ব্লগে নারী স্বাধীনতা নিয়ে বেশ উচ্চবাচ্চ চলছে। এই 2006 এ যখন নারী স্বাধীনতা নিয়ে আন্দোলন করতে দেখি,একজন মানুষ ই আমার সামনে এসে দাড়ায়। না ,সে এমন কোন রমনী না যে নাম বললেই চিনে ফেলবেন সবাই।তার জীবন চিন্তা চেতনা নিয়ে গল্প উপন্যাস ও কেউ লেখেনি। তাকে নিয়ে লিখার যোগ্যতা আমার ও নেই,কারন তাকে আমি তার মত করে উপস্থাপন করতে পারব না। তার পর ও তার প্রতি আমার ভালবাসা, শ্রদ্ধা র প্রকাশ করতে পারি শুধু।
এখন থেকে প্রায় 96 বছর আগে এক অজ পাড়া গায়ে (যেখানে বিদ্যুৎ গিয়েছে বছরখানেক, এখন ও পায়ে হেটে বা নৌকায় করে যেতে হয়)মোল্লা বাড়িতে তার জন্ম। সে এলাকার প্রভাবশালী ও একটা শিক্ষিত পরিবারের বড় সন্তান। গায়ের রং কালো, লম্বা গড়ন। না শিক্ষার আলো সে পায় নি। সে প্রচলন ই ছিল না। কিন্তু ভালবাসা পেয়েছে, পেয়েছে সম্মান, নির্ভরতা।এই টুকু ই ছিল তার সম্বল। বয়স যখন 12-13 তখন বিয়ে হয় ।বরের প্রধান যোগ্যতা সে কর্মঠ,দেখতে ভাল, রোগ বালাই নাই, বংশ ভাল।তখন বিয়ের ক্ষেত্রে এই বিষয় গুলোই দেখা হতো।মেয়েটি 3 সন্তানের জননী হলেন, আর ছেলেটি ও ব্যবসা বেশ জমায়ে ফেললেন, জমি জমা বাড়াতে লাগলেন। এমনি সময় সে আর একটা বিয়ে করে নিয়ে এলো। মেয়েটির জীবনে নতুন টার্ন,যার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না মোটেই।
সে হার মানে নি, সবার কথা ও শুনে নি, সে তিন ছেলে নিয়ে আলাদা হয়ে গেল, বাবা ভাইয়ের কথায় নিজ বাপের বাড়িতে চলে যায়নি, বা অন্য কোথাও চলে যায়নি। একই বাড়িতে ছিল, শুধু ঘর আলাদা হয়ে গিয়েছিল(এ যুগের সেপারেশন)।তার পর থেকে সে কখনও তার স্বামী র কিছু গ্রহন করে নি, তাদের তালাক হয়নি, কিন্তু স্বামী হিসেবে কোন অধিকার ই সে তার স্বামীকে খাটাতে দেয় নি। কোন দিন স্বামীর সাথে আর কথা বলেনি, আমরা ও শুনিনি কথা বলতে। সে অন্যের বাড়িতে বারকি বানার(ধান থেকে চাল করতে হলে ধান সিদ্ধ করে রোদে শুকাতে হয়, এটাকে বারকি বানা বলে)কাজ করে নিজ ছেলেদের বড় করেছে। ছলেরা বড় হয়ে সংসারের ভার নিয়েছে। কখন ও নিজ বাপের বাড়ি গিয়ে সাহায্য চায় নি, বা তারা দিলে ও গ্রহন করে নি। তার যে সম্পদ বাপের বাড়িতে ছিল তাতে তার জীবন ভালই কেটে যেত।সত্য বাদী ও ন্যায় পরায়ন হিসেবে তার জুড়ি ছিল না। পাড়ার লোক জন তার কাছে টাকা পয়সা গয়না আমানত রেখ যেত । কখনও উচু গলায় কথা বলতে শুনি নি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত নিজের কাজ , সংসারের কাজ নিজ হাতে করে গিয়েছে। ছেলের বউদের অভিযোগ, নিজের বাবার বাড়িতেও তারা এতো সুখে থাকে নি। সতীনের ছেলেদের নিজের ছেলের মত ই দেখেছেন, তারা নিজের মাকে মা বলেনা, তাকে ই মা বলে, তারা তার মৃত্যু পর্যন ্ত বাড়ি ঢুকে প্রথমে তার ঘরে এসে জিগ্যেস করে, বা একটু বসে যাবে।
তার ছেলেরা নিজের মত এস্টাবলিশ, এটা তার নিজের কৃতি।সেই সমাজ ব্যবস্থায় সে হার মানে নি, সে আত্মসম্মন শব্দটা কোনদিন শুনেই নি, অথচ এটা ছিল প্রবল। আর স্বাধীনতা!!!এটা অনেক আধুনিক। তার পর ও সে তার নিজের মত জীবন যাপন করে গিয়েছে। তার এই স্বাধীন চেতনাকে আমার হাজার সালাম।জীবনের শেষ পর্যন্ত কারো উপর নির্ভরশীল ছিলেন না।প্রচন্ড আত্ম সম্মান বোধ সম্পন্ন একজন স্বাধীন অশিক্ষিত রমনি একজন সাথর্ক মা, ভালবাসার শ্বাসুড়ি,সমাজের সব শ্রনীর ভালবাসার মানুষ ছিলেন তিনি। আমার কাছে একজন মানুষ।
আমার মনে হয় ছোট বেলায় ছেলে মেয়েদের ভালবাসা দিলে, নির্ভরতা দিলে, সুন্দর এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলে, মাঝে মাঝে তাদের উপর নির্ভর করলে দেখা যাবে সে স্বাধীনতা কে উপভোগ করবে। সে এর সৃস্টি করবে।কেউ কারো স্বাধীনতা এনে দিতে পারে না। একটা ভরসা দিতে পারে মাত্র। তুমি যাও আমি আছি, তোমার সাথে।এক্ষেত্রে মানুষে আত্মসম্মান বোধ, আর আত্মবিশ্বাস ই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।আর অর্থনীতির সাথে যেহেতু জীবন যাপন জড়িত, তাই এটার সোর্স থাকাটা জরুরী।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জুন, ২০০৬ বিকাল ৪:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




