প্রাইমারি স্কুল থেকে হাইস্কুলের দুরত্ব খুব বেশি নয়। বড় দুই ভাই আগেই হাইস্কুলের পাঠ শুরু করেছিলো। ওদের স্কুল ড্রেস, হাতঘড়ি, ফনিক্স বাইসাইকেলে চলাফেরা দেখে আমরাও দিন গুনতে থাকি কবে ওখানের স্টুডেন্ট হবো। বাজারের একদম মধ্যিখানে হাইস্কুল। যখন খুশি বাজারে যাওয়া যাবে।যেখানে প্রাইমারি স্কুল পড়ার সময় হয়ত ৩/৪ দিনে একবার বাজারে যেতে পারতাম। কোন কারন ছাড়া বাজারে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিলো।
হাইস্কুলটা ছিলো এলাকার সবচে পুরনো আর নামি। আয়তনে বেশ বড়ো। এক হিন্দু লোক দান করে গেছেন। অনেক বড়ো টিলা। ৭/৮টা বড়ো বড়ো কাঠাল গাছ, ৪/৫ টা বড় আম গাছ,২ টি লিচু গাছ।বেশ বড়ো কদম গাছ ছিলো ৩টি। ফলের গাছগুলো ভর্তি থাকতো সিজনে।স্যারেরা বেশির ভাগ সময় নিজেরা এইসব ফল ভোগ করতেন। ৯ম/১০ম শ্রেনীর ছাত্ররা তখন স্যারদের সাথে এগুলো কিছু ভাগ পেতো। যদিও এলাকার সবার বাড়িতেই আম-কাঠাল প্রচুর ছিলো। আর স্যারদের সাথে কেউই এসব ব্যাপারে তর্কে যেতো না। এগুলো বেয়াদবি হিসেবে ট্রিট হতো তাই কিছু ইছড়ে পাকা ছেলে চুরি করে বিক্রি করতো।
দুই ভাই এই স্কুলে পড়ছে আর দুই ভাই আজকে নতুন স্কুলে এসেছি। বেশ ভাব নিয়েই হাইস্কুল জীবন শুরু হলো। ক্লাসের প্রথম বেঞ্চে বসা নিয়ে একজনের সাথে ছোটভাইয়ের কথা কাটাকাটি দেখে সহ্য করতে না পেরে দু'জন মিলে উনাকে প্রথম দিনই ধুলাই। সাথে সাথে স্যার হাজির। স্যারকে আগে থেকেই চিনতাম। আমাদের বাড়ির নীচ দিয়ে (টিলা বাড়ি) উনি প্রায় সময় মন্দিরে যেতেন। তাই উনি আমাদের চেহারা ভালো করেই জানতেন।এই চান্সে বেঁচে গেলাম। যদিও ভাইদের কাছে ঘটনা জানানো হলো।ওরা আমাদের ভয় দেখালো বাসায় গিয়ে বলে দিবে। আমরাও উল্টো থ্রেড দিলাম তোমাদের কথাও আমরা বাসায় বলে দিবো।
বড় ভাই ছিলো প্রচন্ড দুষ্ট। স্কুল থেকে আম-কাঠাল চুরি করে সাথে সাথে বাজারে কম দামে বিক্রি করে ফেলতো। যেখানে একটা কাঠালের দাম বাজার মূল্যে ১৫/২০ টাকা সেখানে ও মাত্র ৭/৮ টাকায় বিক্রি করে ফেলতো। আমাদের বাড়ি ভর্তি অনেক কাঠাল। বাড়ি থেকে যদি শুনে কোথাও থেকে কিছু চুরি করেছি তো আর রক্ষে নেই। যাইহোক, কয়েকদিনের ভেতর হাইস্কুলের মজা আর থাকলো না। ইচ্ছে হলেই বাজারে যাওয়া যায় না। আমরা বাজারে কখন কোথায় গিয়েছি সবকিছু বাড়িতে আসার আগেই সবাই জেনে যেতো। প্রথম প্রথম অবাক হতাম ঘটনা কি। পরে কাহিনি বুঝতে পারলাম। পরিবারিক কিছু ব্যবসা ছিলো স্হানীয় বাজারে। গ্রাম্য বাজার তাই সবাই সবাইকে চিনতো। দুর থেকে আমাদের সবাইকে মোটামুটি সব দোকানির সাথেই পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। কেউ কখনো আমাদের বাজারে দেখলে ফোন করে বলে দিতো।সেই হিসেবে বড়ো ভাইজান চুরির দায় অনেক বেশি শাস্তি ভোগ করেছে।
