somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

হিমন
পৃথিবীকে যেমন দেখার প্রত্যাশা করি, সে প্রত্যাশার আগে নিজেকে তেমন গড়তে চাই। বিশ্বাস ও কর্মে মিল স্থাপন করতে আজীবন যুদ্ধ করতে চাই নিজের সাথেই।

যে কারণে আওয়ামীলীগ ক্ষমতা ছাড়বে না

২৫ শে আগস্ট, ২০২৩ রাত ৩:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

৩ হাজার ৮'শ বছর আগে খৃষ্টপূর্ব ১৭৬৩ সালে ব্যবিলন শহর, আজকের বাগদাদ শাসন করতেন হামুরাবি। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যে তিনি ২৮২টি আইন করেন। তাঁর আমলে মানুষ ছিল তিন প্রকার, অভিজাত, সাধারণ ও দাস। হামুরাবির কিছু আইন এমন-

-যদি কোন অভিজাত আরেক অভিজাতকে আঘাত করে অন্ধ করে দেয়, শাস্তিস্বরূপ তাকেও অন্ধ করে দিতে হবে
-যদি কোন অভিজাত আরেক সাধারণ মানুষকে আঘাত করে অন্ধ করে দেয়, শাস্তিস্বরূপ তাকে ৬০টি রুপার মুদ্রা দিলেই হবে
-কোন অভিজাত যদি আরেক অভিজাত নারীকে আঘাত করে তাঁর গর্ভস্থ ভ্রূণ নষ্ট করে দেয় তাহলে ১০টি রুপার মুদ্রা দিতে হবে, কিন্তু ওই নারীর মৃত্যু হলে আঘাতকারীর কন্যা সন্তানকে হত্যা করতে হবে, পুত্রসন্তানকে হত্যা করা যাবে না
-কোন অভিজাত যদি আরেক অভিজাত মানুষের দাসীকে আঘাত করে তাঁর গর্ভস্থ ভ্রূণ নষ্ট করে দেয় তাহলে ২টি রুপার মুদ্রা দিলেই হবে।
এরকম প্রায় ২৮২টি আইন করে হামুরাবি লেখেন, “এগুলুই হল সত্য ও সঠিক পথে চলার জন্য প্রতিষ্ঠিত ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত”। সেকালে সৃষ্টিকর্তা ছিলেন তিনজন- আনু, এনলিল ও মারডুক। তাঁদের নাম নিয়ে হামুরাবি আরো লেখেন, আমি সাধারণ মানুষের প্রতি উদাসীন নই, যাঁদের দায়িত্ব দেবতারা আমাকে দিয়েছেন।

আমরা যারা এই যুগে সাম্য সুবিচার আর ন্যায়ের কথা হরদম উচ্চারিত দেখি তাঁদের নিশ্চয়ই হামুরাবির এই অসম আইন দেখে বমনেচ্ছা হচ্ছে। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই সেদিন, আজকের বেগম জিয়ার স্বামী সেনাশাসক জিয়া, হঠাৎ একদিন ক্ষমতা দখল করে সংসদে আইন করে দিলেন যে, একাত্তুরের গণহত্যা, ১৫ই আগস্ট বঙ্গবধু হত্যা আর ৩রা নভেম্বরে যে জেলহত্যা সংগঠিত হয়েছে তাঁর কোন বিচার এই বাংলাদেশে হওয়া যাবে না। আজ থেকে এটা একটা আইন। যারা ইসলামি ভাবধারা থেকে বিএনপির প্রতি প্রেমবোধ করেন, তাঁদের কাছে আমার প্রশ্ন, জিয়ার এই আইন প্রায় চার হাজার বছর আগের হামুরাবির আইনের থেকে কতখানি ন্যায়ানুগ?

জিয়া কি এটুকু করেই থেমেছিল? আত্মস্বীকৃত সব খুনীকে নিরাপদে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দূতাবাসে চাকরি দিয়ে রুটিরুজির ব্যবস্থা করেছিল। তারই ধারাবাহিকতায়, বেগম জিয়ার বয়স যেদিন ৫০ হল, সেই ১৯৯৬ সালে, হঠাৎ তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আজ হতে আর ৫ই সেপ্টেম্বর নয়, তিনি জন্মদিন পালন করবেন ১৫ই আগস্ট। গেল কয়েক বছর হল থেমেছেন যদিও, কিন্তু প্রায় বিশবছর ধরে কী কুৎসিত কী কদাকার আনন্দে মেতে উঠতেন বাঙ্গালি মুসলিমদের এই নেত্রী!

