবো; বরং তুমিই বাংলা বলো' সে তখন আশ্চর্য হয়ে বলবে যে, আমি বাংলা শিখবো কেন; বরং তোমারই উদর্ু শিখা উচিত, আর আমার স্বদেশীরা তাকেই আশির্বাদ হিসেবে গ্রহণ করে, হায় মাতৃভাষা! হায় আমার স্বদেশী!! হায় ভাষা শহীদ!!!
প্রজন্ম, কাকে জানাবো আমাদের এই কষ্টগুলো বল? আমাদের এমপি-মন্ত্রীরা যে আজকাল কোন ভাষায় কথা বলে সেটাই নির্ণয় করতে হিমশিম খাই। কোন কোন মন্ত্রীর বক্তব্য সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে যদি প্রশ্ন কর তো গালাগাল শুনে আসবে, কারণ মন্ত্রী সাহেব কি যে বললেন বাংরেজী ভাষায় সেটা যদি সাংবাদিকরা উদ্ধার করে না দেয় তাহলে দেশের অধিকাংশ অশিক্ষিত মানুষ সেকথা বুঝবে কি করে? অথচ এরাই আবার একুশে ফেব্রুয়ারীতে ইট-পাথরের বেদীতে মাথা খুড়ে মরে, হায় মাতৃভাষা! হায় বিশ্ববিখ্যাত গৌরবের একুশ!!
বিরক্ত হোস্নে, আজ দীর্ঘ লিখলাম বলে, যে ভাষায় আমার আত্মপ্রকাশ, সে ভাষা এখন আমার বুকে ব্যথা হয়ে আছে, তোকে লিখবো বলেই তো কলম ধরেছি, শুন্তে বিরক্ত হবি না যেন। পৃথিবীর আর সব ভাষা যত সমৃদ্ধই হোক না কেন, আমার স্রষ্টা আমাকে পাঠিয়েছেন বাংলার বুকে, আমার বুকে তাই বাংলারই অনুরনণই বাজবে, এটাই তো স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বড়ই হতাশ হই এই প্রবাসে যাদের সংস্পর্শে আমি আশা খুঁজতে যাই। বুঝতে পারছি না কোন দিকে যাচ্ছে আমাদের ভদ্রতাবোধ, মনে পড়ে, ছুটিতে যখন দেশের মাটিতে যাই তখন যে রিকশাওয়ালা ভাইকে আমি আপনি সম্বোধন করে যাত্রা শুরু করলাম সেই কিনা আমাকে উল্টো গালি দিল আর পাশেই আরেটি ষণ্ডামার্কা ছেলেকে দেখলাম একটা গালি দিয়েই রিকশায় উঠলো, অথচ রিকশাওয়ালাটা তাকে স্যার ডাকলো। বড়ই হতাশ লাগে মাঝে মাঝে; তুইও কি হতাশ হবি রে...?
প্রজন্মের- 'ফএমু'
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




