somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সকালের নাস্তা যদি হয় পান্তাভাত আর কাঁচামরিচ তবে ব্লগারদের স্ট্যাটাস যেমন হতো

৩১ শে মার্চ, ২০১৯ রাত ৯:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



১) চাঁদগাজী: আজ সকালের নাস্তা পান্তাভাত আর কাঁচামরিচ দিয়েই সারলাম! কাঁচা মরিচের ঝালটা একটু বেশিই মনে হলো। আমাদের বৈষম্যের অর্থনীতির কবলে পড়ে আছি আমি। ক্ষমতাসীনরা কি চোখে কালো চশমা পড়ে আছে? দ্যাখেনা এইগুলা? আমার হাতে যদি ক্ষমতা থাকতো তাহলে "একজনে না খেতে পেরে ফেলে দিবে আরেকজনে না পেয়ে কাঁচামরিচের ঝালে মুখ পুড়বে" এমন নীতি অবশ্যই বাতিল করতাম। জানিনা কখনো সুযোগ হবে কি না!

২) নতুন নকিব: আলহামদুলিল্লাহ, পেট ভরে কাঁচামরিচ দিয়ে পান্তাভাত খেলাম। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় না করে পারছি না। কতজনে রাস্তা-ঘাটে না খেয়ে আছে, কিন্তু পান্তাভাত হলেও যে খেতে পেড়েছি আমি। সন্তানদের মুখে দু'মুঠো অন্ন তোলে দিতে পেড়েছি। এটাই যে পরম তৃপ্তি!

৩) রাজীব নুর: আজ শুক্রবার ছুটির দিন ছিলো বলে বেলা করেই ঘুম থেকে উঠেছি। সকালে ফ্রেশ হয়েই দেখি সুরভী পান্তা ভাতের থালা হাতে হাজির। সাথে একটা কাঁচামরিচও দেখছি লুকোচুরি খেলছে। সুরভীর হাতের একগ্লাস পানির স্বাদও আমার কাছে লাচ্ছির চেয়ে বেশি স্বাদের মনে হয়। সুরভীর মুখের দিকে তাকিয়ে সব পান্তাভাতই খেয়ে ফেললাম। ভাবছি ঝাল একটা কাঁচামরিচ ছিলো থালায়, কিন্তু ঝাল কেন লাগছে না? ওমা........ খাওয়া শেষ করে দেখি কাঁচামরিচ প্লেটের এক কোনে বসে খিল খিল করে হাসছে!

৪) আরোগ্য: হালাল রুজীর মধ্যে আলাদা একটা তৃপ্তি আছে। সকালের নাস্তা করতে গিয়েই টের পেলাম। পান্তাভাত আর কাঁচামরিচের যে স্বাদ আমি পেয়েছি ঘুষের টাকায় কেনা গোস্তের মধ্যে কি সেই স্বাদ পেতাম? মোটেই না। দেখা যেত গোস্ত খেয়ে কোন রোগ বাঁধিয়ে বসতাম। আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ, তিনি যেন হালাল উপায়ে জীবনধারন করার তাওফিক দেন!

৫) নাঈম জাহাঙ্গীর নয়ন: নিজের হাতে চাষ করা ক্ষেত থেকে সকালবেলা কাঁচামরিচ তুলে এনেছি। বাড়িতে এসে মাকে বললাম কি আছে দাও, বাজারে যাব। মা এক প্লেট পান্তা ভাত সামনে আনলাম। টাটকা কাঁচামরিচ দিয়ে তাই খেলাম। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, ফরমালিন দেয়া জিনিস থেকে বেঁচে আছি। কেন যে মানুষ খাদ্যের মধ্য বিষ দেয় আমার বুঝে আসেনা। অল্প লাভের জন্য বৃহৎ ক্ষতি কি করে করে ওরা?

৬) ভুয়া মফিজ: জীবনে হয়তো বড় কোন রেস্টুরেন্টে খেতে পারিনি তাতে আফসোস নেই। দু-চার টাকা এদিক-সেদিক করার ধান্ধা করিনি কখনো। অন্যায়ের কাছে মাথা নত করার শিক্ষা পাইনি জীবনে। আমাদের জীবনে হয়তো পান্তাভাত আর কাঁচামরিচের বেশি জোটেনা কিন্তু বুকে হাত রেখে বলতে পারি, আমাদের মনে এই কাঁচা মরিচের মতো তেজ আছে। আমাদেরকে হত্যা করা হলেও ঝালে জ্বলে মরতে হবে দূর্নীতিতিবাজদের।

৭) করুনাধারা: আজকে সকালবেলা নাস্তা করার মতো ঘরে তেমন কিছু ছিল না। অল্প একটু পান্তাভাত আর কাঁচা মরিচের উপর দিয়েই সকালের নাস্তা সারলাম। কি যে তৃপ্তি করে খেলাম! খেতে খেতে একটা গান খুব করে মনে পড়ছিলো আমার। কাজী নজরুল ইসলামের সেই গানটি...... " তৃষ্ণা পেলে দিও ঠান্ডা পানি, ক্ষুদা পেলে দিও লবনও ভাত, খোদা..... এই গরীবের শোন শোন মুনাজাত......."

