somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ধোলাই-৭১

০৩ রা মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৫:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



মধ্যপ্রাচ্যে আছি। দেশে ফেরার টিকেট কাটা ছিল ২ তারিখে। এর মধ্যেই শুরু হয়ে গেলো যুদ্ধের দামামা।আমি আরবি বুঝিনা। এয়ারপোর্টে কাউকে ইংরেজিতে কিছু জিজ্ঞেস করলে বলে ''খালাস খালাস'' মাফি মাফি। আমিও বাংলায় বলি ''বাল''।এটা বলার পরে নিজের রাগ কিছুটা প্রশমিত হয়। যারা ইংরেজি বুঝেন তারা কেউ নেই কোনো বোর্ডিং পয়েন্টে। কিছু দেশি ভাইয়েরা ছিল এয়ারপোর্টে জব করে তারাও কিছু বলতে পারলো না। দুইদিন এয়ার পোর্টে যেয়ে ফিরে এলাম বাসায়। ফ্লাইট বাতিল। কখন কি হবে কেউ জানে না।
টেনশনে ঘুম নেই তিনদিন। দেশে মেয়েটা অসুস্থ তাই জরুরি ছুটি নিয়েছিলাম। অফিস থেকেও বললো ঈদের ছুটি কাটিয়ে আসুন একদম। দুঃখের মাঝে সুখের দেখা পেলেও যাওয়াটা অনিশ্চিত হয়ে গেলো আপাতত। দেখি সামনে কতদিন এভাবে চলতে থাকে।
বাসায় ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ফেসবুক স্ক্রলিং করছিলাম আর হামলা পাল্টা হামলার ভিডিও গুলো দেখছিলাম। কার কত সক্ষমতা, কে ঠিক কে বেঠিক, কখন শিয়াদের পক্ষ নিতে হবে,কখন নিজেকে সুন্নি বলতে হবে এসব নিয়ে অনেক জ্ঞান এবং তথ্যমূলক অনেক পোস্ট দেখতে পারছিলাম বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত হওয়া পেজ এবং ব্যক্তিগত প্রোফাইলে। হঠাৎ একটা ঘটনা মনে পরে গেলো।
২০২২ সাল। আমি বাংলাদেশে জব করি। একটা মেকানিক্যাল সিস্টেমের পার্টস এর জন্য গেলাম নবাবপুর। অনেকেই আশা দিলো ওখানে গেলে মিস হবে না,পেয়ে যাবেন অবশ্যই। বুক ভরা আশা নিয়ে চলে গেলাম ঢাকার নবাবপুরে।
নবাবপুরে ঢুকতেই রাস্তার পাশে দোকানগুলোর সামনে কিছু যুবক ছেলেরা দাঁড়িয়ে থাকে। হাতে ব্যাগ দেখে একজন বললো, কি লাগবো ? নষ্ট হয়ে যাওয়া পার্টস তাকে দেখানো মাত্রই বললো আছে তার কাছে। খুশি হয়ে গেলাম আর মনে মনে ধন্যবাদ দিলাম তাদেরকে যারা বলেছিলো ইটা মিলবেই এখানে। ছেলেটা আমাকে তার সাথে যেতে বললো। একটা ছোট্ট দোকানে নিয়ে গেলো কয়েকটা গলি অতিক্রম করে। একটা রোডের পাওয়া লাগানো কাঠের টুলে বসতে দিলো।
দোকানের ভেতর বসা সাদা পাঞ্জাবি পড়া একটা লোক কে উদ্দেশ্য করে বললো " মাহাজন, বাইয়ের একখান পার্টস লাগবো, দেহেন তো। লোকটা না দেখেই বলতে থাকলো পাওন যাইবো। আমি ব্যাগ খুলে আগের নষ্ট পার্টস দিলাম তার হাতে। লোকটা বললো, দুধ চা না লাল চা ? ধন্যবাদ দিয়ে বললাম লাগবে না। লোকটা বললো বসেন আমি পার্টস আনাইতাছি। কাঠের চেয়ার থেকে উঠে ওই ছেলেটার কানের কাছে যেয়ে কি কি যেন বলে বললো, যাহ।, লইয়া আয়। চাবিডা লইয়া যাইস।
আমি বসে আছি দোকানে। সময় যাচ্ছে ছেলেটার আসার কোনো খোঁজ নাই। মিনিট বিশেক পর জিজ্ঞেস করলাম আসছে না কেন ? লোকটা বললো গোডাউনে তো অনেক মাল, খুঁইজ্যা পাইতে একডু টাইম লাগতাছে। এভাবে বসে থাকতে থাকতে এক ঘন্টা পর ওই ছেলেটা এসে বললো গোডাউনে নাই। মেজাজ টা খারাপ হয়ে গেলো। তর্ক না করে বের হয়ে গেলাম দোকান থেকে। এরপর ভাবলাম দোকানে দোকানে যেয়ে জিজ্ঞেস করবো। আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম যেই দোকানেই দেখাই বলে নাই।
প্রায় তিন ঘন্টা ঘুরে ক্লান্ত। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম ভালো খাবার হোটেল কোথায়। বললো ওই সামনের রাস্তায় যেয়ে বামে গেলেই ষ্টার হোটেল। গেলাম সেদিকে। স্টারে ঢুকে মেনু চাইতেই বললো কাচ্চি না মোরগ পোলাও ? সাদা ভাতও আছে। কোনো কিছু না ভেবে বললাম কাচ্চি লাগাও। সাথে সালাদটা মরিচ দিয়ে বানায়ে দাও। স্টারের কাচ্চি খাওয়ার পর তাদের বানানো বাদামের শরবত একদম দিল ঠান্ডা করে দিলো।
