somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মানুষটা চলে গেল চুপিসারে…

০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গার্মেন্টস শিল্পে মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়, একসঙ্গে পথচলা হয়, আবার একসময় বিচ্ছেদও ঘটে। কেউ বদলি হয়, কেউ পদোন্নতি পায়, কেউ নতুন দায়িত্বে যায়। কিন্তু কিছু মানুষ থাকে, যাদের স্মৃতি কোনো অফিস অর্ডারের সঙ্গে বদলি হয় না। রেজাউল করিম রেজা তেমনই একজন মানুষ।

আমার কর্মজীবনের শুরু ২০০৫ সালে। রেজাউল করিম রেজা যোগ দেয় ২০০৭ সালের শুরুতে, একজন সাধারণ টেবিল কিউসি হিসেবে।

সেই সময় আমরা চট্টগ্রামের বিভিন্ন নিট কারখানায় কাজ করতাম। নিয়মিত বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে ফলোআপে যেতে হতো। দায়িত্বশীল ও দক্ষ কিউসিদেরই সাধারণত সেই দলে রাখা হতো। রেজাউলও ছিল তাদের একজন। সেখান থেকেই আমাদের প্রথম পরিচয়।

এরপর আমার পথ বদলে যায়। আমি মার্চেন্ডাইজিং বিভাগে যোগ দিই। অন্যদিকে রেজাউল নিজের কর্মদক্ষতা আর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে থাকে। কোয়ালিটি সুপারভাইজর, কোয়ালিটি ইনচার্জ—তারপর একসময় প্রোডাকশন বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।

ভাগ্যের অদ্ভুত খেলায় আবার আমাদের দেখা হয়। আমি তখন একটি কারখানার ফ্যাক্টরি ম্যানেজার, আর সে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোডাকশন ম্যানেজার।

মানুষটাকে দেখে মনে হয়েছিল, পদবি বদলেছে, দায়িত্ব বেড়েছে; কিন্তু মানুষটা বদলায়নি।

কথায় বিনয়, কাজে আন্তরিকতা, পোশাকে রুচি, সহকর্মীদের প্রতি সম্মান—সবকিছু আগের মতোই।

ম্যানেজমেন্টের প্রতি দায়িত্বশীল, আবার কর্মীদের প্রতিও সমান সহানুভূতিশীল ছিল সে। খুব সহজেই মানুষের মন জয় করার এক বিরল ক্ষমতা ছিল তার।

কিছুদিন একসঙ্গে কাজ করার সময়ে অসংখ্য মধুর-তিক্ত স্মৃতি জমেছিল। পরে আবার আমার বদলি হয়ে যায়। একই কর্মস্থলে না থাকলেও মোবাইল আর হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ ছিল নিয়মিত। কোনো সমস্যা হলে ফোন করত, পরামর্শ চাইত।

এরই মধ্যে সে প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে পদোন্নতি পেল। নতুন কারখানায় দায়িত্ব নিল। কিছুদিন পর আমিও আবার বদলি হয়ে সেই একই কারখানায় এলাম। আবার শুরু হলো একসঙ্গে পথচলা।

দেখলাম, সময় তাকে বয়স দিয়েছে, দায়িত্ব দিয়েছে; কিন্তু তার ভদ্রতা, পরিপাট্য আর বিনয়কে একচুলও বদলাতে পারেনি।

ইতোমধ্যে সে দাদা হয়েছে—খবরটা শুনে খুব আনন্দ হয়েছিল।

তবে তার হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প।

একদিন বলেছিল, তার স্ত্রীর জটিল অসুস্থতার কথা। দীর্ঘদিন চিকিৎসা চলছে। অর্থের টানাপোড়েন নিত্যসঙ্গী। বড় ছেলে আলাদা সংসার করেছে, ছোট ছেলে তখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। সংসারের ভার যেন একাই বহন করছিল।

অভাব ছিল, কিন্তু মন ছিল উদার।

আমি প্রায়ই বলতাম, "এত হাত খুলে খরচ করো কেন? এটা তোমার বদঅভ্যাস।"

সে হাসত।

বলত, "স্যার, আপনার কাছ থেকেই একটু শিখেছি।"

আমি বলতাম, "তাহলে তো আমারই দোষ!"

