somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

“স্যাক্রিফাইস”

১২ ই ডিসেম্বর, ২০১৬ রাত ২:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রাত্রি সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে গেলো, আজ তার ভার্সিটি লাইফের দ্বিতীয় বর্ষ শুরু হতে যাচ্ছে ৷ তাই, দ্রুত তৈরী হয়ে বাস ধরতে চলে গেলো ৷ ১০ মিনিট অপেক্ষার পর বাস আসলো ৷ কলেজে এসেই তাদের ৬ জনের প্রাণপ্রিয় গ্রুপ "ক্যানভাস" এ আড্ডায় বসে গেল ৷ তাদের ৬ জনের গ্রুপে আবির, ঈশিতা, নীরা, হাবীব, ইফতি আর রাত্রি নিজে ৷ এদের ৫ জনের মাঝে ইফতিকে রাত্রির মোটেও পছন্দ না ৷ তবে ঈশিতা আর নীরার সাথে ইফতির আগে থেকে পরিচয় থাকায় বাধ্য হয়ে তাকেও গ্রুপে রাখা ৷ তারা ৬ জনই ইংলিশ এ অনার্স করায় সবসময় একসাথেই থাকে ৷
-
তো যথারিতি ক্লাশের সময় হওয়ায় সবাই ক্লাশে গেলো, আর প্রতিদিনের মত আজও রাত্রির বিরক্ত লাগতে লাগলো ৷ ক্লাশের প্রতি না, ইফতির প্রতি ৷ আজকেও তার দিকে তাকিয়ে আছে, সে তাকানো মাত্রই চোখ সরিয়ে নিচ্ছে ৷ গত এক বছর ধরেই এই জ্বালাতন সহ্য করে আসছে ৷
-
এর মাঝে নীরাকে দিয়ে ইফতি তার মনের কথাও রাত্রির কাছে জানিয়েছিল কিন্তু রাত্রি সব শুনার পর ইফতিকে অনেক কথা শুনায় ৷ এরপর আর ইফতি কখনও রাত্রিকে মনের কথা বলার সাহস পায় নি ৷ ইফতি অনেক সুন্দর করে ভায়োলিন বাঁজাতে পারতো, যা সকলের মন ছুঁয়ে যেতো কিন্তু রাত্রির মনকে কখনই ছুঁতে পারে নি ৷
-
দেখতে দেখতে সময় চলে যেতে থাকে ৷ আর তারাও ৪র্থ বর্ষে চলে যায় ৷ আর তখনই রাত্রির জীবনে আগমন ঘটে শিহাবের ৷ শিহাব মেডিকেলে পড়ে, আর এক দূর্ঘটনায় তাদের পরিচয় ৷ রাত্রির বাবার জন্য ব্লাড দরকার কিন্তু কোনোভাবেই ব্লাড যোগার করা যাচ্ছে না, শেষ পর্যন্ত শিহাবই ব্লাড দেয় ৷ এরপর থাকেই তাদের ধীরে ধীরে কাছে আশা শুরু হয় ৷
-
কোনো এক জ্ঞানী বলে গিয়েছেন, একটি ছেলে এবং মেয়ে কখনই বন্ধু হয়ে থাকতে পারে না, কেউ না কেউ একে-অপরের প্রেমে পড়বে ৷ তাদের বেলায়ও ব্যতিক্রম হয় নি ৷ তারাও পরস্পরের প্রেমে পড়ে ৷ যদিও রাত্রি প্রথমে রাজি ছিল না কিন্তু শিহাব তাকে ভালবাসার মায়ায় ফেলেই দেয় ৷
-
এরপর, একদিন, রাত্রি শিহাবকে সাথে নিয়ে তাদের ভার্সিটিতে যায় ৷ শিহাব আর রাত্রি পরস্পরের হাত ধরেই এগিয়ে যায় এবং তাদের গ্রুপের কাছে যায় ৷
ইফতি অবাক হয়ে তাদের দেখতে থাকে ৷ শিহাবের সাথে সকলের পরিচয় করিয়ে দেয় ৷ আর তাদের সম্পর্কের কথাও জানায় ৷
-
ইফতি প্রচন্ড কষ্ট পায়, আর সকলের নজর এড়িয়ে চোখের জলকে আড়াল করে যদিও তা রাত্রির চোখ এড়াতে পারেনা ৷ কিন্তু রাত্রির এতে কোনো ফিলিংস নেই ৷ সে বরং মনে মনে খুশিই ৷
-
ঐ দিনের পর থেকেই ইফতি "ক্যানভাস" থেকে দূরে যেতে শুরু করে ৷ নানা অযুহাত দেখিয়ে আড্ডা থেকে চলে যায়, ক্লাশেও আসে না খুব বেশি ৷ ইফতির না থাকায় গ্রুপের মেম্বার কমেনি বরং শিহাব চলে এসেছে ৷
-
এরপর একদিন, রাত্রি-শিহাবের সাথে ফোনে কথা বলা অবস্থায় রোড ক্রশ করতে গিয়ে বাইকের সাথে ধাক্কা খায় ৷ এতে মারাত্মক আঘাত লাগে তার ৷ দ্রুত রক্তের প্রয়োজন পড়ে ৷ আর ঐদিন ইফতি তাকে রক্ত দেয় ৷ কিন্তু ভাগ্য ভাল না হলে যা হয়, সেদিনই শিহাবের হাত কেটে যায় আর হাতে বেন্ডিজ করা লাগে ৷ ইফতি ব্লাড দিয়ে অনেকটা সময় অপেক্ষা করে রাত্রির জ্ঞান ফিরার, জ্ঞান ফিরার কথা শুনে ইফতি ছুটে যায় তাকে দেখার জন্য ৷ কিন্তু তার যাওয়ার আগেই শিহাব সেখানে পৌঁছে যায়, আর শিহাবের হাতে বেন্ডিজ দেখে রাত্রি ভাবে শিহাবই তাকে রক্ত দিয়েছে ৷ আর রাত্রি শিহাবের হাত ধরে বলে, আমি সত্যিই ভাগ্যবান ৷ তুমি আমার প্রাণ বাঁচালেন রক্ত দিয়ে, আর শিহাবও স্বার্থপরের মত হ্যা বলে ৷
-
এগুলো শুনে ইফতি সেখানে আর থাকে না ৷ চলে যায়, চিরদিনের জন্যই ৷ গত ২ সপ্তাহ ধরে কোনো খোঁজ নেই ইফতির ৷ আবির, ঈশিতা, নীরা, হাবিব সবাই ইফতিকে অনেক খোঁজার চেষ্টা করেও পায় না ৷ এদিকে সবার মনমরা দেখে রাত্রি বলে ফেলে, যে চলে গেছে তার জন্য টেনশন করিস কেনো ? আর রাত্রির এই কথা শুনার পর নীরা-রাত্রিকে অনেক কথা শুনিয়ে দেয় ৷ আর ব্লাড দেওয়ার ঘটনা সাথে শিহাবের মিথ্যা বলাটাও ৷ রাত্রির কিছুটা খারাপও লাগে, আর মিথ্যা বলা নিয়ে শিহাবের সাথে কিছুটা ঝগড়া হলেও তা ঠিক হয়ে যায় ৷