৮) খায়রুল আহসান: জীবনে তৃপ্ত হতে বেশি কিছু লাগে না। অল্পে তুষ্টির মতো সুখ আর কিছুতে নেই। আজ সকালের নাস্তায় পান্তাভাত আর কাঁচা মরিচের বেশি জুটাতে পারিনি ঠিকই কিন্তু এতেই যে আমি সন্তুষ্ট! মনে মনে চিন্তা করলাম, একটা কাঁচামরিচ আমার প্লেটে উঠানোর জন্য একজন কৃষক কত খাটনিই না খেটেছেন! আর এই যে ধবধবে সাদা ভাত পানির নিচে পরম তৃপ্তিতে গোসল করছে ...... তা কি এমনিতেই এসেছে? মোটেই না। এর পেছনে শ্রম দিয়েছেন গাঁয়ের কৃষক। রোদে পুঁড়ে ফসলের ফরমান নিয়ে আসেন। আল্লাহ যেন সেই সমস্ত মানুষকে ভালো রাখেন সবসময়।

৯) পদাতিক চৌধুরী: কাঁচামরিচের সাথে পান্তাভাতের একটা সখ্যতা আছে যেন! দু'য়ে মিলে একটা মজাদার খাবার তৈরী হয়েছিলো আমার প্লেটে। ছোট বেলায় যখন পছন্দসই খাবার না হতো, বাবা-মার সাথে কত রাগ করতাম! আর এখন সংসার চালাতে গিয়ে টের পাচ্ছি। এই একমুঠো ভাত আমাদের মুখে তুলে দিতে বাবা-মা কতই না কষ্ট করেছেন। সৃষ্টিকর্তা যেন বাবাকে ওপারে শান্তিতেই রাখেন।

১০) নীল আকাশ: আজকে একটা মজাদার নাস্তার আয়োজন ছিলো আমাদের বাড়িতে। কাঁচামরিচের সাথে পান্তাভাতের মিশেলে দারুণ রেসেপি। এমন না যে আজকেই প্রথম খাচ্ছি। তবুও আজকে স্পেশাল কিছু মনে হচ্ছে। পহেলা বৈশাখের কথা মনে পড়ে গেল। কত মানুষ বছরে একবার বাঙালী সাজার অভিনয় করে পান্তা ভাত খায়। আর আমরা নিয়মিতই খাচ্ছি! তবুও নাকি যত দেশপ্রেম ঐ বড়লোকের অন্তরেই! আজব দেশ, আজব তার নিয়ম কানুন। কেউ বেঁচে থাকার জন্য পান্তাভাত খায় কেউ বাঙালী সাজার জন্য পান্তাভাত খায়!

১১) সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই: সকালবেলা পান্তাভাতের সাথে কাঁচামরিচের যে রসায়ন আমার প্লেটে জমে উঠেছিল তা কোনভাবেই অগ্রাহ্য করার মতো না। একথালা পান্তাভাতের এক কোনে একটি কাঁচামরিচ এমন ভাবে বসে ছিলো দেখে মনে হচ্ছিলো সে একা বলে অনেক লজ্জা পাচ্ছে। তার একাকীত্ব দূর করার জন্য শেষে পেঁয়াজকেও দাওয়াত করেছিলাম। পেঁয়াজ চক্ষুলজ্জা ভুলে গিয়ে কাপড় রেখেই পান্তা ভাতের জলে নেমেছিল........ তারপরের ঘটনা ইতিহাস!

১২) রাবেয়া রাহীম: সকালবেলা উঠতে দেরী হয়ে গেল। জলদি করে কাজে যেতে হবে। নাস্তা বানানোর সময় নেই। হাড়িতে কিছু ভাত ছিলো, তা দিই নাস্তাটা সেরে নিলাম। আর হ্যাঁ, সাথে একটা কাঁচামরিচও ছিলো। খেতে খেতে চিন্তা করলাম, এই নাস্তাই না প্রতিদিন কত আয়েশ করে খেয়েধেঁয়ে কাজে যায় খেটে খাওয়া মানুষ! কত সহজ তাদের জীবন!

১৩) জাহিদ অনিক:

" প্রিয়ার লাল টকটকে ঠোঁটের মতো
ভরা যৌবন নিয়ে একটা কাঁচামরিচ
বেহায়ার মতো আমার প্লেটে হাবুডুবু খাচ্ছিলো!
কি মধুর সে দৃশ্য.......
কত রুমান্টিক!!"

১৪) শায়মা: জীবনে কত চাইনিজ খেয়েছি, কিন্তি আজ সকালে যে খাবার খেলাম তার তুলনা হয়না! পান্তাভাতের ঠান্ডা জলের সাথে বগুড়ার কাঁচামরিচ! বগুড়ার দই যেমন মিষ্টি কাঁচামরিচ ঠিক তার বিপরিত আচরন করলো আমার সাথে। এটা কি প্রতারণা নয়! আমরা মেয়েরা কেন প্রতারণার শিকার হবো বারবার? তবুও মুখ বুজে তাই উপভোগ করার ভান করলাম। কি আর করার...... মেয়ে হয়ে জন্মেছি!

১৫) বিদ্রোহী ভৃগু:


"গরীব-দু:খী মানুষেরা
যাদের নুন আনতে ফুরিয়ে যায় পান্তার জল
যাদের ভাগ্যে একটু কাঁচামরিচও জুটে না
কেমন করে চলে তাদের সংসার?
চিন্তা করে দেখেছো কি, হে পথিক?
তাদের কষ্ট বুঝার সুযোগ আমারও যে হয়েছে!"

১৬) তারেক_মাহমুদ: বনানী কিংবা গুলশানে বড়লোকের সম্পত্তি পুড়ে ছাই হলো, তাতে তাদের সইবে! একজন ভিক্ষুক যখন রাস্তায় ভিক্ষা চাইতে আসে বড় তলার লোকেরা বলে, মাফ করো। কারো কারো তো গাড়ির জানালা পর্যন্ত খোলে না। তারা যে কাভাবে তিন বেলা নিজেদের পেট চালায় তা কি ভেবেছি আমরা কখনো? তাদের দু:খ বুঝার জন্য মাঝে মাঝে পান্তা ভাতও খেতে হয়।

১৭) মা.হাসান: জীবনটা কতই না বিচিত্র! কতজনে শখের বসে পান্তাভাত খায় কেউবা ঠেলায় পড়ে। কারো ভাগ্যে দু কলা জুটলেও কারো ভাগ্যে পান্তার পানি জোগাড় করা কেন এত কষ্টের? বিধাতা কেন এমন করে কষ্ট দেন মানুষকে? মানুষ হিসেবে আমরা কি পারিনা অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে?

১৮) ল:

" পান্তাভাতের পানি যদি জোটে সকালবেলা
তবুও তো মানুষ তারা করছো কেন হেলা?
আজকে যারা নিচু তলায় রেখো তাদের খোঁজ
পান্তা হলেও মুখে দিও, দিও একটু বুঝ!"