আজ সেই কথাগুলোই বারবার মনে পড়ছে।

রেজাউলের আরেকটি বিশেষ অভ্যাস ছিল।

সে সবসময় পরিপাটি পোশাক পরত। আমার রুমে এলে প্রায়ই সুগন্ধি ব্যবহার করে আসত।

একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম,

"এত সুগন্ধি মেখে আসো কেন?"

সে মৃদু হেসে বলেছিল,

"স্যার, পরিপাটি থাকার চেষ্টা করি। গার্মেন্টসে চাকরি করি বলে কি আমাদের রুচির অকাল হবে?"

আজও কথাটা কানে বাজে।

মাঝেমধ্যে সে বুকের ব্যথার কথা বলত।

কখনও বলত গ্যাস্ট্রিক, কখনও বলত এমনিতেই ব্যথা।

একদিন ব্যথার তীব্রতায় ঘেমে একাকার হয়ে গিয়েছিল। তাকে ডাক্তারের রুমে বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। অফিস শেষে নিজের গাড়িতে করেই বাসায় পৌঁছে দিয়েছিলাম।

পথে অনেক কথা হয়েছিল।

আমি বলেছিলাম,

"একজন ভালো ডাক্তার দেখাও।"

সে হয়তো দেখিয়েছিল।

হয়তো দেখায়নি।

তারপর আবার তার বদলি হয়ে গেল অন্য কারখানায়।

বিদায়ের সময় একটি কথাই বারবার বলছিল—

"স্যার, আমার বার্ষিক ইঙ্ক্রিমেন্টের ব্যাপারে একটু সুপারিশ করবেন।"

আমি তাকে বুঝিয়েছিলাম, যেহেতু সে আমার দায়িত্বাধীন কারখানা থেকে বদলি হয়ে গেছে, তাই বাস্তবে আমার কিছু করার সুযোগ খুবই সীমিত। কিন্তু তার চোখে ছিল অদ্ভুত এক আশাবাদ। সে বিশ্বাস করত—এবার হয়তো তার ভালো একটি ইঙ্ক্রিমেন্ট হবে।

আমাদের শেষ দেখা হয়েছিল গত ২৪ জুলাই।

কোম্পানির অ্যাওয়ারনেস এজিএম-এ একসঙ্গে গিয়েছিলাম। মিটিং শেষে পাশাপাশি বসে ফিরেছি। সহকর্মীদের সঙ্গে হাসিঠাট্টা, গল্প—সবই হয়েছিল।

কেউ জানত না, সেটিই হবে শেষ দেখা।

গতকাল গভীর রাতে খবর এল—

রেজাউল করিম রেজা আর নেই।

খবরটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল।

আজ বারবার মনে হচ্ছে, আমি কি আরও একটু খোঁজ নিতে পারতাম না? তার বুকের ব্যথাকে আরও গুরুত্ব দিতে পারতাম না? একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে আরও জোর করতে পারতাম না?

হয়তো কিছুই বদলাত না।

আবার হয়তো অনেক কিছুই বদলে যেত।

এই 'হয়তো' শব্দটাই এখন সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।

কয়েক দিনের মধ্যেই হয়তো কোম্পানি তার বার্ষিক ইঙ্ক্রিমেন্ট ঘোষণা করবে।

হয়তো তার প্রত্যাশার চেয়েও ভালো হবে।

হয়তো হবে গতানুগতিক, আর পাঁচজনের মতোই।

কিন্তু সেই খবর আর কোনো দিন জানতে পারবে না রেজাউল করিম রেজা।

যে মানুষটি বিদায়ের সময় সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বাস নিয়ে নিজের ইঙ্ক্রিমেন্টের কথা বলেছিল, সেই মানুষটাই ফল প্রকাশের আগেই পৃথিবীর চাকরি ছেড়ে চিরস্থায়ী ঠিকানায় চলে গেল।

জীবনের চেয়ে বড় কোনো পদোন্নতি নেই।

মৃত্যুর চেয়ে বড় কোনো বদলিও নেই।

আজ বুঝতে পারছি, আমরা প্রতিদিন উৎপাদনের হিসাব রাখি, শিপমেন্টের হিসাব রাখি, টার্গেটের হিসাব রাখি—কিন্তু মানুষের জীবনের হিসাব রাখি না।