-
এরপর, অনেক সময় পার হয়ে যায় ৷ সব বদলেও যায়, শিহাবের সাথে রাত্রির বিয়েও হয়ে যায় ৷ তাদের একটা মেয়েও হয়েছে ৷ বিয়ের পর চার বছর পার হয়ে যায় ৷ আজও তারা ৫ বন্ধুর যোগাযোগ আছে ৷ সবারই বিয়ে হয়ে গিয়েছে ৷
তো ১৪ ফেব্রুয়ারি তারা সবাই ঠিক করে দেখা করবে ৷ তাই, সবাই যার যার স্বামী-স্ত্রী কে নিয়ে ঐ দিন দেখা করার প্লেন করে ৷ তো ঐ দিন শিহাবের একটু কাজ থাকায়, রাত্রি একাই সেখানে যায়, আর শিহাব জানায় সে তাদের সাথে সোজা যোগ দিবে ৷ কিন্তু শিহাব আসার পথে কার এক্সিডেন্ট করে ৷ আর এতে তার দুচোখ নষ্ট হয়ে যায় ৷
-
ডক্টররা অনেক চেষ্টা করেও কোনো পত বের করতে পারে নি ৷ নতুন চোখ লাগবে কিন্তু দান করবে তা চোখ ! অবশেষে ২৬ শে ফেব্রুয়ারি কেউ একজন তার দুটি চোখ দান করে যায় ৷ তবে একটা শর্ত দিয়েছিল ডক্টরদের যাতে এটা কেউ জানতে না পারে চোখদুটো কে ডোন্ট করেছে ৷ ঐ দিনই শিহাবের অপারেশন হয় ৷ আর তার ঠিক ১৪ দিন পর শিহাবের চোখের ব্যান্ডিজ খোলা হয় ৷ শিহাব সব কিছু স্পস্ট দেখতে পারে তবে রাত্রির কেমন যেন লাগে, শিহাবের নতুন চোখদুটো দেখে কার কথা যেনো মনে পড়ে তবে ঠিকভাবে মনে করতে পারে না ৷ এইভাবে, কেটে যায় আরও তিনমাস ৷ এক বিকেলে রাত্রি তার মেয়েকে নিয়ে পার্কে যায় ঘুরতে ৷ আর সেখানে বেজে উঠে সেই যন্ত্রনাদায়ক বেহালার সুর ৷
-
মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আওয়াজটার পিছু করে চলে যায় সেখানে ৷ যা ভেবেছিল তাই এতো ইফতি ৷ এত বছর পর কোথাথেকে ? রাত্রি ইফতির পাশে গিয়ে মেয়েকে নিয়ে বসে, ইফতি হটাৎ করে বাজানো বন্ধ করে দেয় ৷ কালো চশমা পড়া চোখে কোনোদিকে না তাকিয়েই জিঞ্জেস করে কেমন আছ রাত্রি ? বলে আবার বাজানো শুরু করে ৷ রাত্রি অবাক হয়ে যায় ৷ কৌতুহল বশত প্রশ্ন করে কিভাবে বুঝলে এটা আমি ?
-নাহ, বললে রাগ করবে ৷
-নাহনা করবো না ৷
-সেই পারফিউমের ঘ্রাণ ৷
- ওহ, আজও মনে আছে ৷ তো এতদিন কোথায় ছিলে ? আর চোখে কি হয়েছে ?
- ছিলাম কোথাও একটা, আর চোখ নেই ৷
- মানে ? কিভাবে এমন হল ?
- এই বছর ২৬ শে ফেব্রুয়ারিতে এক দূর্ঘটনায় চোখ দুটি হারিয়ে ফেলি ৷ তা তোমার মেয়ে সাথে এসেছে বুঝি ? তোমার বর কেমন আছে ?
- কিভাবে বুঝলে আমার মেয়ে ? সে ভাল আছে ৷
- থাক বাদ দাও, উঠি আজকে ৷ আমাকে নেয়ার জন্য গাড়ি চলে এসেছে ৷
- ইফতি চলে যাওয়ার পরও রাত্রি ইফতি হেঁটে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইল ৷ তারপর উঠে চলে গেল ৷
-
-
-
এরপর কেটে গেল অনেকটা সময়, দেখতে দেখতে একবছর পূর্ণ হয়ে গেল শিহাবের চোখ ফিরে পাওয়ার ৷ ঐ দিন সকালে রাত্রি-শিহাবের সাথে ব্যালকনিতে বসে কফি খাচ্ছিল ৷ কথায় কথায় শিহাব আফসোস করে বলল, ইস ! আজও ঐ মানুষটার দেখা পেলাম না যে আমায় চোখদুটো দিয়ে গেল ৷ ২৬ শে ফেব্রুয়ারি আমার জীবনে স্বরণীয় হয়ে থাকবে ৷ রাত্রির মনটা নাড়া দিয়ে উঠলো ৷ মনে পড়ে গেল ইফতি চোখ নষ্ট হওয়ার তারিখটি ৷ আর কিছু বুঝতে বাকী রইলো না যে, এতদিন কেনো চোখদুটোতে তাকালেই কারো কথা মনে পড়ত ৷ মনের অজান্তেই চোখ থেকে টপাটপ কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পরে গেল ৷ আর মনে মনে বলল, তুই সত্যিই আমায়.........
-
-
রাত্রি আর কিছু ভাবতে পারে না, ওয়াশরুমে গিয়ে কাঁদতে শুরু করে ৷ আর কানে বেজে উঠে ইফতি সেই কথাটা "যেতে দেব না তোকে বৃত্তের বাহিরে ৷ "
-
-
১৭ ফেব্রুয়ারি ইফতি শুনতে পায়েছিল যে শিহাবের চোখ দুটি নষ্ট হয়ে গিয়েছে ৷ তাই, সে দেশের বাহির থেকে চলে আসে আর ২৬ শে ফেব্রুয়ারি তার চোখ দুটি শিহাবকে দিয়ে যায় ৷
(সমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ডিসেম্বর, ২০১৬ রাত ২:১৩
৫টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

