--------------------------------
অর্থ যাই হোক , লোডশেডিং জিনিসটা কিন্তু খারাপ লাগত না।বিশেষ করে রাতের লোডশেডিং তো আমাদের খুব প্রিয় ছিল।আহা কি আনন্দ। পড়া শুনা নাই।তবে লোডশেডিং এ সবচেয়ে কষ্ট পেতে দেখেছি কল্পনার মা জেঠিকে। আমাদের পাশের বাসার বিধবা হিন্দু। দিনে মানুষের বাসায় কাজ করত,রাতে তার একমাত্র বিনোদন টিভি, তাও এই বাড়ী ঐ বাড়ি তে দেখা। যখন বাংলাসিনেমা শুরু হতো তখন যদি কারেনট যেত, তাহলে তার মনখারাপ কে দেখে। সবাই উঠানে বের হয়ে আসত গল্প কারার জন্য ,সে মন খারাপ করে বিদ্যুৎ অফিসকে গালি দিতে থাকত।
-----------------------------
বিদ্যুৎ নেই , পাশের পাওয়ারলুম এর শব্দ ও নেই। নেই গজ হিসেবে কাপড় বুননের কারিগরের বেতন।তবু সেই সময় টায় রাস্তায় বের হয়ে এসে সহকর্মির সাথে গল্প জুড়ে দেয়।
----------------------------
কিনু্তবিদ্যুৎ নাই মানে আমাদের ঈদ। আমি যেহেতু চুপ চুপা মানুষ তাই সবাই উঠানে বের হয়ে গেলে আমি ঘরে থাকতাম, শুয়ে শুয়ে আকাশ পতাল কল্পনা করতাম, বা গলা ছেড়ে গান গাওয়া, সুর নাই তাল নাই, যত গান পারতাম সেই রবিদা, নজু ভাই ভাটিয়ালী,বাংলা সিনেমার গান যা শুনেছি, যার একলাইন বা দুই লাইন ও মনে আছে সব গাইতে চাইতাম, এর একটা বিশেষ স্টাইল ছিল আবার, খাটে শুয়ে পা দেয়ালে দিয়ে গাইতাম।জোছনা হলে একেবারে বার বাড়িতে।তখন ও বাসায় ছাদ হয়নি তাই মাঝে মাঝে সবাই মিলে নদীর পাড় চলে যেতাম, পাথর ঘাটায় পাথরে বসে গল্প গান কবিতা, আহা কি দিন ছিল।
----------------------------------
সবচেয়ে মজার ছিল আমার ছোট দুই ভাইয়ের কান্ড। খুবই মজা পেতাম।তাদের মাঝে বড়টা রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট ছিল সেই স্কুল জীবন থেকে ই। তার আশে পাশে খুব কম মিটিংই সে মিস করেছে।আজব নেশা, জানিনা, কোথায় পেল সে। সে কারেন্ট চলে গেলে দিত রাজনৈতিক বক্তৃতা। যেন সে নিজেই নেতা। মাঝে মাঝে মুডের ঊপর ডিপেন্ড করে তাদের চলত ওয়াজ মাহফিলের আসর, দুইভাই ওয়াজের সুরে ওয়াজ করে যাচ্ছে , কখনও ধর্মিয় বিষয় বলে, কখনও বা নিজের মনের মত একটা কিছু,যেমন আম্মা বা আমার বিরুদ্ধে কিছু,কিন্তু সুর হলো ওয়াজের ।
-----------------------------------
ঢাকায় এসে লোডশেডিং দেখলাম অন্য ভাবে, রাতে লোডশেডিং হলে সব কাচ্চা বাচ্চা বের হয়ে ছাদে। ঢাকায় ছাদ কালচার নিয়ে লিখলে বিশাল থিসিস পেপার হয়ে যাবে।শুধু মূখ্য বিষয় গুলো বলি। যুবক ছেলেরা অবশ্য গলিতে হাটতে ই পছন্দ করে,অবশ্যই সাথে থাকবে উচু গলায় গান বা বন্ধুর সাথে আলাপ। কারন তার প্রেমিকা বা পছেেন্দর মেয়েটাতো বাসার ছাদেই আছে এখন। মোবাইলের যুগে হয়ত লোডশেডিং আর ফোন একসাথে ই শুরু হয়, সেই খাজুইরা আলাপ।কিছু পোলাপান রাস্তায় দাড়িয়ে খেলা , বা রাজনীতি নিয়ে মেতে উঠবে।আর যারা বাথরুমে আছেন তারা কেমন থাকেন বুঝা যাচ্ছে না। তবে তখন যদি পানি চলে যায় তখন মনে হয়না আর গান বেরুবে গলা দিয়ে।কান্না কাটি করতে পারেন হয়ত।
---------------------------------
ঢাকায় থাকা মানুষ জনের জোছনা প্রেমী হবার তেমন কোন চান্স নাই। আরে জোছনা দেখলে তো প্রেম হবে। পাবে কই? আমি আর সাজু কত অলি গলি ঘুরেছি এই পাহারাদার ল্যাম্পপোস্ট গুলোর চোখ ফাকি দেবার জন্য। আমরা তো এক সময় ঠিক ই করে ফেললাম, যে আমরা সিটি মেয়র হলে পূর্নিমা রাতে ঢাকায় সারা শহর জুড়ে লোডশেডিং হবে।
----------------------------------
সেই শোড়ষী চাঁদের মতই আলো ছড়িয়ে দেয় এই লোডশেডিং কিছু ছেলের চোখে মুখে। যার যা আছে তা নিয়ে নেমে পরে রাস্তায়, খুজে বের করে কোন পথচারী বা যাত্রি,সব স্থাবর সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে ভয়াব হ মানসিক বিপর্যয়ে ফেলে রেখে যায় তাকে সেই অন্ধকারে। মাঝে মাঝে লোডশেডিং এর সময় কে বেছে নেয়া হয় বিশেষ কোন অপারেশনের জন্য। যেমন তাকে ফেলে দিতে হবে। ঐ সময় ঐখানে কারেন্ট নাই কর সুযোগের ব্যব হার।
---------------------------------
অপারেশন থিয়েটারের রোগী যদি লোডশেডিংএ পড়েন তবে কি হয় বা কেমন লাগে তা কিছুদিন আগের পত্রিকা পড়লেই পাওয়া যাবে ।
------------------------------------
এমনি প্রতিটা মানুষের মাঝে লোডশেডিং আসে আলাদা আলাদা শেড নিয়ে।, যদিও এর শাব্দিক অর্থ বা ভাবর্থ নিয়ে কেউ ভাবে না তবু আমার কাছে লোড-ভার,শেড-প্রলেপ ।এই বিদ্যুৎহীনতার সময়টুকু আমাদের ভারী অনুভুতির উপর আলাদা প্রলেপ দেয়, দেয় আলাদা আলো। মানুষ আমরা কিছুটা সময়ের জন্য বের করে আনি নিজেদের জন্য প্রয়োজনীয় আলো।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০০৬ রাত ৮:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