অথচ একদিন হঠাৎ করেই উপস্থিতির তালিকা থেকে একটি নাম মুছে যায়, আর তখনই বুঝি—একজন মানুষ কেবল একজন কর্মী ছিল না; সে ছিল একটি সম্পর্ক, একটি আস্থা, একটি অভ্যাস, একটি সুগন্ধি মাখা পরিপাটি হাসিমুখ।

মহান আল্লাহর কাছে আমার একটাই প্রার্থনা—

তিনি যেন রেজাউল করিম রেজাকে তাঁর অসীম রহমতে আচ্ছাদিত করেন, সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেন, কবরকে প্রশস্ত ও নূরময় করে দেন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসকে তাঁর স্থায়ী আবাস বানিয়ে দেন।

তার সহধর্মিণীকে সবর-এ-জামিল, সন্তানদের উত্তম ভবিষ্যৎ এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে ধৈর্য ও শক্তি দান করুন।

ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

ভালো মানুষরা পৃথিবী ছাড়েন নীরবে।

কিন্তু তাদের অনুপস্থিতি অনেক দিন ধরে কথা বলে।

রেজাউল করিম রেজাও হয়তো আর কোনো মিটিংয়ে থাকবে না, কোনো প্রোডাকশন রিপোর্টে তার নাম থাকবে না, কোনো ইঙ্ক্রিমেন্ট লিস্টে নিজের নাম খুঁজবে না। তবু যারা তাকে কাছ থেকে দেখেছে, তাদের স্মৃতিতে সে থেকে যাবে—একজন পরিপাটি, বিনয়ী, কর্মনিষ্ঠ এবং মানুষকে ভালোবাসতে জানা সহকর্মী হিসেবে।

কিছু মানুষের জীবন দীর্ঘ হয় না, কিন্তু তাদের চরিত্র দীর্ঘস্থায়ী হয়।

রেজাউল করিম রেজা সেই বিরল মানুষদের একজন।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৮
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দোষটা কি কপালের, নাকি রক্তের.... :-0 :-ls :#|

লিখেছেন সাইবার সোহেল, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৫১

ঐতিহাসিক ভাবেই মনে হয় এই ভুখন্ড বা এই অঞ্চলের জনগন একটু বেশীই লোভী, আত্নকেন্দ্রিক, আর চরমমাত্রার স্বার্থপর । এবং যুগযুগ ধরে এটা চলমান থাকার কারণে আমাদের রক্তের সাথে মিশে... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাপ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩১



রাজধানী ঢাকা সহ দেশের নানা অঞ্চলে টমটম, অটোরিক্সা, নসিমন, করিমন চলাচল করে। বেশ মানুষজন পরিবহন সহ মালামালের বস্তাও টানাটানি করতে দেখা যায়। কিন্তু এইগুলোর দেশ হচ্ছে গ্রাম গঞ্জের বাজার আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:৪৪


আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না
আমার ডক্টর উপাধিটি মুছে দিও
জ্ঞানী, কবি, দরবেশ, সাধক, সফল, ব্যর্থ
এসব কোনো শব্দই যেন
মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আমাকে আলাদা না করে।

কারণ আমি দেখেছি
অহংকার খুব সূক্ষ্ম... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৮ বছর পর্যন্ত সবাই শিশু!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৫৬

১৮ বছর পর্যন্ত সবাই শিশু!

শিশুর অধিকার রক্ষা অবশ্যই সভ্য সমাজের দায়িত্ব। কিন্তু প্রশ্নটা তখনই কঠিন হয়ে ওঠে, যখন ১৭ বছর ১১ মাস ২৯ দিন বয়সী কেউ ধর্ষণ বা হত্যার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফুনফুনা ফুন

লিখেছেন রাজীব নুর, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৩৩



ছয় হাজার হাজার আগে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিলো মাত্র দশ লাখ।
হ্যা দশ লাখ। পুরো পৃথিবীর সব জায়গায় মানুষ থাকতো না। বনজঙ্গল ছিলো। আর সমুদ্র এবং নদী। পাহাড় পর্বত।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×