somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

টাকার রং নেই, আছে মানুষের মুখ

২৩ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এক কোটি টাকা ভর্তি একটি ব্যাগ যদি হঠাৎ আপনার সামনে খুলে দেওয়া হয়, আপনি কী করবেন? বিস্ময়ে থমকে যাবেন? নাকি জীবনের সব অপূর্ণ হিসাব এক মুহূর্তে মেলাতে শুরু করবেন?

টাকার প্রতি মানুষের আকর্ষণ নতুন কিছু নয়। জন্মের পর হাসপাতালের বিল থেকে শুরু করে মৃত্যুর পর কাফনের কাপড় পর্যন্ত— জীবনের প্রতিটি বাঁকে টাকার উপস্থিতি অনিবার্য। অথচ এই টাকাই মানুষের কাছে একেক রকম অর্থ বহন করে। কারও কাছে এটি ক্ষমতা, কারও কাছে নিরাপত্তা, কারও কাছে স্বপ্ন, আবার কারও কাছে কেবল বেঁচে থাকার অবলম্বন।

শহরের কোনো উঁচু ভবনের ছাদে দাঁড়িয়ে নিচের ব্যস্ত রাস্তাটার দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। অফিসগামী কর্মকর্তা, রিকশাচালক, সবজি বিক্রেতা, কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো শ্রমজীবী মানুষ, কিংবা দামি গাড়ি থেকে নেমে যাওয়া ব্যবসায়ী— সবাই যেন ভিন্ন ভিন্ন পথের যাত্রী। কিন্তু তাদের গন্তব্যে একটি বিষয় অভিন্ন: অর্থ।

মানুষ আসলে প্রতিদিন ঘর থেকে বের হয় রুটির জন্য, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য, চিকিৎসার জন্য, সম্মানের জন্য, কিংবা স্বপ্ন পূরণের জন্য। আর এসবের কেন্দ্রে ঘুরপাক খায় টাকা নামের সেই অদৃশ্য শক্তি।

তবে টাকার গল্প শুধু উপার্জনের নয়, বৈষম্যেরও। একজন চাকরিজীবীর সারাজীবনের সঞ্চয়েও যেখানে একটি ছোট্ট ফ্ল্যাট কেনা কঠিন হয়ে পড়ে, সেখানে কিছু মানুষের সম্পদের পাহাড় দেখে প্রশ্ন জাগে— এই বিপুল অর্থের উৎস কোথায়? কীভাবে গড়ে ওঠে এমন অট্টালিকা, এমন জীবনযাপন?

আরও বড় প্রশ্ন তৈরি হয় যখন খবর আসে, হাজার হাজার কোটি টাকা দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশি ব্যাংকে জমা হচ্ছে। যে অর্থ দেশের শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা কর্মসংস্থানে কাজে লাগতে পারত, সেটি নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বিদেশে পাড়ি জমায়। তখন বিষয়টি কেবল অর্থনৈতিক থাকে না; এটি হয়ে ওঠে নৈতিকতারও প্রশ্ন।

অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের দিকেও চোখ যায়। কোটি কোটি টাকার পোশাক, সাজসজ্জা কিংবা বাহ্যিক পরিবর্তনের উদ্যোগ দেখে সাধারণ মানুষ ভাবতে বাধ্য হয়— কেবল পোশাক বদলালেই কি দায়িত্ববোধ বদলায়? ইউনিফর্ম নতুন হলেই কি সেবার মান বাড়ে? নাকি পরিবর্তনের প্রয়োজন মানুষের চিন্তা ও চরিত্রে?

এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো অর্থনীতির বইয়ে পাওয়া যাবে না। উত্তর লুকিয়ে আছে সমাজের প্রান্তে বসে থাকা সেই বৃদ্ধার চোখে, যিনি ভিক্ষা চান না, অথচ কেউ কিছু দিলে কৃতজ্ঞতায় গ্রহণ করেন। তার হাতে যখন একটি পাঁচশ টাকার নোট তুলে দেওয়া হয়, তখন সেই নোট আর কাগজ থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে একবেলার মাছ, ওষুধের দাম, কিংবা বহুদিনের অপূর্ণ কোনো ছোট্ট ইচ্ছার বাস্তবায়ন।

সেখানে টাকা বিলাস নয়, প্রয়োজন।

একজন ধনীর কাছে পাঁচশ টাকা হয়তো গাড়ির ড্যাশবোর্ডে পড়ে থাকা খুচরা ব্যয়ের সমান। কিন্তু একজন ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে সেই একই টাকা একটি দিনের শান্তি, একটি রাতের নিশ্চিন্ত ঘুম, কিংবা বেঁচে থাকার আরেকটি সুযোগ।

তাই টাকার আসলে কোনো রং নেই। কালো বা সাদা বলে যা বলা হয়, তা টাকার নয়; তা মানুষের বিবেকের রং। টাকা নিজে নিরপেক্ষ। মানুষই তাকে সৎ কিংবা অসৎ পথে অর্জন করে, মানুষের জীবনেই তা আশীর্বাদ অথবা অভিশাপ হয়ে ওঠে।

মীর মশাররফ হোসেন বহু আগে লিখেছিলেন, “জন্মমাত্রই টাকা, জীবনান্তে টাকা, জগৎ টাকারই খেলা।” সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে; কিন্তু সেই সত্য আজও অমলিন। কারণ টাকা কখনো শুধু অর্থ নয়— এটি মানুষের আকাঙ্ক্ষা, সংগ্রাম, বৈষম্য, স্বপ্ন এবং প্রয়োজনের এক জটিল প্রতিচ্ছবি।

শেষ পর্যন্ত হয়তো আমাদের মনে রাখতে হবে, টাকার মূল্য তার অঙ্কে নয়, তার ব্যবহারে। কারণ একই নোট কারও কাছে অহংকারের প্রতীক, আবার কারও কাছে জীবনের আলো।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৫২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শৈশব থেকে খেলতে খেলতে শিশুকে ইংরেজি শিক্ষা দিন। ২ বছর বয়স থেকে কীভাবে আপনার শিশুকে খেলাধুলা, আনন্দ এবং দৈনন্দিন জীবনের মাধ্যমে ইংরেজি শেখাবেন?

লিখেছেন rezaul827, ২২ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৩

অনেক অভিভাবকের ধারণা, ইংরেজিতে সাবলীল হতে হলে ছোটবেলা থেকেই কোচিং, টিউটর বা ব্যয়বহুল স্কুল প্রয়োজন। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। আমি আমার সন্তানকে খেলার ছলে, স্বাভাবিক পরিবেশে এবং পরিবারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

=আল্লাহ মহান=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ১২:২২



একবার চিন্তায় ডুবাও মন?
ভেবে দেখো আরো একবার
আল্লাহ কত মহান, কত যে তাঁর দয়া;
ভুমিকম্প হলো প্রকট
তবুও বেঁচে আছি এ যাত্রায়
শোকর গুজার করেছো কী তাঁর?

ভাবনায় একবার আনো,
আল্লাহর দেয়া গজব-কত ভয়ঙ্কর
তবুও কী ভয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে মাঠে নামছে জামায়াত-এনসিপি।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ২:১৭


বাংলাদেশে এই প্রথম একটা অভাবনীয় ঘটনার সাক্ষী হচ্ছি আমরা। সরকার টেকানোর জন্য মাঠে নামছে বিরোধী দল! জ্বী, আপনি ঠিকই পড়েছেন। আগামীকাল আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। ওহ সরি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাইরে এসো

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৬

এসো, বৃত্তবদ্ধ খাঁচা ছেড়ে বাইরে এসো,
কল্পনাতীত উদাত্ত আকাশে চোখ পেতে
দুজনে বসি ঘাস গালিচাতে আজ পাশাপাশি ,
দেখ, পুস্প-ফলে বৃক্ষদের একাগ্র তপস্যা
দেখ, পূর্নিমাকে অর্থ দেয় বিপরীত অমাবশ্যা ।

দেখ, সাপ ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেসুরো গলায় গান গাওয়ার অপরাধে

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:০৯


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাংলা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী মো. তাশরিক-ই-হাবিবকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে

যে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পপুলিস্ট দিক ও ন্যায়বিচারের দিক উভয়ই খেয়াল রাখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×