somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

গ্রু
এখানে প্রকাশিত সবকিছু নিছকই আমার কল্পনাপ্রসূত অবচেতন মনের বিশেষ কিছু চিন্তার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এসবের কোনকিছু বাস্তবের কোন ব্যক্তি বা ঘটনার সাথে মিলে গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত ও কাকতালীয়।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ: রক্তের উত্তরাধিকার

০৩ রা জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৩:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



কাঁচ ভাঙার ঝনঝন শব্দে পুরো বাগানটা কেঁপে উঠল। বেলজিয়াম আয়নার শত শত টুকরো এখন ঘাসের ওপর ছড়িয়ে আছে। জহির চৌধুরী আর মফিজুর রহমান- দুই ভাই মুখোমুখি। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে অনিরুদ্ধ। তার মাথার পাশ দিয়ে একটা বুলেট চলে গেছে, যা অল্পের জন্য তার কান স্পর্শ করেনি।

"থামুন আপনারা!" অনিরুদ্ধ চিৎকার করে উঠল। "এই পাগলামি বন্ধ করুন।"

মফিজুর রহমান হাসছেন। তার কপালে ব্যান্ডেজ, হাত কাঁপছে, কিন্তু তার চোখে এক ধরণের জিঘাংসা। "অনিরুদ্ধ সাহেব, আপনি তো অনেক বড় গোয়েন্দা। এখন দেখুন, আমার ভাইজান কেমন করে জ্যান্ত হয়ে ফিরে এসেছেন। তিন বছর আগে যাকে আমি নিজ হাতে কবরে দিয়েছিলাম, সে আজ আমার সামনে দাঁড়িয়ে গুলি ছুড়ছে।"

জহির চৌধুরী স্থির দৃষ্টিতে মফিজের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার পরনে সেই পুরনো ধুতি আর পাঞ্জাবি। তার শরীরটা খুব রোগা হয়ে গেছে, যেন চামড়া হাড়ের সাথে লেগে আছে।

"মফিজ, তুই কবিরকে মেরেছিস," জহির চৌধুরীর গলাটা খুব ভারী। "কবির আমার যমজ ভাই ছিল বলে তাকে সবাই আমি মনে করেছিল। তুই জানতিস সে আমি নই, তবুও তুই তাকে পাহাড়ের খাদে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছিলি। তুই সম্পত্তি চেয়েছিলি।"

মফিজুর রহমান অট্টহাসি দিলেন। "সম্পত্তি তো আমি পেয়েছিই জহির ভাই। কবিরকে মারার পর আমি তোকে এই বাড়ির নিচে বন্দী করে রেখেছিলাম। তুই তিন বছর সূর্যের আলো দেখিসনি। লোকে ভেবেছে তুই মারা গেছিস। আর এখন যখন তুই পাগল হয়ে গেছিস, তখন ফিরে এসে লাভ কী?"

অনিরুদ্ধ সবটা বুঝতে পারল। এই পুরো রহস্যের মূল হলো একটি জমজ ভাইয়ের কাহিনী। কবির চৌধুরী ছিল জহির চৌধুরীর যমজ ভাই। মফিজুর রহমান কবিরকে হত্যা করে জহির চৌধুরীর মৃত্যুর নাটক সাজিয়েছিলেন। আর আসল জহির চৌধুরীকে বাড়ির গোপন কুঠুরিতে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। নীলা সম্ভবত তার বাবাকে বাঁচাতে হিমাদ্রিকে ব্যবহার করছিল।

"নীলা কোথায়?" অনিরুদ্ধ হঠাৎ প্রশ্ন করল।

ঠিক সেই সময় বাগানের ঝোপের আড়াল থেকে নীলা বেরিয়ে এল। তার হাতে একটা বিষাক্ত ইনজেকশন। সে মফিজুর রহমানের দিকে এগোতে লাগল।

"কাকা, আপনি বাবাকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন," নীলার গলায় কোনো আবেগ নেই। "এখন আপনার যাওয়ার সময় হয়েছে।"

"নীলা, থামো!" অনিরুদ্ধ ধমক দিল। "আইন নিজের হাতে তুলে নিও না।"