বেগম জিয়া বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল রশিদকে বিরোধীদলীয় নেতা করেছিলেন ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে, কারণ অন্য কোন দল সেই একতরফা নির্বাচনে অংশ নেয়নি। জানলে অবাক হবেন, ২০০১ সালে বেগম জিয়া ক্ষমতায় এসে ১৫ই আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ করে খুনি খায়রুজ্জামানকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে সরাসরি মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেন। এমনকি আরেক খুনি আজিজ পাশাকে মরণোত্তর প্রমোশন দেওয়ার অবিশ্বাস্য নজির গড়েছিলেন তিনি।

ইতিহাসের এই সময় পর্যন্ত, জিয়া পরিবারের এই সীমাহীন নির্দয় নিষ্ঠুরতার পরও জিয়া পরিবারের প্রতি শেখ হাসিনার প্রতিহিংসামূলক কোন আচরণ চোখে পড়ে না। কিন্তু এই দুটি পরিবারের এক হওয়ার দূরতম কোন সম্ভাবনাও চিরকালের জন্যে শেষ করে দিয়েছে যে ঘটনা সেটি ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা। হাসিনা প্রায় পনেরো বছর ক্ষমতায় থেকেও বেগম জিয়ার উপর গ্রেনেড-বোমা তো দূরের কথা, একটি ককটেলও ফুটলো না। আর্জেস গ্রেনেডের তুলনায় জেল জরিমানা যদি অধিক নিষ্ঠুরতা হয়ে থাকে, তবে হাসিনা নিষ্ঠুরই।

বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন শুধুমাত্র নীতিগত দিক থেকে বিবেচনা করলে হবে না, কারণ বাংলাদেশে নীতিকথা শুধু বইয়ে, বাস্তবে নাই। এখানে তাই জোর করে যে টিকে থাকতে পারবে সেই জিতবে। এদেশে কেউ ক্ষমতায় এলে কেউ সেখান থেকে নড়তে চায় না। যেমন বেগম জিয়া দুইবার ক্ষমতায় এসেছেন, এসেই আর সেখান থেকে সরবেন না। কিন্তু দুইবারই জনগণ তাকে নামিয়েছে। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও আছে। যেমন প্রথমবার শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসলেন, সংবিধান অনুযায়ী যাকে ক্ষমতা দেয়া দরকার তাকে দিয়ে হাসিনা সরে গেলেন, নির্বাচন হোল, খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসলেন। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনার আমলেই রক্তপাতহীন ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল। কিন্তু খালেদা জিয়া ২বার ক্ষমতায় এসেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার মত সুস্থ গণতন্ত্রচর্চায় ব্যর্থ হলেন কেন? বাংলাদেশে যারা আজকে সুষ্ঠু নির্বাচন চেয়ে মরছেন, তাঁদের অবশ্যই এই ইতিহাস জানতে হবে। সোজা কথা হল, ক্ষমতায় থাকার যে অপচেষ্টা করে খালেদা জিয়া দুইবার ব্যর্থ হয়েছেন, একই কাজ করে শেখ হাসিনা গত দুই টার্ম টিকে আছেন।

একথা ঠিক ২০১৪ ও ২০১৮ সালের তুলনায় হাসিনা সরকার এইবার বেশ চাপে আছে। আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় দিক থেকেই। আভ্যন্তরীণ চাপকে বিএনপির মত বুর্জোয়া দল কাজে লাগিয়ে ক্ষমতায় যেতে পারবে একথা দুগ্ধপোষ্য শিশুও বিশ্বাস করেনা। আন্দোলন করে কিছু অর্জনের ইতিহাস অন্তত বিএনপির নেই। আমেরিকা অনেক কথাই বলছে, বলতেই থাকবে, কিন্তু একটা দেশের সংবিধান পরিবর্তন করে তত্বাবধায়ক সরকার আনার প্রস্তাব তাঁরা কখনো দিবেনা। সুতরাং হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হবে। আমি সম্প্রতি দেশ থেকে ঘুরে এসেছি, চলতি পথে উবার ড্রাইভার, চায়ের দোকানে যেচে আলাপ করেছি। বহু মানুষ সরকারের উপর ক্ষুব্ধ কিন্তু একটা মানুষও পাইনি যিনি বিশ্বাস করেন এই সরকারকে হঠানো সম্ভব। দেশে সরকার পরিবর্তনের কোন হাওয়াই নেই। কিন্তু জামাতিদের কতিপয় পেইড লেখক সকালে একবার বিকেলে একবার সরকার ফেলে দিচ্ছে। সেদিন দেখলাম মির্জা ফখরুলের মেয়ের জামাই মানুষকে শুয়োরের বাচ্চা বলে গালি দিচ্ছে, কারণ সাধারণ মানুষ বিএনপির সাথে আন্দোলন করতে রাস্তায় নামছে না।