আবার বেরিয়ে পড়লাম পার্টসের খোঁজে। এবার একলোক দেখে বললো সারা মার্কেট এই জিনিসটার খোঁজ করে হয়ে গেছে কারো কাছে নেই।তখন ভাবলাম ওই ছেলেটা তাহলে গোডাউনের কথা বলে সারা মার্কেট ঘুরে দেখছে। বুঝে গেলাম তাদের গোডাউনের রহস্য।
লোকটা বললো, এটা কোনো দোকানে পাবেন না, আপনি সামনে লেদ মেশিনের ওয়ার্কশপ আছে ওখানে যেয়ে দেখলে ওরা সেইম টু সেইম বানিয়ে দিবে। বললাম ভালো কাজ কে করে আপনি কি নাম বলতে পারবেন? বললো সামনে রথখোলা মোড়ে যেয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করেন মিন্টু ওস্তাদের দোকান কোনটা, বলে দিবে। হাটতে হাটতে রথখোলা মোড় যেয়ে ওস্তাদের দোকান খুঁজে পেলাম। ওস্তাদ একাই দোকানে কাজ করছে। জিজ্ঞেস করলাম তিনি মিন্টু ওস্তাদ কিনা। বললো হ্যা।
ব্যাগ থেকে পার্টস টা বের করে ওস্তাদকে দেখলাম। ওস্তাদ ভালোমতো নেড়েচেড়ে দেখে বললো, হবে সময় লাগবে ঘন্টা খানেক। চাইলে বসতে পারেন আবার ঘুরাঘুরি করেও আসতে পারেন। বললাম বসি। একটা পুরোনো চেয়ার এগিয়ে দিলেন।
ওস্তাদের হাতের কাজ শেষ। এবার আমার দেওয়া স্যাম্পলটা নিয়ে আবার ভালোমতো দেখে বললো লোহা দিমু না স্টিল? স্টিলের দাম বেশি পরবো। জিজ্ঞেস করলাম কত? বললো একদম ১৫০০ টাকা। এর কমে পারমু না। অফিস থেকে ওই পার্টস এর জন্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে কোটেশন নিয়েছিল ১ লাখ ২৬ হাজার টাকা। নবাবপুরে আমাদের বাজেট ছিল ৩০ থেকে ৫০ হাজার মধ্যে পাওয়াভগেলেও নিয়ে নেওয়ার। বললাম শুরু করেন।ওস্তাদ কিছু না বলে কাজ শুরু করে দিলো। আমি বসে বসে তার কাজের নৈপুণ্য দেখতে লাগলাম। ১০ মিনিট পরে ওস্তাদ একটা পুরোনো ভার্নিয়ার ক্যালিপার দিয়ে মেপে দেখলেন। তারপর আবার মেশিন দিয়ে টার্নিং শুরু করলেন। ২০ মিনিট পর মেশিন থেকে খুলে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন মিলায়ে দেখেন ঠিক আছে কিনা। ওস্তাদের হাত টা একটু ধরে দেখলাম। ওস্তাদ মুচকি হাসলো। দেখি একজন চা নিয়ে হাজির হয়ে গেলো সাথে দুইটা খাজা। বসে খেলাম, ওস্তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে কথা হলো। ছেলেটা স্কুলে পরে ক্লাস টেন এ। সাইন্স নিয়ে পরে। ছেলের ইচ্ছে বড়ো হয়ে বিমান বানাবে, যুদ্ধ বিমান বানাবে।
বললাম বাংলাদেশ তো বিমান বানাতে পারে না ওস্তাদ । ওস্তাদ হাসি দিয়ে বললো, পোলা লেখাপড়া কইরা শিখবো কেমনে বিমান বানাইতে হয়, আর আমি স্যাম্পল দেইখাই মেশিন দিয়ে বানাইয়া ফেলমু। হয়না বলতে আসলে কিচ্ছু নাই। যদি আপনারে কেউ না বানাইতে দেয় হেইডা অন্য কথা, আর কেউ যদি আপনারে সুযোগ দিয়ে কয়, তুমি বানাও আমি সাথে আছি, তাইলে সব সম্ভব।
মিন্টু ওস্তাদের মতো লোকগুলো ফেলে দেওয়ার মতো নয়। তাদের যে অদম্য স্পৃহা আছে তা যদি এই গত ৫৪ বছরের শাসক সমাজের মাঝে এবং দেশের কথিত কারিগরি/ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালগুলোর থাকতো তাহলে হয়তো দেশ ছোট হলেও একটা মিসাইল বানাইতে পারতো। হয়তো নাম হতে পারতো
মিন্টু -১
মিন্টুর পোলা -৫৬
রথখোলা- কিলার ৭
জিঞ্জিরা-২৮
ধোলাই-৭১।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৫:৩২
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের শাহেদ জামাল- ৯৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৩ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৮:৩৫