১৯) সোহানী:
জীবনের কঠিন মুহুর্তগুলো একাই পার করতে হয়। সঙ্গী-বন্ধু পাশে পাওয়া তখন কঠিন হয়ে পড়ে। আজকে হয়তো আমার স্বামী আমার মুখে পান্তাভাতের পানি ছাড়া বেশি কিছু দিতে পারছে না, তাই বলে কি আমি তাকে ছেড়ে যাবো? ভর্ৎসনা দেবো? কখনোই না। আমার মা আমাকে শিখিয়েছে, " স্বামীর অভাবের সময় চেনা যায় বউকে আর বউয়ের অসুখে চেনা যায় স্বামীকে।"

২০) কলাবাগান১: আজ সকালে পান্তাভাতের সাথে নতুন করে পরিচয় হলো। পান্তাভাত খাওয়ার সময় ভাবলাম গ্রামের কৃষকেরা সকালবেলা পান্তাভাত খেয়ে এই যে এতো পরিশ্রম করেন তবুও তারা কত সুস্থ! অবশেষে খুঁজে পেলাম পান্তাভাতের যাদুকরী সব গুণাগুণ।

গবেষণায় দেখা গেছে যে, আগের দিন রান্না করা রাতভর পানিতে ভিজিয়ে রাখা ভাতের মধ্যে রয়েছে ভিটামিন বি-৬ এবং ভিটামিন বি-১২। এ ভাতের মধ্যে রয়েছে অনেক উপকারি ব্যাকটেরিয়া যা খাদ্য হজম করতে সহায়তা করে এবং বহু রোগ প্রতিরোধ করে। এ ভাতে রয়েছে হাড় ও পেশি শক্তি বৃদ্ধির উপাদান এবং বার্ধক্য প্রতিরোধ ক্ষমতা।

আমেরিকান পুষ্টিবিদ পান্তা ভাতের আরো অনেক গুণাগুনের বিবরন দিয়েছেন যেমন: ১. পান্তা ভাত খেলে শরীর হালকা লাগে এবং কাজে বেশি শক্তি পাওয়া যায়। ২. মানব দেহের জন্য উপকারি বহু ব্যাকটেরিয়া পান্তা ভাতের মধ্যে বেড়ে উঠে। ৩. পেটের পীড়া ভাল হয় এবং শরীরে তাপের ভারসাম্য বজায় থাকে। ৪. কোষ্ঠবদ্ধতা দূর হয় এবং শরীরে সজিবতা বিরাজ করে। ৫. রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে। ৬. অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সবল হয় এবং মেজাজ ভাল থাকে। ৭. এলার্জি জনিত সমস্যা প্রশমিত হয় এবং ত্বক ভাল থাকে। ৮. সব রকম আলসার দূরীভূত হয়। ৯. শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ১০. মন মেজাজ ভাল থাকে।
এখনও যারা মাঠে কৃষি কাজ করেন, সকালে পান্তা ভাত খেয়ে মাঠে যান এবং ৮-১০ ঘন্টা কাজ করেন। তাদের রোগ বালাই কম হয়।

২১) মোঃ মাইদুল সরকার: হায়রে জীবন, কেউ খায় দুধকলা কেউ পান্তাভাত আর কাঁচা মরিচ!

২২) ব্লগার_প্রান্ত: বন্ধুদের সাথে যখন আড্ডা দেই তখন তারা বলে, কেউ খেয়েছে দুধভাত কেউবা পোলাও। আমি তো আজকে সকালে পান্তাভাত খেয়েছি। আমি কি বলবো তাহলে? লজ্জায় পড়ে যায় তখন। মুখ বাঁচাতে মিথ্যা বলা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না।

২৩) ওমেরা: জীবনের কোন ঘটনা আমি ছোট করে দেখিনা। হতেপারে সেটা পান্তাভাত আর কাঁচামরিচের গল্প। সব কিছুতেই আমি শিক্ষণীয় কিছু খুঁজে বেড়াই।

২৪) জুন: প্রবাস জীবনে স্বদেশের স্বাদ পেতে সেই ছোটবেলার পান্তাভাত খাওয়ার সময়টাতে আজ ফিরে গিয়েছিলাম। কতদিন পড়ে সেই অমৃত খেলাম!

২৫) ঢাবিয়ান: দেশের অর্থনৈনিক অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। কাগজে কলমে ঠিকই উন্নয় হ্চ্ছে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। মানুষের অন্ন-বস্ত্রের সুযোগের মতো মৌলিক অধিকার আজ প্রশ্নের সম্মুখীন! এই যে আমি আজকে সকালে পান্তাভাত আর কাঁচামরিচ খেলাম এই কষ্ট কি এমপি-মন্ত্রীরা বুঝবে? কখনোই না! তারা তো ঠিকই ফাইভ স্টার হোটেলে বসে পেট পূজো করছে!

২৬) আহমেদ জী এস: একথালা ভাত চোখের সামনে দেখে মুখের কাছে নিতে নিতে একখানা থিসিস লেখার মতো চিন্তা করে ফেলি। এই যে খাচ্ছি, তিনবেলা নিয়ম করে, যাই জুটুক! তবুও তো খাচ্ছি। আজ যারা না খেয়ে দুমুঠো অন্নের জন্য ডাকাতি করে তাদের কোন খবর কি আমরা নেই? সবাই স্বার্থপর!

২৭) নীলপরি: আমার মতো করে সবাই যেন তিনবেলা খেতে পারে, অল্প হলেও। কেউ যেন না খেয়ে না থাকে। পান্তাভাত হলেও। তাতেই যে তৃপ্তি।

২৮) মাহমুদুর রহমান: আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানানোর ভাষা নেই! এই যে পান্তাভাতের দুমুঠো খাবার পাচ্ছি তাই বা কম কি!