এদের লেখাজোখা দেখে রবীন্দ্রনাথের একটা কাহিনি মনে পড়ে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় যিনি ধনধান্যে পুষ্পেভরাসহ বহু অসাধারণ গান লিখেছেন, তিনি কবিগুরুর জনপ্রিয়তায় সাংঘাতিক হিংসাতুর হয়ে কবির বিরুদ্ধে প্রচুর লেখালেখি করেন। শুধু তাই নয়, কবিকে চিঠি লিখেও জানান যে তাঁর রচনা কিছুই হচ্ছে না, সব ভুল আর তরুণদের পথভ্রষ্ট করার তাল। জবাবে কবিগুরু বিরাট চিঠি লেখেন, সেখানে বলেন, আপনার লেখায় সত্য নির্ণয়ের আকাংখ্যা নেই, আছে ঔদ্ধত্যের অহংকার। ফেসবুকীয় পরজীবীদের লেখাতেও সত্য আর ন্যায় প্রতিষ্ঠার তাড়না নেই, আছে প্রতিক্রিয়াশীলদের ক্ষমতায় বসাবার বাসনা। যদি থাকে তবে তাঁরা যেন উপড়ে উল্লেখিত ইতিহাসটা মাথায় রাখেন।
ব্যক্তিগতভাবে আমি কি চাই? আমি চাই বাংলাদেশে একটা অবাধ নির্বাচন। এতে যদি শেখ হাসিনার চিরকালের জন্যেও পরাজয় ঘটে তবুও চাই। সত্য আর ন্যায়ের প্রতি পক্ষপাত থাকলে আপনাকেও সেটা চাইতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন আবারো, বাংলাদেশে কি সত্য আর ন্যায়ের ভাত আছে? জিয়া পরিবার শেখ পরিবারের সাথে হামুরাবির মত যে অসম অন্যায় করেছে, হাসিনার পক্ষে কি অতখানি ন্যায়সঙ্গত আচরণ করা সম্ভব যাতে করে তাঁর ক্ষমতা সরে গিয়ে তারই প্রতিপক্ষের হাতে গিয়ে পড়ে? আমার মতে সেটি সম্ভব নয়। তাই যা হওয়ার তাই হবে। রক্তারক্তি হবে, মেরে কেটে যে জিতবে সেই ক্ষমতায় যাবে। এখানে কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ সেই প্রশ্ন অবান্তর।

২৪ আগস্ট ২০২৩
বার্লিন থেকে
জাহিদ কবীর হিমন
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে আগস্ট, ২০২৩ রাত ৩:২৬
১৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Diplomacy is not tourism

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:৫৯


আফ্রিকার পশ্চিম প্রান্তে আটলান্টিকের তীরে সেনেগালের রাজধানী ডাকার। এপ্রিলের শেষে সেখানে বসেছে 'Dakar International Forum on Peace and Security in Africa'-এর দশম আসর। নামটা দীর্ঘ হলেও এবারের হাওয়া বেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার একশততম পোস্ট!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:১৮



আমার একশততম পোস্ট!

আজ আমার লেখকজীবনের এক ছোট্ট কিন্তু হৃদয়ের গভীরে দাগ কাটা দিন- সামহোয়্যারইন ব্লগ এ আমার একশততম পোস্ট। সংখ্যার হিসেবে হয়তো ১০০ খুব বড় কিছু নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভুল শুধু ভুল, আমি কি করছি ভুল?

লিখেছেন রবিন.হুড, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:৪১

আমি টাকার পিছনে না ছোটার কারনে আমার হাতে যথেষ্ট সময় থাকায় সে সময়টুকু সামাজিক কাজে ব্যয় করার চেষ্টা করছি। আবার বিলাসিতা পরিহার করার কারনে অল্প কিছু টাকা সাশ্রয় করছি যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংসদের বায়না : ৩০ সেট গয়না

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:১৪

একসময় এই প্রবাদটি খুব প্রচলিত ছিল, এমনকি পণ্ডিত মহলেও এটি নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করা হতো।
সময় বদলে গেছে; যমুনা নদী দিয়ে বহু জল বয়ে গিয়ে সাগরে মিশেছে।



বাস্তবতার নিরিখে আমাদের সমাজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফুল ট্যাঙ্ক স্বপ্ন

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৬



শহরের সকালগুলো এখন আর আগের মতো নয়। সূর্য ওঠার আগেই পেট্রোল পাম্পের সামনে লম্বা লাইন পড়ে যায়। সেই লাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে রিদম—একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আর জীবনের বাস্তবতায় আটকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×