4 ক্লাশ পর্যন্ত আমি ছিলাম ইংলিশ স্কুলে। নরসিংদীর প্রথম ইংলিশ স্কুল।বৃত্তি দেয়ার লোভে আমাদের সবাই ,মানে ছেলে রা বয়েজ স্কুলে আমরা মেয়েরা মেয়েদের স্কুলে।এই স্কুলে এসে ই একটা সাড়া ফেলে দেই মোটা মুটি। ছাত্রী হিসাবে যেমন ভাল ছিলাম...দুষ্ট হিসাবেও অসাধারন। আমার এই 2 য় গুন আবার আমার পরিবার জানত না।এমন লক্ষি মেয়ে।কখন ও বাসায় বিচার যায়নি বিধায় হয়ত টের পায় নি তেমন।
আমার আসল উদ্যেশ্য আমার বাদরামী আর ভালমানুষী বর্ননা না। আমি আজ একজন কে পরিচয় করিয়ে দেব, যার সাথে পরিচিত হব ভেবে আমার ভবিষ্যৎ আমি অন্ধকার দেখছিলাম(বদরামী করতে পরব না ভেবে)।
হ্যা হাসি আপা।আমার ক্লাশ টিচার হবে, হাসি আপা।4ফুট 8 ইনচির একজন মহিলা, কি দুর্দান্ত প্রতাপ। সারাক্ষন বেত হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কখন ও নাকি তাকে কেউ হাসতে দেখে নাই। তার বেতের বাড়ি খায় নাই এমন মেয়ে নাই নাকি। স্কুলে পানি খেতে যাওয়া, বাথরুমে যাওয়া একটা কমন ব্রেক। এটা সবাই জানেন। কিন্তু হাসি আপার ক্লাশে নাকি সবাই সব ভুলে যায়।শুধু তাই না , ওনি ক্লাশে বসে আছেন.... অন্য ক্লাসের মেয়েরা ও বাইরে দাড়তে ভয় পেত। কারন হাসি আপা কে দেখা যায়, মােেঠর ওপাড়ের ক্লাশ রুম এ। তাই বের হয়ে পানি খাবার উছিলায় ও কেউ যেতে পারত না।
সেই আপা, আমার ক্লাশ সিক্স এ ক্লাশ টিচার। এর মধ্যে নতুন ছাত্রী এসে ই আগের ছাত্রীদের পিছনে ফেলে প্রথম হয়ে যাওয়া, বৃত্তি পেয়ে যাওয়া, আমাকে একটা জায়গায় এনে দাড় করিয়েছে , সবার আকাংখা গিয়েছে বেড়ে,আমার প্রতি।
যাই হোক, সেই হাসি আপার বাংলা ব্যাকরন ক্লাশে আমার জান যায় যায় অবসথা। তার উপর, কেপ্টেন। সারাক্ষন বেতের উপর। যে কোন কারনে ই হোক, আমি তার হাতের মাইর খাই নি কখন ও। একটা বছর ভাল ই কেটে গিয়েছে।খুব আদর করেেেছ তা না। এরশাদের আমল ছিল বলে, হরতাল লেগে ই থাকত। হরতালে অনেক শিক্ষক ই আসত না। কিন্তু আমি আর হাসি আপা উপসথিত।6- 7 ক্লাশে উঠার সময়, আমি 1য় হয়ে গেলাম,। কিন্তু আমার সাইন্স খারাপ হয়েছে। আমি জানি আমি কোন ভুল করি নাই। আমাদের ক্লাশেরযে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে, সে যে স্যার এর কাছে পড়ে,সে আমাদের ই শিক্ষক। সে বেশ কিছুবিষয়ের প্রশ্ন তাকে দিয়েছে। সে 2য় হয়েছে।সবাই রেজালট এ মর্মাহত। কালাম স্যার বল্ল রিচেক এর কথা।স্কুলে একটা কেলেংকারী করে ফললাম আমি। আমি রেসালট মানি না বলে একটা আবেদন করে ফেললাম। আমার বাবা মা আমাকে কিছু বলে নাই। কিন্তু মেনে নিতে পরি নাই অন্যায় টা। প্রথম হয়েছি ভেবে শান্ত থাকতে পরতাম।তখন সব স্যার আপারা ই(বিশেষ কিছু স্যার বাদে)আমার সাথে এসে দাড়াল। যে সবচেয়ে বেশী সাহস দিয়েছে সে হাসি আপা। ঐ পরীক্ষা আবার নেয়া হয়েছিল।
যাই হোক যা বলছিলাম, তার পর হাসি আপার সাথে আমার একটা কেমন যেন বোঝা পড়া হয়ে গেল। তাকে আর খুব রাগী লাগতনা। সে আসলে ই তেমন রাগী না, তার আবরন টা বেশ রাগী।7ম শ্রেনীতেও তার ক্লাশ ছিল, তাই হরতালে র সময় গুলু ভালই উপভোগ করতাম।দু-তিন জন ছত্রী, মাঝে মাঝে আমি একা। সেও কেমন যেন আমাকে একটু বেশি ই আদর করত।শত দুষ্টামীর পর ও।
সত্যি, তাকে রাগি না হলে হয় না, রোকেয়া হল এ থাকত। অনেক আন্দোলন দেখেছে, নিজে অংশ নিয়েছে, বর্ববরতা দেখেছে, হল এর বর্বরতা সম্পর্কে প্রথম শুনি তার কাছে ই, পরে অবশ্য হলের দাদুদের কাছে শুনেছি।বিয়ে হয়েছিল যুদ্ধের আগে। স্বামী নরসিংদী কলেজের শিক্ষক। তা ও তাদের হজম হল না। সেদিন নরসিংদী শহরের যে সব শিক্ষিত মানুষদের চুয়ালা ব্রিজের নিচে রাতের আধারে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল, তাদের মাঝে তার স্বামী ও ছিল। তখন তার পেটে সন্তান। সে সন্তান তার বাবা কে কখন ও দেখে নি। একটা বাড়ি ছিল। ব্যাবসা বানিজ্য যা ছিল তা দেখার কেউ ছিল না। সব লোট হয়। যুদ্ধের পর সে নিজেকে আবিসকার করে, সে একা, সাথে তার অনাগত সন্তান।
সে আর বিয়ে করে নি, নতুন করে কিছু ভাবে ও নি, এই স্কুলে টিচার হিসাবেই কাটিয়ে দিয়েছে তার জীবন। তাকে কখন ও সাদা ছাড়া রঙিন শাড়ী পড়তে দেখি নি। 71 শেষ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সেই 9 মাস, তার জিবনে 30 বছর হয়ে ধরা দিয়েছিল। সে এখন বেচে নেই। 30 বছর যুদ্ধ করে গিয়েছে সে। আমরা বাবা, মা, আত্মিয়, স্বজন , নিজ ধর্মের রাস্ট্রসব থাকতে ও নিরাপদ ভাবতে পারি না। তা হলে, সে কি যুদ্ধ টা করে গিয়েছে জীবনে তা কি কেউ ভাবতে পারেন।
এই যুদ্ধ সে কি করে ভুলবে, তাকে যারা দেখেছে সে কি করে ভুলবে?এই যুদ্ধ কি সত্যি অতীত কোন ঘটনা? এমন যুদ্ধা কি এখন আর নেই? সবাই কি শেষ হয়ে গিয়েছে?
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