২৯) মাহমুদুর রহমান সুজন: একদিন আমিও বড় হবো। সবার মুখে অন্ন তুলে দেবো। এই কষ্ট আর সহ্য হয় না।

৩০) আকতার আর হোসাইন: মায়ের হাতে খাবার খাওয়ার মজাই আলাদা। আজ সকালে মা নিজ হাতে পরম যত্ন করে খাওয়ালেন। কতই না অমৃত সেই অন্ন।

৩১) সুমন কর: পান্তাভাতের পানির মতো জীবনটা ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। এর জন্যই কি জন্মেছিলাম?

৩২) সৈয়দ তাজুল ইসলাম: কাচামরিচের ঝালটা একটু কমই ছিলো। পান্তাভাতের পানিতে চুমুক দিতেই পাশে চেয়ে দেখি এক ভিক্ষুক খাবার চাচ্ছে দড়জায় দাঁড়িয়ে। পরক্ষনেই মনে হলো " নিজের খাবার বিলিয়ে দেবো অনাহারীর মুখে" লাইনটা। বাকি খাবারটুকু তুলে দিলাম তার মুখে। তার সে কি আনন্দ!

৩৩) সামু পাগলা০০৭: ধুর....... আর ভালো লাগে না.......... এতো কষ্ট করা যায়? রোজ রোজ পান্তাভাত আর খেতে ইচ্ছে করে না। পান্তাভাতের সাথে ইলিশ হলে কথা ছিলো। কাঁচামরিচ আর দুই চোক্ষের শত্রু!

৩৪) মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন: জীবনের অর্থ খুজে পেতে চান? গরীবের দু:খের ভাগ নিতে চান? খেয়ে দেখুন তো পান্তা ভাত আর কাঁচামরিচ। সেই সাথে টানা ৭ ঘন্টা খাটনি! বুঝে যাবেন কৃষকের ব্যাথা!

৩৫) কাওসার চৌধুরী: হঠাৎ করে ঠিক শখের বশেই আজকে পান্তাভাত খেলাম। মাকে বলেছিলাম একটা কাঁচামরিচ দিতে। সেকি মজা......... মনে হলো যেন অমৃত খাচ্ছি।

৩৬) আমি সাব্বির: কি আর বলবো বলুন....... পান্তাভাত খেলে কি মাথায় কিছু আসে?

৩৭) অপু দ্যা গ্রেট: আজকে সকালে পান্তাভাতের সাথে কাঁচামরিচের মিশেলে অপূর্ব নাস্তা। প্রতিদিন অফিসে যাবার পথে কত মানুষ দেখি রাস্তায় বসে আছে। কেউবা ফ্লাইওভারের নিচে। কতজনে তো খাবারই জুটাতে পারে না।

৩৮) স্বপ্নবাজ সৌরভ: আজ পান্তাভাত খেয়েছি তো কি হয়েছে, এমন একদিন আসবে আমিও হয়তো বড়লোকের মতো খেতে পারবো। দু'হাত ভরে বিলিয়ে দিতে পারবো।

৩৯) পবিত্র হোসাইন: মনের মধ্যে কোন অতৃপ্তি নেই। আল্লাহ যখন যা জুটায় তাতেই সন্তুষ্ট আমি। আলহামদুলিল্লাহ।

৪০) সম্রাট ইজ বেস্ট: পান্তাভাত থালায় তুলে দিতে দিতে বউটা হাতপাখার বাতাস করছিলো। আমিও আপন মনে গেয়ে উঠলাম, " তোমার হাত পাখার বাতাসে....... প্রাণ জুড়িয়ে আসে........."

৪১) নূর মোহাম্মদ নূরু: আজ সকালের নাস্তায় পান্তা ভাত আর কাঁচা মরিচের বেশি জোটেনি কপালে। কি হয়েছে তাতে? তবুও বেশ আছি। এই শুকরিয়া যে কারো কাছে হাত পাততে হয়নি। বড় বড় মনিষীরা অনেকেই তো খেতেই পেতো না তিন বেলা! আমাদের প্রিয় নবী বা তার পরিবারের কথায় ধরি। কত কষ্ট তারা করেছে? কাজী নজরুল ইসলাম কিংবা মাইকেল মধুসূদন দত্ত! কষ্ট ছিলো না কার জীবনে? দারিদ্রই তাদের মহান করেছে। কষ্টে না থাকলে তারা কি পারতো গরীব-দু:খীদের জন্য শব্দের স্রোত আনতে? তাইতো আনমনে গেয়ে উঠি বিদ্রোহীর কন্ঠে সুর মিলিয়ে.........

"হে দারিদ্র তুমি মোরে করেছ মহান
তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিস্ট্রের সম্মান
কন্টক-মুকুট শোভা।দিয়াছ তাপস,
অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস;
উদ্ধত উলঙ্গ দৃষ্টি; বাণী ক্ষুরধার
বীণা মোর শাপে তব হল তরবার।
দুঃসহ দাহনে তব, হে দর্পী তাপস
অম্লান স্বর্গেরে মোর করিলে বিরস
অকালে শুকালে মোর রূপরস প্রাণ।........"

৪২) রিম সাবরিনা জাহান সরকার: নিজের হাতে কামাই করে খাই। একমুঠো ভাতের জন্য যে কারো মুুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়না এটাই বা কম কিসে? আগেকার দিনে মায়েদের উপর কত নির্যাতন করা হত। ভাতের ভয় দেখিয়ে, ভাতের খোটা দিয়ে গালাগালি করা হত। মায়েদেরকে তখন বাহিরে কাজের জন্য যেতে দেয়া হতো না। কান্তু আজ, অন্তত আমরা মেয়েরা কারো দিকে তাকিয়ে থাকবো না। নিজের হাতের কামাই। পান্তা-মরিচই আমার কাছে পোলাও সম!

৪৩) কাজী ফাতেমা ছবি:

"সকাল বেলা সূর্য্যি মামা আসলো যখন ঘরে
পান্তাভাতের দাওয়াত শুনে খেতে আসলো তেড়ে।
একটা কামড় যখন দিলো ঝাল মরিচের গায়
ঝালেই নাকি ভীষণ কাবু, দৌঁড়িয়ে পালায়!"

