
পহেলা মে বিকেলে একটি আমন্ত্রণ ছিল। অনুষ্ঠানটি ছিল বই প্রকাশনার। এই আয়োজনটি শুরু হয়েছিল বলা যায় এক বছর আগে। যখন একটি লেখা দেওয়ার আমন্ত্রণ এসেছিল। লেখাটি ছিল বিদেশের জীবনযাপনের অভিজ্ঞতার উপরে। লেখা শুধু আমার একার ছিল না। এমন আমন্ত্রণ ছিল অনেকের কাছে। কানাডার বিভিন্ন প্রভিন্সে অবস্থিত সমস্ত বাংলাদেশি লেখক এর কাছে, জীবনযাপনের অভিজ্ঞতার লেখা চেয়ে আমন্ত্রণ পৌঁছে ছিল। আর এই আমন্ত্রণটি করেছিলেন সুব্রতকুমার দাস। উনি নিজে লেখক কিন্তু তার চেয়ে বড় বেশি সংগঠক, সম্পাদক। উনি একা নিজের লেখা নিয়ে বসে থাকেন না, নিজের লেখার পাশাপাশি অনেক লেখককে একসাথে করে তাদের লেখা নিয়ে এক মলাটের ভিতরে সাজিয়ে সুন্দর বই করে তুলেন। সমস্ত মানুষকে সাথে নিয়ে চলার মধ্যে আনন্দ পান এবং এই কাজটি খুব সুচারুরূপে তিনি করতে পারেন। গতবছর প্রথম কানাডা জার্নালের সম্পাদনায় কানাডার অধিবাসীর অভিবাসী জীবনের গল্পগুলো এক মলাটে ভিতর একটি বই করেছিলেন।
নতুন একটি বই আর যাতে নিজের লেখা ছাপা হয় সেটা দেখার আগ্রহ থাকে অনেক। তাই আমি একদিন ওনার বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ফোন করে বললাম, শুনেছি বইটি এসেছে, আমি কি নিয়ে যাবো আমার কপি?
তিনি বললেন, আমি তো এভাবে বই দিবো না আপনাকে। অনুষ্ঠানে আসতে হবে তারপর সেখানে বই পাবেন। গতবছর অনুষ্ঠানের আয়োজন করে লেখকের হাতে বই তুলে দিয়েছিলেন যত্ন করে।
এবছরও আরো একটি বই, কানাডার জীবন-যাপনের অভিজ্ঞতার উপরে করেছেন। আমাকে যখন জানালেন লেখা দিতে হবে। আমি তখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম দেশে যাবার। ব্যস্ততার মধ্যে লেখাটা শেষ করে পাঠিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিলাম। প্রায় দুমাস পরে ফিরে এসে মেইল চেক করে দেখি সুব্রত জানিয়েছেন। লেখা নাকি দেখা যাচ্ছে না। অথচ আমি লেখা পাঠিয়েই নিশ্চিন্ত মনে ঘুরতে চলে গেছি। যোগাযোগ করলে জানালেন। সমস্যা নাই ঠিক করে ফেলেছি।
আসলে বাংলা ভাষার লেখা এখনও অনেক সময় অনলাইনে উল্টাপাল্টা হয়ে যায়। সুব্রত সে সব ঝামেলাও সহ্য করে, ঠিকঠাক করে যত্ন করে প্রকাশ করেছেন লেখা ।
একাত্তরের সাথে বাংলাদেশের নাড়ীর বন্ধন তাই হয়তো সুব্রত একাত্তরজন লেখকের অভিজ্ঞতা এই বইয়ের জন্য বেছে নিয়েছেন। পুরো এক বছর ধরে বইটি প্রকাশ করার আয়োজন চলছিল। একাত্তর জন লেখকের লেখা সংগ্রহ করে সম্পাদনা করে সেই বইটি ফেব্রুয়ারি বইমেলাতে প্রকাশিত হয়েছিল। বইটি প্রকাশ করেছে রয়াল পাবলিশার। বইটি প্রায় পাঁচশ পৃষ্ঠার বই। একাত্তরজন লেখকের অভিজ্ঞতা বিদেশের জীবনযাপনের বিশাল এই বইটি দেশে প্রকাশিত হওয়ার পরে, নানা স্তর পেরিয়ে অবশেষে সুব্রত কুমারের কাছে এসে পৌঁছায়। এবং তারপর তিনি প্রত্যেক লেখক এর হাতে বইটি তুলে দেওয়ার জন্য আয়োজন করেন এক অনুষ্ঠানের। এখানে শুধুই একাত্তরজন লেখক উপস্থিত ছিলেন না এখানে উপস্থিত হয়েছিলেন কানাডার চারজন লরিয়েট পোয়েট।
