somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

টোপ

১৩ ই জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


গাছে হেলান দিয়ে নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে এক নাদুসনুদুস মহিষ। তার চোখে ঘুম, শরীরে প্রশান্তি—এমন এক নিশ্চয়তা, যেন কেউ তাকে স্পর্শও করতে সাহস পাবে না। ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে পর্যবেক্ষণ করে বাঘটি। এই বন তার কাছে নতুন নয়; এখানে শক্তিই আইন।

হিসাব মেলানোর পর বাঘ সিদ্ধান্ত নেয়—এটাই সময়।

প্রথম কামড় পড়ে উরুতে। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
পেট ছিঁড়ে খায়, তবু নড়চড় নেই।
এক এক করে কলিজা, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস—সব সাবাড় হয়ে যায়।

বাঘের বিস্ময় বাড়ে, কিন্তু ক্ষুধা থামে না।

শেষে যখন সে ঘাড়ে কামড় বসাতে যায়, তখনই বোঝা যায়—মহিষটা জীবনের চেয়ে বড় কোনো উদ্দেশ্যে শুয়ে ছিল। মুহূর্তে ফাঁদ আটকে যায় বাঘের শরীরে।
মহিষটা ছিল টোপ।

বাঘটাকে ধরে নিয়ে যায় শিকারি। প্রকাশ্যে সে একজন উদ্যোক্তা—বেসরকারি বিনিয়োগকারী, লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ী। বাস্তবে সে মধ্যস্বত্বভোগী ক্ষমতার দালাল। পাহাড়, বন, নদী পেরিয়ে নিজের গোপন আস্তানার দিকে এগোয় সে—যেখানে আইন পৌঁছায় না, কেবল সমঝোতা পৌঁছায়।

কিন্তু এবার তার পিছু নেয় রাষ্ট্র।

বাঘটার শরীরে বসানো ছিল জিপিএস ট্রান্সমিটার।
সে কোনো বন্য জন্তু নয়—এটা প্রশিক্ষিত অস্ত্র।
ক্ষমতার অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা শিকারিদের টেনে বের করার জন্য ব্যবহৃত এক বিশেষ বাহনের অংশ।

বাঘটা ছিল টোপ।

পুলিশের বিশেষ ইউনিট চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে সেই কেল্লা-সদৃশ বাড়ি। ভেতরে ঢুকতেই রাষ্ট্রের ভেতরকার আরেক রাষ্ট্র তার চাল চালায়।
একটি বিস্ফোরণ।
এক মুহূর্তে সব শেষ।

যে ইউনিটটি ঢুকেছিল, তাদের কাউকেই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তদন্ত থেমে যায়, ফাইল বন্ধ হয়, প্রেস নীরব থাকে।

কারণ এই ইউনিটটাই সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতার অন্দরমহলের বহু লম্পট, বকধার্মিক, দুর্নীতিবাজ মুখোশ খুলে দিয়েছিল।
রাষ্ট্র নিজের শরীর বাঁচাতে নিজেরই হাত কেটে ফেলে।

শিকারিটা ছিল টোপ।

রাজপ্রাসাদের ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে রাণী তখন নীরবে চা খাচ্ছেন। দূরের ঝিলটায় চোখ—পদ্ম, শাপলা, মাছ, ব্যাঙ, পানকৌড়ি। এক নিখুঁত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এতদিন এই দৃশ্য তার চোখে পড়েনি। মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেই কেল্লা—ক্ষমতার কুৎসিত প্রতীক।

বাড়িটা ভাঙার আইনগত সুযোগ ছিল না।
তাই রাণী আইনের বাইরে যাননি—আইনকেই ব্যবহার করেছেন।

রাজমহলের দুর্নীতিবাজদের একটি তালিকা তিনি পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ন্যায়বিচারের নামে, সংস্কারের অজুহাতে।
তালিকাটা ছিল টোপ।

রাণী জানতেন, তালিকা ধরা পড়লে ঘটনা এগোবে, সংঘাত বাড়বে, এবং শেষ পর্যন্ত কেল্লাটা আর থাকবে না।