৪৪)কাল্পনিক_ভালোবাসা: বছরে একদিন পান্তাভাত নিয়ে বাঙালি সাজার লোকের অভাব নেই। আবার সকালবেলা পান্তাভাত খাওয়া কোন মানুষের উপর নাক ছিটকানো লোকের অভাব হয় না। যে কোন খাবার যে কারোর ভালো লাগতেই পারে কিন্তু তাকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। আজ সকালে পান্তাভাত আর কাঁচামরিচের নাস্তা খেয়েই ভার্সিটিতে চলে গিয়েছিলাম। পান্তাভাত খেয়ে ভার্সিটিতে গিয়েছি শুনে অনেকেই হাসলো। এক মেয়ে তো নাক ছিটকে জিজ্ঞেসই করে বসলো, এ্যাই তুমি কি সত্যিই পান্তাভাত খেয়ে ক্লাসে এসেছো? মিষ্টি হেসে তাকে বললাম, আমার দাদা তার জীবদ্দশায় পান্তা খাওয়ার কোটা শেষ করতে পারেনি বলে আমরা এখনো মাঝে মাঝে পান্তা খাই। তোমারা ভাগ্যবান, পান্তা খাওয়ার কোটা তোমাদের দাদাই শেষ করে গেছেন। তোমাদের জন্য কিছু নেই!

কি অদ্ভুত মানুষের আচরন! যারা টিভি বা পত্রিকাতে বিজ্ঞাপন দিয়ে পান্তার আয়োজন করে বাঙালী সাজে তারাই পান্তা খাওয়ার কথা শুনলে না ছিটকায়! এই কি ওদের বাঙালিয়ানা?

৪৫) রাকু হাসান: আমার দু:খের দিন একদিন ঘুঁচবে। আজ হয়তো পান্তাভাতের পানি ছাড়া কপালে কিছু জুটেনি কিন্তু একদিন ঠিকই আমার সন্তানেরা সংসারের অভাব ঘুঁচাবে। সে আশায়ই তো সন্তানদের বড় আদর করে মানুষ করছি। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, "আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে!"

৪৬) হাসান কালবৈশাখি: দেশ তীব্র গতিতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। মানুষ আর ভাতের অভাবে ভিক্ষা করা পান্তা খায় না। ফাইভ স্টার হোটেলের রেস্টুরেন্টে বসে কাঁটা চামচ দিয়ে কাটারি ভোগ চালের পান্তা সুগন্ধি মরিচ সহ খায় আর আইফোন টেনে সেলফি তুলে ফাইভ জি স্পিডে শেয়ার করে। কে দিয়েছে এই পান্তা -আইফোন- ফাইভ জি.......! কে দিবে উত্তর?

৪৭) আখেনাটেন: পান্তাভাতের সাথে মরিচমাখা, আজকে যে একটা নাস্তা হয়ে গেল তা ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকবে।পান্তাভাত সম্পর্কে নতুন করে আর কি বলবো? আমি যে পান্তাভাত খাবার ওস্তাদ তা আপনার নিজের চোখেই দেখে নিন!

৪৮) সনেট কবি:

সকালের রবি যবে উঁকি দেয় ঘরে
খোদার রহম সব আমাদের তরে
উপছিয়ে পরে যেন ভাতের থালায়
কারণ থালাতে ছিলো পানতার জল!
ডাকলো আমাকে মোর সখি রাবেয়ায়
সাথে তার ছিলো কিছু মরিচের ফল
ভালোবাসা দেখে সেও লাজে মরে যায়
উপছিয়ে পরে প্রেম পানতা থালায়!

গরীবের ঘরে নেই দামী আসবাব
নেই সেথা গোশতের স্বাদের বাহার
তিনবেলা কারো ঘরে ফাঁকা থাকে হাড়ি!
কোনদিন জোটে যদি পানতার জল
সেখানেই যেন থাকে সুখের প্রভাব
আমাদের সংসার নমুনা তারই!

৪৯) আবু হেনা মো: আশরাফুল ইসলাম:

"মরিচ সের পাঁচ টেয়া ভাই
এক ছটাক লই কিনি
মরিচ পুড়ি পানি ভাত খাইতাম
তওফিকে কুলায় নি "

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানটি আজ খুব করে মনে পড়ছে। আমিও যে আজ একটি মহা ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইলাম! সকালের নাস্তায় পান্তা-মরিচ যে এতোটা রুচি সম্মত তা আগে জানা ছিলো না। পানি ভাত বা পান্তা ভাত বাঙালির একটি জনপ্রিয় খাবার,বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে রাতের জন্য রান্না করা ভাত বেঁচে গেলে সংরক্ষণের জন্য পানিতে ভিজিয়ে রাখা হতো। পরদিন এই পানিতে রাখা ভাতের নাম হতো পান্তা ভাত। সাধারণত লবণ, কাঁচা মরিচ ও পেঁয়াজ মিশিয়ে পান্তা ভাত খাওয়া হয়। অনেকেই আবার এর সাথে আলুভর্তা,বেগুন ভর্তা,ডাল ভর্তা, শুটকি ভর্তা,সরিষার তেল ইত্যাদি মেখে খেয়ে থাকে। এখানে বাঙালির চিরন্তন অপচয় বিরোধী মনোভাব লক্ষ্য করা যায়, তাছাড়া সমাজে নীচের সারিতে যাদের বসবাস তাদের সংসারে অভাব তো নিত্যসঙ্গী! তাদের অপচয় করার উপায় থাকে না। চর্যাপদেও প্রমাণ পাওয়া যায়,‘হাড়িত ভাত নাহি নিতি আবেশী’।

৫০) ড: এম এ আলী:

