Click This Link
অপেক্ষা, প্রতীক্ষা কিংবা এ ধরণের আরো শব্দাবলীর বাস্তব ব্যবচ্ছেদ যখন শেষ শেষ করছিল, ঠিক তখনি হুট্-পুট্ ধুম্-ধাম শুনে কান আর চোখ একসাথেই খাড়া করে দেখতে পেলাম, তিনি এলেন, সিলেটগামী সেই তিনি, রেলগাড়ী। এলেই যখন, তবে এত দেরী করে কেন এলে, দেরীই যদি করবে তো বর্ষার দিঘীর জলের মত উপছে পড়া জনজল কেন নিয়ে এলে? মেজাজ খারাপ করা হৈচৈ আর ঘুষি মারি, ঘুষি মারি অবস্থা হলো মনের। কি আর করা লড়াই এখানে অনিবার্য, ছোট দু'জন-মানে মাসুদ আর জসিম-ওরা তো কোলে বসে যেন ঘোড়ায় চড়ে বঙ্গ-বিজয়ে অংশ গ্রহণ, আর মুশকিল হলো আমার, অতটা বড় হইনি যে, এক জনের ধাক্কা খেলে অন্ততঃ আরেক জনের গায়ে গিয়ে আছড়ে পড়বো। অবস্থা তার চেয়েও নাজুক, সকলের পেট বা বুক বরাবর উচ্চতা নিয়ে কি আর ধাক্কা খাওয়াও সম্ভব? রীতিমত 'স্মল-শর্ট' আর হাঁটুর গুতোগুতি খেয়ে অস্থির।
চাচা আর বাবার শক্তি পরীক্ষায় কৃতকার্যতা দেখতে দেখতে একসময় টের পেলাম, আমরা একটু একটু দুলছি, চারদিক দেখার তো সুযোগ ছিল না, মোটামুটি ফাঁকহীন শরীরের শিকে তৈরী রেলবগী নামক জেলের কয়েদী মনে হচ্ছিল নিজেদের। ঝক্ ঝক্ == ঝক্ ঝক্ চলতে শুরু করলো রেলগাড়ী। ষ্টেশন থেকে পরবর্তী ষ্টেশন, এভাবেই হেলে-দুলে এবং হেলিয়ে-দুলিয়ে আমাদের নিয়ে বয়ে চলল যেন রেল নয়; জেল-এর কক্ষগুলো। অবশ্য পরবর্তী কয়েক ষ্টেশন পেরুতেই ভীড় কমে এক-দু'জন করে টুপ-টাপ বসে পড়লাম। এবার যেন বাস্তবতায় স্বাপি্নক পরিবর্তন এলো, দু'চোখের পাতায় জানালার সবটুকু আলো আছড়ে পড়তেই দেখতে পেলাম আমার প্রিয় বাংলাকে। হবে তো প্রায় ঘন্টা দেড়েক, যেন বন্দী ছিলাম কোন অচিন দ্বীপের বিদঘুটে অন্ধকার কারাকক্ষে। আহা! কত সুন্দর বাংলার প্রকৃতি, সবুজের সাথে সুনীলের এই মিতালী, গদ্যময় হালচষা জমির দূরে-অদূরে পদ্যের বটবৃক্ষ যেন স্বপ্নের কারসাজী, যেন পটে অাঁকা জলছবি।
পৃথিবী দেখার, প্রকৃতি দেখার অদম্য বাসনা আমার প্রভূ-প্রদত্ত। আর তাই সবসময় মনটা পড়ে থাকতো মরা গাঙ্গের সবুজ ঘাসে ঘাসে, গাব গাছটির মগডালে, নতুন গাঁয়ের অচেনা পথে। মনে পড়ে, বন্ধুরা সবাই পছন্দ করতো বাজারে বা রাস্তার মোড়ের চা দোকানে আড্ডা দিতে; আমার একদম ভাল্লাগতো না। কখনো-সখনো বাধ্য হয়ে ওদের সাথে বসতে হলেও চঞ্চল মন যেন বুকের ভেতরই লাফালাফি শুরু করে দিত, আর কি থাকা যায়? বসাই রীতিমত দায়, কতই মিনতি রাখতাম তাদের কাছে, চলরে দোস্ত, ঐ খালের পাশের দুর্বায় গিয়ে একটু বসি। সবাই হেসে আটখানা, শেষমেশ আমার মন খারাপ না হওয়া পর্যন্ত চলতো তাদের বন্ধু-বাৎসল উপহাস-তামাশা ঃ কবি কবি ভাব, ব্যাপার কি ওখানে কে আসবে শুনি, হুমমমম,,,,,,,,।
