কয়েকটা লিংক শেয়ার করছি। বেশ কিছু প্রশ্ন আছে, অভিযোগ আছে আর আছে কিছু আহ্বান। গত দু’দিন থেকে এই লিংকগুলো আমাকে ভাবাচ্ছে। শাহবাগ প্রতিবাদের শুরু থেকে আমরা বলে আসছি ‘Stay focused’, কিন্তু চাইলেই কি যেকোন ঐতিহাসিক আন্দোলনের ফোকাসিং-এর ডেপ্থ অফ ফিল্ড এতটা Narrow করে ফেলা যায়? ইতিহাসের একটা কলঙ্ক মুছতে চাই আমরা, শুরু করতে চাই নতুন করে, যাকে বলে ফ্রেশ স্টার্ট। সেই উদ্দেশ্যেই এই নতুন মুক্তিযুদ্ধ। রাজাকারবিহীন সোনার বাংলা গড়তে চাই আমরা। লিখতে চাই নতুন ইতিহাস। সেই ইতিহাস কি আমাদের কাছে ‘যুদ্ধাপরাধী’ নামক সম্প্রদায়ের সমূলে উৎখাত দাবী করে না? সে কি চায় না যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা আর কোন কাজ বাকি না রাখি শুধু দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ছাড়া? সেক্ষেত্রে আমাদের আন্দোলনটা আরো সর্বব্যাপী, সর্বপ্লাবী হওয়া উচিৎ নয় কি? বলা হলো ‘আগে এদের ফাঁসি হোক, পরে বাদবাকিদের দেখা যাবে’, প্রশ্ন হলো কবে? পরবর্তী সরকার এসে যে এই বিচার প্রক্রিয়া চালু রাখবে তার নিশ্চয়তা কী?
>যারা এখনো বিচারের ধারে কাছেও আসেনি (বিশেষত ক্ষমতাসীন দলের উর্দির নিচে লুকিয়ে থাকা যুদ্ধাপরাধীরা) তারা যে বিচারের আওতায় পরে কোন একসময় আসবে সেই প্রতিশ্রুতি কে দেবে? যে ৭৫২ জন দণ্ডিত আসামী হারিয়ে গেছে তাদের কে খুঁজবে? কবে খুঁজবে? আর ভবিষ্যতে কেউ যদি নাই খুঁজে তাহলে যে জনগণ আবারো রাস্তায় নেমে আসবে তার নিশ্চয়তা কে দেবে? একবার যখন নেমেছি তখন সকল প্রশ্নের উত্তর নিয়েই রাজপথ ছাড়ার চেষ্টাটা অন্তত করা কি আমাদের উচিৎ নয়?
সব চাওয়া এই শাহবাগই পূরণ করবে সেটি যেমন সম্ভব নয় তেমনি ‘যুদ্ধাপরাধ’ ইস্যুতে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার প্রক্রিয়াও এই শাহবাগ শুরু করবে, নিদেনপক্ষে শুরু করার তাগাদা দেবে এই দাবীও তো অযৌক্তিক নয়।
>এই বিচারটি সম্পন্ন করার জন্য আমরা সব সময় যাদের মুখ চেয়ে ছিলাম, যারা বারবার কথা দিয়েও তা রক্ষা করেন নি, তারাই যদি এখন রাজিবের মৃত্যুতে কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন দেন, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে গণজাগরণ ঘটানো তরুণদের পাশে দাঁড়াতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান সেটিও কি একধরণের প্রতারণা নয়? জাতির এই দাবীর পাশে যাদের সবার আগে, সবচেয়ে সক্রিয়ভাবে দাঁড়ানোর কথা, তারা কি সময়মত দাঁড়িয়েছিলেন? নাকি হাজারো মানুষের রাস্তায় নেমে আমার প্রয়োজন হয়েছে তাদেরকে শুধুমাত্র একটা আইন সংশোধন করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করাতে? রাজিব হায়দারের মৃত্যুর দায় কি তাদের উপরেও এসে বর্তায় না?
