জাতীয় সংসদ সাধারণত আইন, বাজেট, নীতি ও রাজনীতির মঞ্চ। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন কিছু মুহূর্ত তৈরি হয়, যা সংসদীয় ইতিহাসে রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে ভাষাগত বৈচিত্র্যের কারণেই বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকে।
আজকের অধিবেশন ছিল ঠিক তেমনই একটি দিন।
একই সংসদ, একই বাজেট আলোচনা, অথচ দুই বক্তার ইংরেজি ভাষণ যেন দুই ভিন্ন জগতের প্রতিনিধিত্ব করছিল।
প্রথম বক্তা ছিলেন জামায়াতের একজন সংসদ সদস্য। তাঁর বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছিল তিনি শুধু বাজেট নিয়ে কথা বলতে আসেননি; সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন অর্থনীতি, সাহিত্য এবং ক্লাসিক্যাল ইংরেজি বক্তৃতার একটি সংক্ষিপ্ত কোর্স।
বাজেট ঘাটতি, জিডিপি অনুপাত, কর কাঠামো, ঋণনীতি—একটির পর একটি অর্থনৈতিক পরিভাষা তিনি সাবলীলভাবে ব্যবহার করছিলেন। কিন্তু আসল চমক ছিল তখন, যখন তিনি হঠাৎ উইলিয়াম শেক্সপিয়রের Hamlet থেকে উদ্ধৃতি টেনে আনলেন—
"Neither a borrower nor a lender be..."
সংসদের বাতাসে মুহূর্তের জন্য যেন ইংল্যান্ডের এলিজাবেথীয় যুগের গন্ধ ভেসে এলো।
এরপর তিনি অ্যাডাম স্মিথের অর্থনৈতিক দর্শনের প্রসঙ্গও তুললেন। বক্তব্যের প্রস্তুতি, আত্মবিশ্বাস এবং উপস্থাপনা এমন ছিল যে স্পিকারও তাঁকে অতিরিক্ত সময় দিতে কার্পণ্য করেননি।
এর কিছুক্ষণ পর আরেকজন সংসদ সদস্য বক্তৃতা দিতে উঠলেন।
আর সেখানেই দৃশ্যপট বদলে গেল।
যেখানে প্রথম বক্তা ইংরেজিকে ব্যবহার করছিলেন একটি আন্তর্জাতিক একাডেমিক ভাষা হিসেবে, সেখানে দ্বিতীয় বক্তা ইংরেজিকে ব্যবহার করলেন সম্পূর্ণ নিজের মতো করে—একটি সৃজনশীল, দেশীয় এবং স্বতঃস্ফূর্ত সংস্করণে।
তিনি বললেন—
"I want to thank প্রধানমন্ত্রী from my heart..."
এরপর এল সেই ঐতিহাসিক বাক্য—
"1600 miles of কাঁচা রাস্তাস. The রাস্তাজ are very very bad situation."
ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাসে হয়তো বহু ভাষার সংমিশ্রণ ঘটেছে, কিন্তু "রাস্তাস" থেকে "রাস্তাজ"-এ বিবর্তনের এই দ্রুতগতি গবেষকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।
একই বক্তব্যের মধ্যেই একটি বাংলা শব্দের বহুবচন দুই রূপে ব্যবহৃত হওয়া নিঃসন্দেহে সৃজনশীলতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
তবে মজার বিষয় হলো, এই দুই বক্তৃতাই আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার দুটি ভিন্ন দিক তুলে ধরে।
একদিকে আছেন এমন রাজনীতিবিদ, যিনি আন্তর্জাতিক মানের ভাষা ও রেফারেন্স ব্যবহার করে নিজের বক্তব্যকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন।
অন্যদিকে আছেন এমন প্রতিনিধি, যিনি ভাষার আনুষ্ঠানিক নিয়মের চেয়ে নিজের স্বতঃস্ফূর্ততা ও অনুভূতিকেই বেশি গুরুত্ব দেন।
ফলে দিনের শেষে বিতর্কটা হয়তো ইংরেজি ভালো না খারাপ বলার নয়।
বরং প্রশ্ন হলো—জনপ্রতিনিধির মূল্যায়ন কি তাঁর উচ্চারণ দিয়ে হবে, নাকি তাঁর বক্তব্যের মান, যুক্তি এবং জনগণের সমস্যা তুলে ধরার দক্ষতা দিয়ে?
তবুও স্বীকার করতেই হবে, আজকের সংসদ অধিবেশন একটি বিরল অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছে।
একদিকে শেক্সপিয়র, অ্যাডাম স্মিথ এবং অর্থনৈতিক তত্ত্ব।
অন্যদিকে "কাঁচা রাস্তাজ"।
একই সংসদে এমন বৈচিত্র্য সত্যিই বিরল।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই—একই ছাদের নিচে কেমব্রিজও থাকে, আবার "রাস্তাজ"-ও থাকে।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