আমার আজকে এক অন্য রকম অনুভূতি হচ্ছে। নিজেকে ইতিহাসের অংশ হিসেবে মেলে ধরতে পেড়েছি মনে হয়। বাংলার গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস-এর সাথে আমার নামও একদিন জপবে! কারন আমিও আজ পান্তাভাত দিয়েই নাস্তা সারলাম! সে ইতিহাস না হয় পরেই শুনাই, এই যে পান্তাভাত খেলাম তার পুষ্টিগুণই বা কম কিসে? এই ভাত পুরোটাই শর্করা, তাই তাতে পানি দিয়ে রাখলে বিভিন্ন গাজনকারি ব্যাক্টেরিয়া বা ঈস্ট শর্করা ভেঙ্গে ইথানল ও ল্যাকটিক এসিড তৈরি করে। এই ইথানলই পান্তাভাতের ভিন্ন রকম স্বাদের জন্য দায়ী। পান্তা ভাত মূলত ভাত সংরক্ষণের একটি পদ্ধতি,ভাত পানি দিয়ে রাখলে গাজনকারি ব্যাক্টেরিয়া সেখানে ল্যাকটিক এসিড তৈরি করে যার ফলে পান্তা ভাতের অম্লত্ব বেড়ে যায়। তখন পচনকারি ও অনান্য ক্ষতিকারক ব্যাক্টেরিয়া,ছত্রাক ভাত নষ্ট করতে পারে না।

এই পান্তাভাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস এর নাম। ঘটনাটা এরকম-

সে ১৭৫৬ সালের কথা।

সিরাজউদ্দৌলা কলকাতা আক্রমণ করলেন। কলকাতা আক্রমণের আগে তিনি কাশিমবাজার দখল করে নিয়েছিলেন মাঝপথেই। বন্দী ইংরেজ সাহেবদের নিয়ে যাওয়া হল মুর্শিদাবাদ জেলখানায়। সেই সাহেবদের মধ্যে বাংলার গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসও ছিলেন। সেসময়ে কাশিমবাজারের ওলন্দাজ কুঠির দায়িত্বে ছিলেন ভিনেট। তিনি হেস্টিংসকে ছেড়ে দিতে নবাবের কাছে অনুরোধ করেন। কোম্পানির সামান্য একজন কর্মচারী বিধায় নবাব হেস্টিংসকে ছেড়ে দিলেন। হেস্টিংস তখন সোজা চলে এলেন কাশিমবাজারে। ওদিকে নবাব সিরাজের আক্রমণের ভয়ে কলকাতা কুঠির সবাই গা ঢাকা দিয়েছিল ফলতায়। হেস্টিংস কাশিমবাজারে থেকে নবাবী শাসনের গোপন খবর সংগ্রহ করে পাঠাতে লাগলেন ফলতায়। তার গোপনে খবর পাঠানোর সংবাদ জেনে সিরাজ সিদ্ধান্ত নিলেন হেস্টিংসকে আবার জেলে পুরবেন। এই খবর জানতে পেরে হেস্টিংস কাশিমবাজার ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নিলেন কিন্তু পালিয়ে কোথায় যাবেন ! ভাবতে ভাবতে তার মনেপড়ে গেল কান্তবাবুর নাম। তিনি পালিয়ে হাজির হলেন কান্তবাবুর কাছে।

কান্তবাবুর ভালো নাম কৃষ্ণকান্ত নন্দী। বাবা রাধাকৃষ্ণ নন্দী। তাদের আদি বাড়ি ছিল বর্ধমানের সিজনা গ্রামে, সেখান থেকে কান্তবাবুরা চলে এসেছিলেন কাশিমবাজারে। কেননা দেশজুড়ে তখন কাশিমবাজারের দারুণ নামডাক। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হলো কাশিমবাজার। কাশিমবাজারে কান্তবাবুর সুপারি ও রেশমের ব্যবসা ছিল। দোকানটা আবার ইংরেজদের কুঠি আর রেসিডেন্টের সঙ্গে একেবারে লাগোয়া। এরফলে অচিরেই ইংরেজদের সঙ্গে বেশ একটা মাখামাখি হয়ে গেল কান্তবাবুর। একারণে তিনি নাকি প্রায় দু’হাজারের মতো ইংরেজি শব্দ শিখে ফেলেছিলেন। তার ব্যবসাপত্রের জ্ঞান আর ইংরেজি জানার কারণে কোম্পানিতে মুহুরির চাকুরীটা জুটে গেল। সেটা ছিল ১৭৫৩ সালের কথা, একইসময়ে সামান্য একটা চাকরি নিয়ে তখন হেস্টিংস সাহেবও কাশিমবাজারে এসে হাজির। সেই থেকে কান্তবাবুর সঙ্গে হেস্টিংসের চেনাজানা। যাহোক, কান্তবাবু সেদিন হেস্টিংসকে দেখে তো হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি হেস্টিংসকে প্রথম কয়েকদিন লুকিয়ে রাখলেন তাদের মুদি দোকানে। তারপর গোপনে হেস্টিংসকে নিয়ে গিয়েছিলেন তার বাড়িতে। দোকানে হাতের কাছে তেমন কিছু না পেয়ে কান্তবাবু হেস্টিংসকে সেদিন আপ্যায়ন করেছিলেন পান্তাভাত আর চিংড়ি মাছ দিয়ে। ইতিমধ্যে হেস্টিংসের পালিয়ে যাবার খবরটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।

সেই থেকে মানুষের মুখে মুখে জন্ম নিল এ ছড়া-

হেস্টিংস সিরাজভয়ে হয়ে মহাভীত
কাশিমবাজারে গিয়া হন উপনীত।
কোন স্থানে গিয়া আজ লইব আশ্রয়
হেস্টিংসের মনে এই নিদারুণ ভয়।
কান্তমুদি ছিল তার পূর্ব পরিচিত
তাহারি দোকানে গিয়া হন উপনীত।
মুস্কিলে পড়িয়া কান্ত করে হায় হায়
হেস্টিংসে কি খেতে দিয়া প্রাণ রাখা যায়?
ঘরে ছিল পান্তাভাত আর চিংড়ি মাছ
কাঁচা লঙ্কা, বড়ি পোড়া, কাছে কলাগাছ।
সূর্যোদয় হল আজি পশ্চিম গগনে
হেস্টিংস ডিনার খান কান্তের ভবনে।