>৪০ বছর পর বিচার চাওয়া আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ নয়, তবে কারন দর্শাতে হবে যে ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ সেটি এই ট্রাইব্যুনালে, যতদূর জানি, উপেক্ষিতই থেকে গেছে। তা নাহলে অন্তত এই নাসিমীয় প্রলাপ আজকে শুনতে হত না। শুনতে হতো না যে আওয়ামী লীগ সবসময়ই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে ছিল । যুগে যুগে এদেশের জনগণ প্রতারিত হয়ে এসেছে। এখন কি সময় নয় এই দাবী তোলার যে ‘ইতিহাসের সব দ্বার আজ খোলা রবে চালা হাতুড়ি শাবল চালা’??
> তারাও যদি আমাদের পক্ষে থাকেন তবে দেশের মানুষকে আন্দোলনে নামতে হলো কেন? কাদের বিরুদ্ধে? জামাত-শিবিরের বিরুদ্ধে তো জনগণ যুদ্ধ করেছিলো ২০০৮ সালে, ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে। নতুন করে কেন আবার বিপ্লবের ডাক দিতে হলো? এই আন্দোলন, এই দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ কাদের বিরুদ্ধে? জামাতের নেতারা তো সব জেলে। দুই-তৃতীয়াংশ ভোট নিয়েও যদি জামাতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে ‘সর্বদলীয় ঐকমত্যের’ ধোঁয়া দেখান,২০০৯ সালের রিট পিটিশনের হাইকোর্ট দেখান, দুর্বল প্রসিকিউশন টিম নিয়েও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে 'আন্তরিকতা'র ভেক ধরেন, তবুও আমরা সে বিষয়ে কিছু বলবো না? শুধু ‘Focused’ থাকবো??
>ট্রাইব্যুনাল ঠিক আছে, কিন্তু রায় সঠিক নয়- কথা দু'টি কি সাঙ্ঘর্ষিক না? শাহবাগ থেকে আমরা কেন বর্তমান সরকারের দোষগুলো এড়িয়ে যাচ্ছি? কেন তাদের দিকে দৃঢ় অঙ্গুলি নির্দেশ করছি না? কেন টু দ্য পয়েন্ট কোশ্চেন করছি না? এই রায়ের আগে পুলিশ কেন হঠাৎ জামাত-শিবির বান্ধব হয়ে গেলো? নতুন করে আপিল করার সুযোগ সৃষ্টি করেছেন, আপনাদেরকে ধন্যবাদ (অবশ্য সেখানেও ফাঁক! ) , কিন্তু রায়টা 'অমন' হলো কেন? কাদের নির্দেশে? কিছু প্রশ্ন কেন হারিয়ে যাচ্ছে? নাকি এই প্রশ্ন করলে আদালত অবমাননা হবে? নাকি আমরা ভয় পাচ্ছি? নাকি এটা ভয় নয়, আরো কিছু, আরো গভীর কিছু? নাকি আমরা এতটাই Focused থাকবো যে পারিপার্শ্বিকতা আমাদের কাছে Blur হয়ে যাবে??
সবশেষ লিংকটা শেয়ার করার আগে বলে নেই এটা আমার মতামত নয়, আমি এর সব কথা বিশ্বাসও করতে চাই না। আমি বিশ্বাস করতে চাই জীবনে যে একটামাত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছি, রাতদিন কাটিয়েছি , স্লোগান দিতে দিতে গলা ভেঙ্গেছি, যে সময়টার কথা অনাগত প্রজন্মের কাছে বুক ফুলিয়ে বর্ণনা করার কথা এখনই কল্পনা করে শিউরে উঠছি- সেটি পবিত্র, তার গায়ে কোন কালিমা নেই, সেটি কখনোই ছিনতাই হয় নি। সেটি সবসময় আমারই ছিল, আমাদেরই ছিল। আর এই বিশ্বাসকে পাকাপোক্ত করতে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুব জরুরী। যদি আমার কোন প্রশ্ন অবান্তর হয়, অযৌক্তিক হয়, তবে জানতে চাই কেন? আর যদি তা না হয় তবে উত্তরগুলো কী? আর যদি কোন উত্তর নাই থাকে, তবে কেন নেই?
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ রাত ১০:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