বিশাল আয়োজনের অনেক পৃষ্ঠপোষক অনেক সহযোগী, যারা বাংলা কমিউনিটিকে বিদেশের মাটিতে আরো দৃঢ়ভাবে সাহিত্য সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সমবেতভাবে পৃষ্ঠপোষকতায় সাহায্য করছেন। কমিউনিটির বাংলা মেইল, পত্রিকার সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মিন্টু, উনার পত্রিকা বাংলা মেইলে, লেখকদের লেখা প্রকাশ করে কমিউনিটির মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন সাথে লেখকদেরকে সম্মানিত করছেন।
ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতিষ্ঠিত মানুষরা সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন একটি অনুষ্ঠানকে সফল করার জন্য। নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী সব সময়ই তারা পাশে থাকার চেষ্টা করছেন সাহায্য সহযোগিতায়। এযেন যুথবদ্ধ বিভিন্ন পাপড়ি একটি ফুলের।
অনুষ্ঠানটি ছিল কয়েকটি পর্বে বিভক্ত। প্রথমে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হল সম্মানিত কানাডার লরিয়েট পোয়েট যারা উপস্থিত ছিলেন তাদেরকে দর্শকের সাথে। চারজন লরিয়েট কবির জন্মদিন উপলক্ষে বাংলা মেইল পত্রিকা তাদের জন্য বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল। সেই রিপ্লিকা পত্রিকা অফসেট পেপারে সুন্দরভাবে ছাপানো তুলে দেওয়া হয় কবিদের হাতে তাদের সম্মানিত করে।
পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় যারা অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক। যারা লেখক ভিন্ন প্রভিন্স দূর-দূরান্ত থেকে এসেছেন সেই লেখকদের মঞ্চে ডেকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় ।
সুব্রত কুমার দাসের সম্পাদনায়, কানাডায় একাত্তর বাঙালি লেখকের অভিজ্ঞতা বইটি ছাড়াও অনুষ্ঠানে আরো দুইটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। কবি শ্যামশ্রী রায় কর্মকার সম্পাদিত সাহিত্য সাময়িকী কলকাতা থেকে প্রকাশিত। এবং লন্ডন থেকে প্রকাশিত কবি উদয় শংকর দূর্জয়ের সম্পাদিত, পোয়েট্রি আউট লাউড বইটি । এই বইটিতে বাঙালি এবং অন্য ভাষার লেখকের ইংরেজিতে প্রকাশিত লেখা প্রকাশিত হয়। অনেক বছর ধরেই পোয়েট্রি আউট লাউড সংকলনে, আমার লেখা গল্প, কবিতা ইংরেজিতে প্রকাশিত হচ্ছে। এই সংখ্যাটিতেও আমার লেখা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে ছিলেন কানাডিয়ান কবি বর্তমানে পাবলিক লেন্ডিং রাইট কমিশনের চেয়ারম্যান, বিয়াট্রিজ হাউজনার। চিলিতে জন্ম নেওয়া এই কবি, সাহিত্য সংশ্লিষ্ট বহু কাজ এবং অনুষ্ঠানের সাথে তিনি জড়িত।
