somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাজেট বিতর্ক

২৫ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী তাঁর রাজনৈতিক ও আদর্শিক উত্তরাধিকারের পাশাপাশি বাংলাদেশকে উপহার দিয়ে গেছেন দুটি আলোচিত সন্তান— ডা. খালিদ ও ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান। জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই একটি ধারণা প্রচলিত যে, জীবদ্দশায় শহীদ নিজামী খুব কম ক্ষেত্রেই নিজের সন্তানদের নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশংসা করতেন। তবে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমানের মেধা, অধ্যবসায় ও নেতৃত্বগুণ নিয়ে তিনি একাধিকবার সন্তুষ্টি ও মুগ্ধতার কথা ব্যক্ত করেছিলেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা উল্লেখ করেন। অনেকের মতে, যে সন্তান তাঁর পিতার মতো একজন বিচক্ষণ নেতাকেও মুগ্ধ করতে পেরেছিলেন, তিনি আজ সংসদে তাঁর যুক্তি, তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ এবং সাবলীল উপস্থাপনার মাধ্যমে দেশের বহু মানুষকে মুগ্ধ করছেন।

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে আলোচনায় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান একটি দীর্ঘ, তথ্যনির্ভর এবং রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বক্তৃতা দেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল— বর্তমান বাজেট কেবল একটি অর্থনৈতিক দলিল নয়, বরং এটি দেশের শাসনব্যবস্থা, জবাবদিহিতা, দুর্নীতি এবং বৈষম্যের সামগ্রিক চিত্রের প্রতিফলন।

বক্তৃতার শুরুতেই তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রে বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় জনপ্রতিনিধিদের সীমিত ভূমিকার সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের বাজেট মূলত আমলানির্ভর একটি প্রক্রিয়া, যেখানে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের অংশগ্রহণ প্রায় নামমাত্র। ফলে সংসদে বাজেট নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবে তা প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। তিনি উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর উদাহরণ টেনে বাজেটকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান।

সরকারের ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট’ দাবিকেও তিনি চ্যালেঞ্জ করেন। মুদ্রাস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতার তুলনা টেনে তিনি বলেন, সংখ্যার বিচারে বাজেট বড় হলেও প্রকৃত অর্থে এর বিশেষত্ব হচ্ছে বিশাল ঘাটতি এবং ঋণনির্ভরতা। দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা থাকলেও সেই ঋণ কীভাবে পরিশোধ করা হবে কিংবা কোন খাতে বিনিয়োগ করে কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন আনা হবে— সে বিষয়ে বাজেটে সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই বলে তিনি অভিযোগ করেন।

কর ব্যবস্থার সমালোচনা করতে গিয়ে নাজিবুর রহমান বলেন, দেশের অধিকাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ কর না দিলেও পরোক্ষ কর বা ভ্যাটের বোঝা বহন করছে। ধনী-গরিব সবাইকে একই হারে ভ্যাট দিতে হওয়ায় এটি সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি বাজেটে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ অব্যাহত থাকার বিষয়টি তুলে ধরে মধ্যবিত্তের আবাসন সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

উন্নয়ন ব্যয় ও সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার অভাবকে তিনি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেই অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব সংসদের সামনে সময়মতো উপস্থাপন করা হয় না। ফলে দুর্নীতি ও অপচয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়। চিনিশিল্পের অতীত অভিজ্ঞতা এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার কয়েকটি উদাহরণ টেনে তিনি দাবি করেন, সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা অনেক বেশি বৃদ্ধি করা সম্ভব।

বক্তৃতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে ছিল সুদভিত্তিক অর্থনীতি নিয়ে তাঁর আপত্তি। কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ক্রমবর্ধমান ঋণ ও সুদের বোঝা দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। এর বিকল্প হিসেবে তিনি যাকাতভিত্তিক দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির প্রস্তাব দেন এবং মনে করেন, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও জনআস্থা নিশ্চিত করা গেলে যাকাত দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

সবশেষে নাজিবুর রহমান বলেন, বাজেটকে সত্যিকার অর্থে জনকল্যাণমুখী করতে হলে কেবল সংখ্যা বৃদ্ধি করলেই হবে না; বরং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, সংসদের কার্যকর ভূমিকা প্রতিষ্ঠা, ঋণনির্ভরতা কমানো এবং ধনী-দরিদ্র বৈষম্য হ্রাসে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম ছিল— উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি কেবল বড় বাজেট নয়, বরং সেই বাজেট কতটা স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৯
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৩



আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।

বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।

যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ সময়ের ব্যবধানে তারা দুজন

লিখেছেন সামিয়া, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৩



কোর্টের সামনের চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। দুপুরের রোদটা তখন কিছুটা নরম হয়েছে। মানুষের ভিড়, আইনজীবীদের কালো কোট, চায়ের দোকানের ধোঁয়া আর ফাইল হাতে ছুটে চলা লোকজন মিলে জায়গাটা যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মের অবমাননা রুখতে গিয়ে নিজের ধর্মকেই ছোট করছেন না তো?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৫


সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ধর্ম অবমাননার আবার একটা ঘটনা ঘটলো। ২৩ জুন ২০২৬। প্রিন্স রায় দীপ্ত নামের পঁচিশ বছরের একটা ছেলে নবীজিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারতীয় মুসলিমদের অসহনীয় জীবন

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৫ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:১৫


পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার সুপুরডিহি গ্রামের ঠেলাগাড়িতে বাসনপত্র বিক্রেতা দরিদ্র মুসলিম আকবর ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানধারী জঙ্গি হিন্দুদের হাতে প্রাণ দিলেন, আর মুক্তি পেলেন অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার হাত থেকে। পুরুলিয়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

নতুন মসজিদের কাজ শুরু করলাম

লিখেছেন প্রামানিক, ২৫ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৬


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক

আলহামদুলিল্লাহ্, নতুন মসজিদের কাজ আজ থেকে শুরু হলো। আজ সকাল দশটায় গ্রামের কয়েকজন ধর্মপ্রাণ উদ‍্যোগী মানুষ নিজ উদ‍্যোগেই মাটি কেটে দিয়েছে।

আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর পূর্বে আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×