যদি কখনো আপন গাঁয়ের বাইরে যাওয়ার সুযোগ হত, একটু বেড়ে উঠার পর থেকে একাকী চলার সুবাদে এমনটি প্রায় ঘটিয়ে ছাড়তাম, তো যেতাম সোজা পথে, যে পথ চিনি, যে পথে চলে রিক্শা-সাইকেল, সে পথেই। কাণ্ড করতাম ফেরার পথে, সহজ রাস্তাটা ফেলে হুট করে ঢুকে পড়তাম একটা ভিন গাঁয়ে, যেখানে এর আগে কখনো যাইনি, কাউকে চিনি না, আস্ত একটা এডভেঞ্চারের মাঝে ঢুকে পড়তাম। কি যে মজা লাগত তখন, এ বাড়ীর মাঝখান দিয়ে তো ঐ বাগানের পাশ ঘেঁষে, এই পুকুর পাড়টা খুব সুন্দর তো রাস্তা ফেলে চলি না এদিকেই, কি আর হবে, একটু পরেই- 'এই যে (চাষী) ভাই, শুনুন গো (পাতা কুড়ানো) খালাম্মা, ওই মিয়া (ফেরিওয়ালা) কমলপুর যাওয়ার রাস্তাটা ধরবো কিভাবে, (নয়তো) বড় রাস্তায় উঠবো কোন পথে', রাগ করতো না কেউ, ছোট বেলায় (ছোট খালা বলতো) বেশ মিষ্টি চেহারা আর হাবাগোবা ছিলাম বলে দুষ্টোমী একটু করলেও কেউ সহজেই রাগতো না, সবুজ বাংলাকে দেখার কত যে স্বপ্ন ছিল, যা কিছুই দেখতাম, কত যে আনন্দ পেতাম, সেসব প্রকাশে সব বাকই নির্বাক যেন, সবুজ-শ্যামলতা নীরবে যেন বলছে- 'আমরা নির্বাক, তোমরাও নির্বাক হয়ে বুঝে নাও আমাদের ভালবাসা'।
প্রকৃতির দান বড়ই অমূল্য, সিলেটগামীর লক্কর-ঝক্কর ঢুলুনীতে ঘুম ঘুম চোখ অচেনা বাংলাকে দেখে দেখে হারিয়ে যাচ্ছিল স্বপ্নে, আবার আগমন ঘটে জাগ্রত পৃথিবীর ছুটে চলা দেখে, যেন আমরাই জয় করে যাচ্ছি সকল সবুজ-শ্যালিমাকে, আর দৃষ্টির পথ ধরে দুরন্ত গতিতে সমপ্রসারিত হচ্ছে আমাদের জ্ঞানের, স্মৃতির পৃথিবীর সীমারেখা। সেদিন ছোট ছিলাম বলে বেশীক্ষণ জেগে থাকতে পারতাম না, অবশ্য আজও তেমন পরিবর্তন আসেনি কিছু, তো পুরো ভ্রমণটাই একটু ঘুম আর একটু দেখা, এভাবেই স্বপ্নে এবং জাগরণে প্রিয় স্বদেশের সবুজ-শ্যামলিমা দেখে দেখে পেরুচ্ছিলাম।
[আজ আপাততঃ এই লেখা থেকেও পেরুচ্ছি, চলবে]
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুন, ২০০৬ রাত ৮:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