কথায় বলে না, একটা দূর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না!
এটা একদম সত্যি কথা। মানুষ আসলে ভুল করবেই! ভুল থেকে মুক্তি নেই মানুষের। আমার জীবনটা কিভাবে ছাড়খার হয়ে গেলো সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংসদে যা ঘটেছে সেটা কি অপ্রত্যাশিত ছিল ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৮:৪৯


দুই দিন আগে কুমিল্লার পরিচিত এক মুদি দোকানে সদাই কিনতে গিয়েছিলাম; সেখান থেকে প্রায়ই বাজার করি। হিসাব মেলাচ্ছিলাম, হঠাৎ তিনি উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন—"আগামীকাল তো সংসদ! হাসনাত আবদুল্লাহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রসঙ্গ 'চাঁদগাজী' (সাময়িক পোষ্ট)

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৩ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ১০:২০



আমি কোনো রকম ভনিতা না করে স্পষ্ট জানতে চাই-
ব্লগার 'চাঁদগাজী' কবে থেকে প্রথম পাতায় লেখার সুযোগ পাবেন? তাকে আর কতদিন শাস্তি দিবেন? সরকার পতনের পর কারাগার থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার কালপুরুষ ভাইয়া

লিখেছেন অপ্‌সরা, ১৩ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:০০


আমার কালপুরুষ ভাইয়া। গত ৭ই মার্চ যিনি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। খবরটা আমি জানার পর থেকেই মনটা খারাপ হয়ে আছে। ভাইয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপিপন্থী ব্লগারদের বাকস্বাধীনতা হরনের নমুনা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ১৪ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ১০:১৬

বিএনপির মির্জা আব্বাস অসুস্থ হবার পর কিছু বিএনপি সমর্থক এর দায় খুবই ন্যক্কারজনকভাবে নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর উপড় চাপাতে চাইছে !! অসুস্থ মির্জা আব্বাসের ছবি দিয়ে এরকম... ...বাকিটুকু পড়ুন

×