যাদের স্বপ্নের দেশ আমেরিকা: তাদের জন্যে আজকের পোস্ট

লিখেছেন অপলক , ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:১৮



এমন এক সময় ছিল, ছেলে বা মেয়ে ডিভি লটারীতে স্বপ্নের দেশে গেছে, বাপ মায়ের পাড়া প্রতিবেশী গর্বে কথা বলাই মুশকিল। সেখানে গিয়ে OC(Office Cleaner) নাকি DC(Dish Cleaner) হবে তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

”আমার রাজনীতির রূপরেখা” -- জিয়াউর রহমান

লিখেছেন প্রামানিক, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
আমি তখন দৈনিক দেশ পত্রিকায় চাকরি করি। এটা আমার দ্বিতীয় চাকরি। প্রথম চাকরি নিয়েছিলাম ব্রিটিশ আমলের প্রকাশিত দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। আজাদ পত্রিকাটি ব্রিটিশ আমলে মুসলমানের পক্ষের একমাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

শহীদ জিয়া ২৭ মার্চের ভাষণে 'জয় বাংলা' বলেছিলেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১১





সূত্রঃ আমার রাজনীতির রূপরেখা
লেখকঃ জিয়াউর রহমান
পৃষ্ঠাঃ ১৭৭

...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

মেধা নয়, রাজনৈতিক পরিচয়ই কি আমাদের রাষ্ট্রে যোগ্যতার মাপকাঠি?

লিখেছেন raselabe, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৬:২৯

বিসিএসসহ বিভিন্ন সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিচয় বা ভেরিফিকেশনের কারণে প্রার্থীদের বাদ পড়ার অভিযোগ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে নতুন কোনো ঘটনা নয়। রাজনৈতিক দলগুলো ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে নিজেদের ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রম চালু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×