বাংলাদেশের গ্রামবাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে “সালিশী” শব্দটি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। গ্রাম, গঞ্জ, শহর, বন্দর সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরেই কোনো না কোনোভাবে সালিশী প্রথা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পারিবারিক বিরোধ, জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব, দাম্পত্য সমস্যা, আর্থিক লেনদেন, সামাজিক সংঘাত কিংবা ছোটখাটো অপরাধ এসব ক্ষেত্রে আদালতের বাইরে দ্রুত সমাধানের একটি সামাজিক পদ্ধতি হিসেবেই সালিশীর জন্ম ও বিকাশ।
একসময় সালিশী ছিল সমাজের প্রবীণ, অভিজ্ঞ ও সম্মানিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরিচালিত একটি নৈতিক ও সামাজিক বিচারব্যবস্থা। তখন মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নৈতিকতার গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সালিশী সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। আদালতের দীর্ঘসূত্রতা, খরচ ও জটিলতার বাইরে সাধারণ মানুষ দ্রুত সমাধান পাওয়ার আশায় সালিশীর দ্বারস্থ হতো।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই সালিশী প্রথার চরিত্রও অনেক ক্ষেত্রে বদলে গেছে। বর্তমানে বহু জায়গায় সালিশী আর নিরপেক্ষ সামাজিক বিচার নয়; বরং এটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা সামাজিক আধিপত্যের একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী গরিব মানুষ, নারী, শ্রমজীবী, সংখ্যালঘু, ভূমিহীন কিংবা সামাজিকভাবে দুর্বল মানুষ অনেক সময় সালিশীতে প্রকৃত ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।
বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ সালিশীতে ক্ষমতাবানদের মতামতই শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পায়। যাদের অর্থ আছে, সামাজিক পরিচিতি আছে, কিংবা রাজনৈতিক শক্তি আছে, তাদের বক্তব্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে দরিদ্র বা দুর্বল মানুষের কণ্ঠ অনেক সময় চাপা পড়ে যায়। অনেক নারী সালিশীর নামে অপমান, সামাজিক হেয়প্রতিপন্নতা কিংবা অন্যায্য সিদ্ধান্তের শিকার হন। আবার অনেক ক্ষেত্রে আইন ও মানবাধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সিদ্ধান্তও চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা সমাজে নতুন অন্যায়ের জন্ম দেয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক মানুষ সালিশীর রায় মেনে নিতে বাধ্য হন শুধুমাত্র সামাজিক চাপ, ভয় কিংবা একঘরে হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায়। ফলে ন্যায়বিচারের পরিবর্তে “সমঝোতা” নামের এক ধরনের নীরব বঞ্চনা তৈরি হয়। এই বঞ্চনা বছরের পর বছর ধরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আত্মবিশ্বাস, অধিকার ও সামাজিক মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সালিশী প্রথা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। বরং প্রয়োজন হলো এর সংস্কার, স্বচ্ছতা ও মানবিকীকরণ। সালিশী যদি সত্যিকার অর্থে ন্যায়, মানবাধিকার, আইনের প্রতি সম্মান এবং নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে এটি এখনও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য সালিশীতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, মানবাধিকারভিত্তিক প্রশিক্ষণ, আইন সম্পর্কে সচেতনতা এবং প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার প্রয়োজন, কিন্তু সেই বিচার যদি দুর্বল মানুষের জন্য নিরাপদ না হয়, তাহলে সেটি কখনও প্রকৃত ন্যায়বিচার হতে পারে না। সালিশী তখনই অর্থবহ হবে, যখন সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিও সেখানে নিজের কথা বলার সাহস ও ন্যায্য অধিকার পাবে
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে মে, ২০২৬ সকাল ৯:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



