গাছে হেলান দিয়ে নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে এক নাদুসনুদুস মহিষ। তার চোখে ঘুম, শরীরে প্রশান্তি—এমন এক নিশ্চয়তা, যেন কেউ তাকে স্পর্শও করতে সাহস পাবে না। ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে পর্যবেক্ষণ করে বাঘটি। এই বন তার কাছে নতুন নয়; এখানে শক্তিই আইন।
হিসাব মেলানোর পর বাঘ সিদ্ধান্ত নেয়—এটাই সময়।
প্রথম কামড় পড়ে উরুতে। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
পেট ছিঁড়ে খায়, তবু নড়চড় নেই।
এক এক করে কলিজা, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস—সব সাবাড় হয়ে যায়।
বাঘের বিস্ময় বাড়ে, কিন্তু ক্ষুধা থামে না।
শেষে যখন সে ঘাড়ে কামড় বসাতে যায়, তখনই বোঝা যায়—মহিষটা জীবনের চেয়ে বড় কোনো উদ্দেশ্যে শুয়ে ছিল। মুহূর্তে ফাঁদ আটকে যায় বাঘের শরীরে।
মহিষটা ছিল টোপ।
বাঘটাকে ধরে নিয়ে যায় শিকারি। প্রকাশ্যে সে একজন উদ্যোক্তা—বেসরকারি বিনিয়োগকারী, লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ী। বাস্তবে সে মধ্যস্বত্বভোগী ক্ষমতার দালাল। পাহাড়, বন, নদী পেরিয়ে নিজের গোপন আস্তানার দিকে এগোয় সে—যেখানে আইন পৌঁছায় না, কেবল সমঝোতা পৌঁছায়।
কিন্তু এবার তার পিছু নেয় রাষ্ট্র।
বাঘটার শরীরে বসানো ছিল জিপিএস ট্রান্সমিটার।
সে কোনো বন্য জন্তু নয়—এটা প্রশিক্ষিত অস্ত্র।
ক্ষমতার অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা শিকারিদের টেনে বের করার জন্য ব্যবহৃত এক বিশেষ বাহনের অংশ।
বাঘটা ছিল টোপ।
পুলিশের বিশেষ ইউনিট চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে সেই কেল্লা-সদৃশ বাড়ি। ভেতরে ঢুকতেই রাষ্ট্রের ভেতরকার আরেক রাষ্ট্র তার চাল চালায়।
একটি বিস্ফোরণ।
এক মুহূর্তে সব শেষ।
যে ইউনিটটি ঢুকেছিল, তাদের কাউকেই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তদন্ত থেমে যায়, ফাইল বন্ধ হয়, প্রেস নীরব থাকে।
কারণ এই ইউনিটটাই সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতার অন্দরমহলের বহু লম্পট, বকধার্মিক, দুর্নীতিবাজ মুখোশ খুলে দিয়েছিল।
রাষ্ট্র নিজের শরীর বাঁচাতে নিজেরই হাত কেটে ফেলে।
শিকারিটা ছিল টোপ।
রাজপ্রাসাদের ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে রাণী তখন নীরবে চা খাচ্ছেন। দূরের ঝিলটায় চোখ—পদ্ম, শাপলা, মাছ, ব্যাঙ, পানকৌড়ি। এক নিখুঁত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এতদিন এই দৃশ্য তার চোখে পড়েনি। মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেই কেল্লা—ক্ষমতার কুৎসিত প্রতীক।
বাড়িটা ভাঙার আইনগত সুযোগ ছিল না।
তাই রাণী আইনের বাইরে যাননি—আইনকেই ব্যবহার করেছেন।
রাজমহলের দুর্নীতিবাজদের একটি তালিকা তিনি পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ন্যায়বিচারের নামে, সংস্কারের অজুহাতে।
তালিকাটা ছিল টোপ।
রাণী জানতেন, তালিকা ধরা পড়লে ঘটনা এগোবে, সংঘাত বাড়বে, এবং শেষ পর্যন্ত কেল্লাটা আর থাকবে না।
বহুদিন পর রাণীর হাসি দেখে রাজা স্বস্তি পান। কিন্তু এই হাসি তার মন ভরায় না—বরং তাকে আরও সাহসী করে তোলে। কারণ তিনি জানেন, এই ঝিল, এই শোভা, এই শান্তি—সবই তার বহুদিনের প্রকল্প।
আর তিনি এটাও জানেন, এই নারী এখন তার পথে বাধা।
আরেকটি বিয়ের ইচ্ছে তার রাজনীতির জন্য জরুরি। উত্তরাধিকার, জোট, ভারসাম্য—সব হিসাব এতে জড়িত।
ঠিক এই ঝুলবারান্দাতেই, এই সৌন্দর্যের মাঝেই, তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন শেষ ধাক্কাটা দেওয়ার।
ঝিলটা ছিল টোপ।
এই গল্পে কেউ নিরপরাধ নয়।
মহিষ, বাঘ, শিকারি, পুলিশ, রাজা, রাণী—সবাই কারও না কারও জন্য ব্যবহৃত।
ক্ষমতা নিজে হাতে খুব কমই খুন করে।
সে টোপ পাতে।
শিকার এগোয় নিজে থেকেই।
মহাবিশ্ব যেমন গ্রহকে গ্রহের ফাঁদে রাখে, তেমনি রাজনীতি মানুষকে মানুষের ফাঁদে ফেলে।
ইতিহাস আসলে বিপ্লবের ধারাবাহিকতা নয়—
এটা টোপের ওপর টোপের ধারাবাহিকতা।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