বহুদিন পর রাণীর হাসি দেখে রাজা স্বস্তি পান। কিন্তু এই হাসি তার মন ভরায় না—বরং তাকে আরও সাহসী করে তোলে। কারণ তিনি জানেন, এই ঝিল, এই শোভা, এই শান্তি—সবই তার বহুদিনের প্রকল্প।

আর তিনি এটাও জানেন, এই নারী এখন তার পথে বাধা।

আরেকটি বিয়ের ইচ্ছে তার রাজনীতির জন্য জরুরি। উত্তরাধিকার, জোট, ভারসাম্য—সব হিসাব এতে জড়িত।
ঠিক এই ঝুলবারান্দাতেই, এই সৌন্দর্যের মাঝেই, তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন শেষ ধাক্কাটা দেওয়ার।

ঝিলটা ছিল টোপ।

এই গল্পে কেউ নিরপরাধ নয়।
মহিষ, বাঘ, শিকারি, পুলিশ, রাজা, রাণী—সবাই কারও না কারও জন্য ব্যবহৃত।

ক্ষমতা নিজে হাতে খুব কমই খুন করে।
সে টোপ পাতে।
শিকার এগোয় নিজে থেকেই।

মহাবিশ্ব যেমন গ্রহকে গ্রহের ফাঁদে রাখে, তেমনি রাজনীতি মানুষকে মানুষের ফাঁদে ফেলে।
ইতিহাস আসলে বিপ্লবের ধারাবাহিকতা নয়—
এটা টোপের ওপর টোপের ধারাবাহিকতা।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৮
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রাহমান কলমের সাহায্যে কোরআন ও বাইয়ান শিক্ষা দিয়ে থাকেন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৬:১০



সূরাঃ ৯৬ আলাক, ১ নং থেকে ৪ নং আয়াতের অনুবাদ-
১। পড় তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন
২। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ‘আলাক’ হতে
৩। পড় তোমার রব মহামহিমাম্বিত
৪। যিনি... ...বাকিটুকু পড়ুন

যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলঃযাঁর হাত ধরে পাকিস্তানের জন্ম

লিখেছেন কিরকুট, ৩০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৭



দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের ভূমিকা একদিকে যুগান্তকারী, অন্যদিকে গভীরভাবে বিতর্কিত। যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মপ্রক্রিয়ায় তিনি ছিলেন একেবারে কেন্দ্রীয় চরিত্র। অথচ কয়েক... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি অসভ্য জাতির রাজনীতি!

লিখেছেন শেরজা তপন, ৩০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:২১


সাল ২০০৮। ব্লগারদের দারুণ সমাগম আর চরম জোশ। ব্লগে ঝড় তুলে দুনিয়া পাল্টে দেওয়ার স্বপ্ন তখন সবার।
বিএনপি আর জামায়াত জোট তখন ভীষণ কোণঠাসা। কেউ একজন মুখ ফসকে ওদের পক্ষে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=মাছে ভাতে বাঙালি - যায় না আর বলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ৩০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:০৫


মাছে ভাতে আমরা ছিলাম বাঙালি,
উনুন ঘরে থাকতো, রঙবাহারী মাছের ডালি
মলা ছিল -:ঢেলা ছিল, ছিল মাছ চেলা,
মাছে ভাতে ছিলাম বাঙালি মেয়েবেলা।

কই ছিল পুকুর ভরা, শিং ছিল ডোবায়
জলে হাঁটলেই মাছেরা - ছুঁয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিঃস্বঙ্গ এক গাংচিল এর জীবনাবসান

লিখেছেন নীল-দর্পণ, ৩১ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:৪৯

বিয়ের পর পর যখন সৌদি আরব গিয়েছিলাম নতুন বউ হিসেবে দারুন ওয়েলকাম পেয়েছিলাম যা কল্পনার বাইরে। ১০ দিনে মক্কা-মদিনা-তায়েফ-মক্কা জিয়ারাহ, ঘোরাফেরা এবং টুকটাক শপিং শেষে মক্কা থেকে জেদ্দা গাড়ীতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×