হেস্টিংস যেদিন সামান্য কর্মচারী থেকে গভর্নর জেনারেল হলেন, সেদিন তিনি কিন্তু ভোলেননি তার দুঃসময়ের উপকারী বন্ধু কান্তবাবুর কথা। তিনি কান্তবাবুকে তার অনুচর করে কাছে নিয়ে যান।

৫১) গড়ল: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পান্তা খেতে পছন্দ করতেন, বিশেষ করে তার নতুন বউঠান কাদম্বরী দেবীর হাতের পান্তাভাত ও সঙ্গে চিংড়ি মাছের চচ্চড়ি। এ জন্যই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার জীবনস্মৃতি গ্রন্থে লিখেছেন-‘ইসকুল থেকে ফিরে এলেই রবির জন্য থাকে নতুন বউঠানের আপন হাতের প্রসাদ। আর যেদিন চিংড়ি মাছের চচ্চড়ির সঙ্গে নতুন বউঠান নিজে মেখে দেয় পান্তাভাত, অল্প একটু লঙ্কার আভাস দিয়ে সেদিন আর কথা থাকে না।’ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কিংবা আমাদের পল্লীকবি জসীমউদ্দীনকে ছাত্রাবস্থায় পান্তা খেতে হয়েছে অভাব-অনটনের কারণে। কবি জসীমউদ্দীন ফরিদপুর থেকে পালিয়ে কলকাতায় যেয়ে উঠেছিলেন এক দূরসম্পর্কের বোনের ওখানে, কিন্তু বোনটি নিজেই এত অভাব-অনটনের মধ্যে ছিলেন যে, কবিকে তিনি দু’বেলা ভালো করে খাওয়াতে পর্যন্ত পারতেন না। তাই প্রায়ই কবির ভাগ্যে জুটত শুধু পান্তাভাত আর কাঁচা মরিচ।

যাহোক এতো গেল ইতিহাসের কথা, এবার বলি অন্য এক ইতিহাস। শুরুতে রমনার বট মূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের কোন সম্পর্ক ছিলনা। এমনকি ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের প্রাঙ্গণে ১৯৮৩ সালের দিকে পান্তা-ইলিশের সূচনা ঘটলেও এরসঙ্গে ছায়ানটের কোন সম্পর্ক নেই। সে সময়ে দৈনিক জনকন্ঠের সাংবাদিক বোরহান আহমেদ এর উদ্যোক্তা ছিলেন বলে জানা যায়। বোরহান আহমেদ রমনা বটমূলে পান্তা-ইলিশ চালুর প্রস্তাব দেন। এরপরে তার কয়েকজন সহযোগী মিলে ৫ টাকা করে চাদা তুলে পান্তা-ইলিশ আয়োজনের ব্যবস্থা করেন। তারা রাতে ভাত রেঁধে পান্তা তৈরি করে, কাঁচামরিচ-শুকনো মরিচ, পেঁয়াজ, ইলিশ ভাঁজা নিয়ে পরদিন ভোরে হাজির হলেন বটমূলের রমনা রেষ্টুরেন্টের সামনে। মুহুর্তের মধ্যে শেষ হলো পান্তা-ইলিশ। এভাবে নগর সভ্যতায় শুরু হলো পান্তা-ইলিশের যাত্রা।

গোলাম মুরশিদ-এর "হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি" বই পড়তে পড়তে মুখের জল আর বাঁধ মানছিলো না! পান্তাভাত খাওয়ার লোভ সামলাতে না পেরে গরমভাতেই পানি ঢেলে দিলাম! রান্নাঘর থেকে কাঁচামরিচ আর আস্ত এক পেঁয়াজ সমেত খাওয়া শুরু করলাম! কিন্তু মজা লাগছেনা কেন! পরে চিন্তা করলাম আমি তো লবনই নেইনি........!

৫২) লক্ষণ ভান্ডারী: আজ সকালে একটি মহাঅন্ন আহার করলাম! মহাঅন্ন বলছি এই জন্য যে তার সাথে মা দুর্গার নাম জড়িত! যে মহাঅন্নর কথা বলছিলাম তা হলো পান্তাভাত! হ্যাঁ, আপনারা ঠিকই শুনছেন। পান্তাভাত খেয়েই আজকের দিন শুরু করলাম। বরিশালে এ ভাতকে বলে ‘পসুতি’ ভাত। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলায় গরম ভাতে জল ঢেলে রাখলে তাকে বলা হয় ‘পোষ্টাই’ ভাত। এ ভাত খেলে নাকি পেট ঠাণ্ডা হয়। দুর্গাপূজার দশমীর দিন সকালে দেবী দুর্গাকে পান্তাভাত আর কচুর শাক নিবেদন করে বাঙালি হিন্দুরা তাদের প্রিয় দেবীকে বিদায় জানায়। গ্রামের পাঠশালায় গমনকারী ছাত্র বা কৃষিজীবী মানুষের পান্তা খেয়ে কাজ শুরু করার প্রথা কিছুদিন আগে পর্যন্ত ছিল, একটি শিশু ছড়া আছে এমন-

"পান্তা খেয়ে শান্ত হয়ে কাপড় দিয়ে গায়
গরু চড়াতে পাঁচন হাতে রাখাল ছেলে যায়।"