"আইন?" নীলা হাসল। "যে আইন তিন বছর ধরে আমার বাবাকে অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা দেখতে পায়নি, সেই আইনের ওপর আমার ভরসা নেই।"

পরিস্থিতি খুব দ্রুত নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছিল। একদিকে জহির চৌধুরীর রিভলবার, অন্যদিকে মফিজুর রহমানের পিস্তল, আর মাঝখানে নীলার বিষাক্ত প্রতিশোধ।

অনিরুদ্ধর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সে জানে জহির চৌধুরী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তাকে স্বাভাবিক করতে হলে তার প্রিয় কিছু একটা দরকার।

"জহির সাহেব," অনিরুদ্ধ ধীর পায়ে জহির চৌধুরীর দিকে এগোল। "আপনি কি মনে করতে পারেন নীলপদ্মের সেই গানটা? নীলা যে গানটা আপনাকে গেয়ে শোনাত?"

জহির চৌধুরী থমকে গেলেন। তার চোখের মণি কাঁপতে লাগল। "গান... নীলপদ্ম..."

অনিরুদ্ধ নীলার দিকে তাকাল। "নীলা, গানটা শুরু করুন। আপনার বাবার জন্য।"

নীলা বুঝতে পারল অনিরুদ্ধ কী চাইছে। সে কম্পিত কণ্ঠে গান গাইতে শুরু করল- একটি পুরনো গান। সুরটা বাতাসের সাথে মিশে এক অলৌকিক পরিবেশ তৈরি করল।

জহির চৌধুরীর হাতের রিভলবারটা ধীরে ধীরে নিচে নেমে এল। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। "নীলা... আমার মা..."

মফিজুর রহমান এই সুযোগটা নিতে চাইলেন। তিনি পিস্তল তাক করলেন জহির চৌধুরীর দিকে। কিন্তু তিনি ট্রিগার চাপার আগেই অনিরুদ্ধ তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। পিস্তলটা ছিটকে দূরে পড়ে গেল।

পুলিশের সাইরেন শোনা যাচ্ছে। রফিক সাহেব তার বাহিনী নিয়ে বাগানে ঢুকে পড়লেন। মফিজুর রহমানকে গ্রেফতার করা হলো। জহির চৌধুরীকে উদ্ধার করা হলো, তবে তার শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল।

পরদিন চৌধুরী ভিলায় এক ধরণের শান্ত পরিবেশ। যদিও সব ওলটপালট হয়ে গেছে, তবুও একটা সত্য প্রকাশিত হয়েছে। অনিরুদ্ধ বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল। নীলা তার পাশে এসে বসল।

"ধন্যবাদ অনিরুদ্ধ সাহেব। আপনি না থাকলে কাল রাতে হয়তো রক্তারক্তি হয়ে যেত।"

অনিরুদ্ধ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, "রক্তারক্তি তো তিন বছর আগেই হয়ে গিয়েছিল নীলা। আমি শুধু একটা নাটকের শেষ দৃশ্যটা অভিনয় করলাম। কিন্তু একটা কথা- সেই নীল কাঁচের টুকরোটা কোত্থেকে এসেছিল?"

নীলা পকেট থেকে একটা ছোট নীল রঙের শিশি বের করল। "এটা বাবার ইনসুলিনের শিশি ছিল। মফিজ কাকা এটা ভেঙে দিয়েছিলেন যাতে বাবা কষ্ট পান। আমি ওই কাঁচের টুকরোগুলো ছড়িয়ে দিয়েছিলাম যাতে আপনি কোনো সূত্র খুঁজে পান।"

অনিরুদ্ধ হাসল। "আপনি খুব বুদ্ধিমান মেয়ে নীলা। কিন্তু জহির সাহেব কি কখনো পুরোপুরি সুস্থ হবেন?"

নীলা আকাশের দিকে তাকাল। "জানি না। তবে এখন তিনি অন্ধকার ঘরে নেই। মুক্ত আকাশে নিশ্বাস নিতে পারছেন। এটাই অনেক।"

অনিরুদ্ধ উঠল। তার কাজ শেষ। ঢাকা শহরে আবার বৃষ্টি নামার উপক্রম। সে রিকশার জন্য অপেক্ষা করছিল। ঠিক তখন তার মনে পড়ল সেই আয়নার কথা।

আয়নার পেছনে জহির চৌধুরী কী লুকিয়ে রেখেছিলেন?