উপস্থিত ছিলেন কবি আলবার্ট ফ্রান্ক মারিৎজ। একজন লরিয়েট কবি। ছিলেন লরিয়েট অ্যান মাইকেলস, একজন কানাডীয় কবি, ঔপন্যাসিক। লরিয়েট কবি, অনুবাদক আনা ইন। কবি লরিয়েট জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক, প্যাট্রিক কনরস, কবি লরিয়েট লিলিয়ান অ্যালেন এবং আরো অনেকে। এইসব কবি লেখকদের খ্যাতি এবং অর্জনের বিষয়ে লিখতে গেলে লেখা হয়ে যাবে বিশাল তাই সমস্ত ডিটেইলস আর কিছু লিখলাম না। তাদের কাজের বিষয়ে আলাদা ভাবে লিখতে হবে।
আর একাত্তর জন কবি, লেখক যাদের সময়, মেধা মননের সমন্বয়ে প্রকাশিত বইয়ের জন্য আয়োজিত এই অনুষ্ঠান। একাত্তরজন লেখক এর মধ্যে কয়েকজন বাদে সকলেই উপস্থিত ছিলেন। আরো ছিলেন সুধীজন যারা এ ধরনের অনুষ্ঠান উপভোগ করেন, নিজের সময় ব্যয় করে উপস্থিত ছিলেন অনুষ্ঠানে।
যে বইয়ের জন্য এই কর্মযজ্ঞ সেই বইয়ের সম্মানিত লেখক যাদের জন্য সম্ভব হয়েছে এই অসাধারন কাজটি। উপস্থিত সব লেখককে মঞ্চে ঢেকে, সবার হাতে তুলে দেয়া হয় সেই কাঙ্খিত বইটি।
বসন্তের অপরাহ্ন বেলায় হোপ ইউনাইটেড চার্চের ভিতরে বাহিরে অনেক মেধাবী, গুনি মানুষের সমাবেশে, সময় হয়ে উঠেছিল অনন্য।
আমি ভেবেছিলাম একটু আগেই পৌঁছাবো কারণ অনুষ্ঠান চলাকালীন সময়ে কারো সাথে বিশেষ কথা বলার সুযোগ হয় না এবং সেটা করা উচিতও না।
জিপিএস দেখাচ্ছিল ঘন্টা দেড়েক সময় লাগবে যেতে। বড় হাইওয়ে ছেড়ে ছোট রাস্তা দিয়ে গেলে একই সময়ে যাওয়া যাবে। তাই ভিড় এড়াতে মায়াবি বিকালে পাহাড়ি সুন্দরী রাস্তার পথটা বেছে নিলাম চলার জন্য। অথচ ফ্রাইডে নাইটের বিকালের রাস্তার ব্যস্ততা ক্রমাগত বাড় ছিল। যতই আমি তাড়াতাড়ি যেতে চাই ততই ভিড়ের মধ্যে আমার সময় চলে যাচ্ছিল। অবশেষে দেড় ঘন্টার রাস্তা প্রায় পৌনে তিন ঘণ্টায় শেষ হলো । অনুষ্ঠান কেবলই শুরু হচ্ছিল তখন, পুরো অনুষ্ঠানটাই দেখতে পেলাম উপভোগ করলাম কিন্তু আগে যে সবার সাথে কুশল বিনিময় করে সময়টা কাটাতে চেয়েছিলাম সেই সুযোগটা পেলাম না। তারপরও অনেক প্রিয়জনের সাথে দেখা হয়ে ভালোলাগল। নতুন করে পরিচিত হলাম অনেকের সাথে। চেনা হলো মুখোমুখি, আগে থেকে আমাদের লেখায় চেনাজানা, সামহোয়ার ইন ব্লগের লেখক সুলতানা শিরীন সাজির সাথে।
পাহাড়ি মায়াবী রাস্তায় অনেকটা একা চলার পথ ছিল দারুন সুন্দর। পাহাড়ি রাস্তা সবুজ মায়া, হলুদ আদর মাখা ঢেউ। স্বপ্নের মতন সাজানো বাড়ি ঘর, নীল ছায়া ফেলা আকাশ, গীর্জার সোনালী চূড়া। মটরসুটি কলাইর বন। কখনো খলবলে স্রোতস্বিনী নদীর পাড় দিয়ে চলা। অচেনা ফুলের ঘ্রাণ, প্রেম নিবেদন করে যেন প্রকৃতি। ভালোবাসায় কাছে ডাকে। মুগ্ধ হয়ে হয়ে দেখে দেখে, আমি দূরে চলে যাই আমার গন্তব্যে। সব মিলিয়ে সময়টা সুন্দর কেটেছিল। অনুষ্ঠান শেষে সবার সাথে আরো কিছু সময় কাটিয়ে, প্রিয়জন সাথে করে বাড়ি ফিরলাম গভীর রাতের তারার আলোয়।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৯:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