৫৩) নজসু: বউটা বাড়িতে আনার পর থেকে কেঁদেই চলছে......। কিছুতেই থামছে না। ছোট একটা মেয়েকে বিয়ে করে পরেছি বিপদে। এখন বায়না ধরেছে বাপের বাড়ি রেখে আসতে হবে। রাতেও ভাত খায়নি রাগ করে। ওকে তো আমি বিয়ের সময় জিজ্ঞেস করেছিলাম আমাকে পছন্দ করে কিনা। ও তো আমাকে হ্যাঁ বলেছিলো। এখন আবার কান্না করার কি এমন ঘটলো? বউটা খায়নি বলে আমিও ভাত না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ি। সকাল বেলাও দেখি বউয়ের মন খারাপ! ভাত রাঁধবে না। বললাম ভাতগুলো নষ্ট হয়ে গেছে, ফেলে দাও। সে ফেলেও দিলো না। মাটির হড়িতে পান্তা ভাত আর কাঁচামরিচ দেখে আমি অবাক! একি! আমার বাপের জন্মেও আমি কোনদিন পান্তা ভাত খায়নি। আমি খেতে পারবো না.......। আমার কথায় বউ কিছুটা শাষনের স্বরেই বললো, খান বলছি..... আমি এতগুলো ভাত ফেলে দিতে পারবো না। আমার পরিবার অপচয় করা শিখায় নি। বউয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তাই বাধ্য ছেলের মতো পান্তা ভাত মুখে তুলে দিলাম। সত্যি বলছি.... এমন স্বাদের নাস্তা আমি কোনদিন খাইনি। বউয়ের কল্যানেই এমন নাস্তার ব্যবস্থা হলো। আমার বউটা সত্যিই অনেক লক্ষ্মী... আমাদের বন্ধন যেন থাকে আজীবন।

৫৪) ঠাকুর মাহমুদ: মসজিদের মোল্লারাও আজকাল পান্তাভাত খায় না। আমার কপালে জুটে পান্তাভাত। অনার্স পাশ করে ঘরে বসে আছি। বাবার ঘাড়ে বসে বসে খাচ্ছি। কিছু বলতেও পারছি না। এর চেয়ে একটা কারিগরি শিক্ষা নিলেও হাতের কাজ করে খেতে পারতাম। আমার এই সার্টিফিকেটই যেন এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। না পারছি দিন মজুর খাটতে, না পারছি পান্তাভাত খেতে। আজ আমার এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? পরিক্ষাতো কম দিলাম না! তবুও চাকরি মিলে না। কোটার কাছে আজ মেধা অসহায়। কে নেবে এই সার্টিফিকেটের দায়িত্ব। এগুলো আজ আমার কাছে বোঝা.........

৫৫) স্রাঞ্জি সে: মাঠ ভর্তি ফসলের ক্ষেতে কাকতাড়ুয়া হলেও মনে হয় ভালো হতো! খেতে হতো না। নিত্যদিন এইসব পান্তা খেতে খেতে মুখের স্বাদই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতগুলো ভাই-বোনের সংসারে বাবা কি করেই বা অন্ন তুলে দিবে? তবুওতো আমাদেরকে উপোস রাখছেন না বাবা-মা। কি করে যে দিন চলবে, চিন্তায়ই আসে না।

সহজ স্বীকারোক্তি: সম্পূর্ণ পোস্টটি নিছক আনন্দের ছলে লেখা। কেউ সিরিয়াসলি নিবেন না। কারো নাম বাদ পরে থাকলে আপনার অনুভূতিও শেয়ার করতে পারেন। যাদেরটা লেখা হয়েছে পছন্দ না হলে আপনার নিজস্ব মতও মন্তব্যে জানাতে পারেন। ছবি নেয়া হয়েছে গুগল থেকে।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুন, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:২৪
৫০টি মন্তব্য ৪৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মালয়েশিয়াতে ডাঃ জাকির নায়েকের দিন কি শেষ হয়ে আসছে?

লিখেছেন মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন, ১৯ শে আগস্ট, ২০১৯ সকাল ৮:৩৪


প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং চায়নিজ ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ানরা তাঁর বক্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

নিজ দেশ ভারত থেকে পালিয়ে মালয়েশিয়া এসে বেশ ভালই ছিলেন ভারতীয় ধর্ম প্রচারক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের শিশু আগামী দিনের ধর্ষক, দূর্নীতিবাজ, চোর-ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ, দালাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৯ শে আগস্ট, ২০১৯ দুপুর ১:৪৮



একজন শিশু জন্ম দেয়া কি খুব বেশি প্রয়োজন এই সমাজে?
প্রতিটা সংসারেই একটি ছেলে-মেয়ের বিয়ের পর আত্মীয় স্বজন সবাই বাচ্চার জন্য তাড়া দেয় কেন? বাচ্চা না নিলে সমস্যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ব্লগারদের নামটি উল্টো করে পড়ুন আর হাসুন-রম্য-রঙ্গ-১৪

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ১৯ শে আগস্ট, ২০১৯ বিকাল ৩:৩৯




নজু

ময়াসি দমেহআ রজীনতা

বিছ মাতেফা জীকা

লইমাছই

লড়গ

বীথিপূনহী খঃদু

শবেগ্নিঅ

সাবালোভা-কনিল্পকা

দমুহমারকুঠা

নামাসীষ্টিদৃ

৭৪কেএ

জীগাদচাঁ

মহিফা করেতা

রকারস লদুইমা মোঃ

কন্তুগআ রতেরাধ্যম

নখা নসাহা বরাহমে

দজ্জাাসাা

ছবি-নিজের করা ডিজাইন। ...বাকিটুকু পড়ুন

ডেংগু ধরা পড়লে, রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর দায়িত্ব কার?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৯ শে আগস্ট, ২০১৯ বিকাল ৪:৩০



Tragic death of a child without any treatment

তানহা নামের ৭ বছরের একটি মেয়ে ঢাকায় নানীর সাথে থেকে পড়ালেখা করতো, ডেংগুতে গত শনিবার (আগষ্ট, ১৭) তানহা মৃত্যুবরণ করেছে; সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নীল আকাশের প্রান্ত ছুঁয়ে-২ (আকাশ ভালোবেসে লেখা)

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০১৯ বিকাল ৪:৫০



=চাঁদালোর ঘোর=
তাকিয়ো না আসমানে আজ, পুড়ে যাবে চোখ
মায়াবী আলোয় ইচ্ছে কেবল পথে পথে হাঁটি
ইট সুড়কির পথ, চলতেই যেনো বুক ধুকপুক,
এখানে নেই শিশির ভেজা দূর্বাঘাসের মাটি।
যদি সঙ্গে থাকো তুমি,ভয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×