সে আবার ভেতরে গেল। ভাঙা আয়নার ফ্রেমটা সেখানে পড়ে আছে। অনিরুদ্ধ ফ্রেমের ভেতরটা পরীক্ষা করল। কাঠের আস্তরণের নিচে একটা খাম লুকানো ছিল।

খামটা খুলে অনিরুদ্ধ দেখল সেখানে জহির চৌধুরীর আসল উইল। সেখানে লেখা ছিল- তার সমস্ত সম্পত্তি যেন কোনো অনাথ আশ্রমের নামে করে দেওয়া হয়, আর নীলাকে যেন তার অভিভাবক করা হয়। মফিজুর রহমানের জন্য সেখানে এক পয়সাও রাখা হয়নি।

জহির চৌধুরী জানতেন একদিন না একদিন তার ভাই তার ক্ষতি করবে। তাই তিনি আগেভাগেই এই ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন।

অনিরুদ্ধ রিকশায় উঠল। বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা তার গায়ে পড়ল। সে ভাবল, মানুষের মন বড় বিচিত্র। কেউ সম্পত্তির জন্য ভাইকে মারে, আর কেউ সত্যের জন্য নিজেকে তিন বছর অন্ধকারে বন্দী করে রাখে।

রহস্যের সমাধান হয়েছে, কিন্তু মানুষের মনের রহস্য কি কখনো শেষ হয়? নিউটন বিড়ালটা হয়তো এর উত্তর জানে, কিন্তু সে তো কথা বলতে পারে না।

(চলবে...)
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৩:৩০
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইহকালে আল্লাহর ইবাদত না করলে পরকালে আল্লাহর ইবাদত করতেই হবে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৭:২৭



সূরাঃ ৫১ যারিয়াত, ৫৬ নং আয়াতের অনুবাদ-
৫৬। আমি জিন ও মানুষকে এ জন্য সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমারই ইবাদত করবে।

* আল্লাহ মানুষকে ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন, সুতরাং তাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

রমজান ও সিয়াম সাধনা: আধুনিক স্বাস্থ্য-বিজ্ঞানের আলোকে একটি সমন্বিত গবেষণা-বিশ্লেষণ, পর্ব-১

লিখেছেন নতুন নকিব, ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:২৭

রমজান ও সিয়াম সাধনা: আধুনিক স্বাস্থ্য-বিজ্ঞানের আলোকে একটি সমন্বিত গবেষণা-বিশ্লেষণ, পর্ব-১

ছবি, অন্তর্জাল থেকে সংগৃহিত।

ভূমিকা

রমজান মাসের ফরজ সিয়াম ইসলামের একটি মৌলিক ইবাদত। তবে সাম্প্রতিক দশকে এটি কেবল ধর্মীয় অনুশীলন হিসেবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় কন্যা আমার- ৮৮

লিখেছেন রাজীব নুর, ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:১৬



প্রিয় কন্যা আমার-
আজ তোমার জন্মদিন। হ্যা আজ ৩১ ডিসেম্বর তোমার জন্মদিন। আজ বিশেষ একটি দিন! এবার জন্মদিনে তুমি আছো তোমার নানা বাড়ি। আমি আজ ভীষন ব্যস্ত।... ...বাকিটুকু পড়ুন

এভাবেই চলতে থাকবে...

লিখেছেন মোঃ ফরিদুল ইসলাম, ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:১৭

[] কঃ
.
যাকে লাশ ধোয়ার জন্য খুঁজে নিয়ে আসা হয়, একদিন তাকে ধোয়ানোর জন্যও আরেক লাশ ধৌতকারীকে খোঁজা হবে।
এভাবেই চলতে থাকবে...
.
[] খঃ
.
যিনি যুঁৎসই কাফনের কাপড় পরাতে পারেন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশ হায়েনাদের দখলে

লিখেছেন রাজীব নুর, ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৪৪



আমাদের দেশটা অনেক ছোট। কিন্তু জনসংখ্যা অনেক বেশি।
এই বিশাল জনশক্তি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলো। ১৯৫২ তে হলো ভাষা আন্দোলন। আর ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×