প্রথম দিনের মারামারিতে বেশ কাজ হয়েছিলো। সবাই একটু সম্মান করে চলতো। ক্লাস ক্যাপ্টেন নির্বাচন হতো ভোটের মাধ্যমে। প্রাইমারি স্কুলে সব সময় ক্লাস ক্যাপ্টেন ছিলাম। অভিক্ষতা খারাপ না। সবাইকে মারামারি,কথা বলার সুযোগ দিতাম। শুধু স্যার আসার আগেই যেনো সবকিছু ঠান্ডা থাকে সেই ব্যবস্হা করতাম। ব্যস, সবাই আমার উপর খুশি।সব ক্লাসেই ক্যাপ্টেন। ক্যাপ্টেন হয়ে নিজেও মারামারি করতাম। বেশ কয়েকবার স্যারের কাছে ধরা খেয়েছি।ফলস্বরুপ....(ক্লোজআপহাসি) ।বড় ভাইদের পদাঙ্ক অনুসরন করে নিজেও বেশ কয়েকবার চুরির নেতৃত্ত দিয়েছি। কিন্তু সাহস করে চুরির মাল বিক্রি করতে পারিনি।যার সাথে চুরি করতাম ওকেই দিয়ে দিতাম।
পড়াশোনায় ছিলাম মাঝারি টাইপের। ১ম,২য় স্হান অধিকার করেছিলাম জীবনে একবারই।তখন এতো কম্পিটিশনের বালাই ছিলো না। রেগুলার পাশ করতেছি এইটাই ছিলো আমাদের কাছে অনেক।ক্লাসে মাত্র ১০/১২ জন রেগুলার পাশ করে। কিছু দিনের মধ্যেই বাড়ি থেকে আমাদের অবস্হা পর্যবেক্ষন করে সিন্ধান্ত নেওয়া হলো গরম ভাত খেয়ে পড়াশোনা হবে না। তাই বোডিং হাউস।পেছনে পড়ে রইলো সর্নালি সব দিন। হোস্টলে জীবনের প্রথম প্রথম এতো বেশি মন খারাপ হতো যে পড়াশোনায় মনই বসাতে পারতাম না। ৩/৪ মাসে একবার যাওয়া হতো বাড়িতে। বন্ধুদের সাথে দেখা হতো। বন্ধুরা বেশ মজার মজার গল্প করতো আর আমরা দীঘ্রশ্বাস ফেলতাম। এস.এস.সি পরীক্ষা দিয়ে বেশ কিছুদিন গ্রামে মজায় কাটালাম। রেজাল্ট বের হলে দেখি হাইস্কুলে যারা আমাদের থেকে অনেক অনেক ভালো ছিলো ওরা কোনমতে হয়ত পাশ করেছে। পরবর্তিতে কলেজে ভর্তি নিয়ে আমরা আবার ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। মাঝে মাঝে গ্রামে গিয়ে দেখতাম আমাদের সেই সব বন্ধুগুলো সবাই স্হানীয় কলেজের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা হয়ে গেছে।সবার সে কি ধাপটের কথাবার্তা। স্হানীয় কলেজ সবাই নিজেকে রাজা ভাবে। পড়াশোনার কোনই বালাই নেই। এইচ.এস.সি বন্ধুদের ওদের বেশির ভাগ ফেল করেছিলো। পরবর্তিতে আমরা নকল সাপ্লাই দিয়ে কোন মতে পাশ করিয়েছিলাম। আজ অনেকের সাথেই কোন যোগাযোগ নেই। হয়ত কারো মাধ্যমে মাঝে মাঝে শুনি কেউ ইউরোপে আছে কেউ বা আরব দেশে,কেউ বা স্হানীয় বাজারে ছোটখাটো ব্যবসা করছে। কেউ ড্রাগ এডিকটেড।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে মে, ২০০৭ বিকাল ৫:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


