somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমরা সবাই সফল হতে চাই, কিন্তু সফলতার দায়িত্ব নিতে চাই না!

০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করছি, যেখানে প্রত্যেকেই সফল হতে চায়, কিন্তু সফলতার জন্য প্রয়োজনীয় পরিশ্রম করতে চায় না। সবাই নিজেকে যোগ্য মনে করে, নিজের দক্ষতার বড়াই করে, কিন্তু বাস্তবে সেই যোগ্যতার প্রমাণ দিতে গেলে অনেকেই পিছিয়ে যায়। আমরা দায়িত্ব পেতে চাই, কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে চাই না। সম্মান পেতে চাই, কিন্তু সম্মান অর্জনের মতো আচরণ করতে চাই না। পরিবর্তন চাই, কিন্তু নিজেকে পরিবর্তন করতে চাই না।

আমরা উন্নতি চাই, কিন্তু পরিশ্রম করতে চাই না। সুখী হতে চাই, কিন্তু সুখের জন্য যে ত্যাগ ও ধৈর্যের প্রয়োজন, তা করতে রাজি নই। ব্যবসা-বাণিজ্যে শুধু মুনাফা চাই, কিন্তু লোকসানের ঝুঁকি নিতে চাই না। রাতারাতি ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখি, অথচ সম্পদ অর্জনের পেছনে যে দীর্ঘদিনের শ্রম, অধ্যবসায়, পরিকল্পনা ও ত্যাগ রয়েছে, তা এড়িয়ে যেতে চাই।

আমরা বিখ্যাত হতে চাই, মানুষের প্রশংসা পেতে চাই, পরিচিতির শীর্ষে পৌঁছাতে চাই। কিন্তু সেই পরিচিতি ও স্বীকৃতি অর্জনের জন্য বছরের পর বছর যে সাধনা, অনুশীলন এবং আত্মনিবেদন প্রয়োজন, সেটি করতে চাই না। আমরা ফলাফল দেখতে আগ্রহী, কিন্তু ফলাফল তৈরির প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে অনাগ্রহী।

কর্মক্ষেত্রেও আমাদের মানসিকতার খুব একটা পরিবর্তন নেই। আমরা সবাই প্রমোশন চাই, ভালো পদ চাই, ভালো বেতন চাই, সামাজিক মর্যাদা চাই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই পদ ও মর্যাদার উপযুক্ত করে নিজেকে কতটা গড়ে তুলছি? নিজের দক্ষতা বাড়াতে কতটা সময় দিচ্ছি? প্রতিষ্ঠানের প্রতি নিজের দায়িত্ব কতটা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করছি?

একজন কর্মী যদি শুধু নিজের বেতন, সুযোগ-সুবিধা ও পদোন্নতির কথা ভাবেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা, গুণগত মান, শৃঙ্খলা ও সামগ্রিক উন্নয়নে নিজের ভূমিকা যথাযথভাবে পালন না করেন, তাহলে তাঁর প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব থেকেই যাবে। একইভাবে একজন ব্যবস্থাপক যদি শুধু অধীনস্থদের কাছ থেকে জবাবদিহি চান, অথচ নিজে দায়িত্বশীল নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন না করেন, তাহলে তাঁর নেতৃত্বও প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য।

আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্কেও একই দ্বিচারিতা স্পষ্ট। আমরা অন্যের কাছ থেকে ভালো ব্যবহার আশা করি, কিন্তু নিজের আচরণে সেই সৌজন্য বজায় রাখতে চাই না। মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান পেতে চাই, কিন্তু অন্যকে ভালোবাসা, সম্মান করা কিংবা তার অনুভূতির মূল্য দিতে অনেক সময় কার্পণ্য করি।

সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য দেখা যায় অধিকার ও দায়িত্বের প্রশ্নে। নিজের অধিকার আদায়ের জন্য আমরা সোচ্চার, প্রয়োজনে আন্দোলন করি, প্রতিবাদ করি, দাবি উত্থাপন করি। কিন্তু অন্যের অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে অনেক সময় নীরব থাকি। নিজের ন্যায্য পাওনা বুঝে নিতে যতটা সচেতন, অন্যের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ততটাই উদাসীন।

একজন শ্রমিক যেমন ন্যায্য মজুরি পাওয়ার অধিকার রাখেন, তেমনি তাঁরও দায়িত্ব রয়েছে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার। একজন মালিক যেমন ব্যবসায়িক মুনাফার অধিকার রাখেন, তেমনি শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও মর্যাদা নিশ্চিত করাও তাঁর দায়িত্ব। একজন নাগরিক যেমন রাষ্ট্রের কাছে সেবা ও নিরাপত্তা প্রত্যাশা করেন, তেমনি রাষ্ট্রের আইন মেনে চলা এবং নিজের নাগরিক দায়িত্ব পালন করাও তাঁর কর্তব্য।

অর্থাৎ অধিকার ও দায়িত্ব একে অপরের পরিপূরক। একটিকে প্রতিষ্ঠা করে অন্যটিকে অবহেলা করলে কখনোই একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়ে উঠতে পারে না।

আমাদের সমাজে এই যে শুধু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু দেওয়ার অনীহা; শুধু প্রত্যাশা, কিন্তু নিজের অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালনে অনাগ্রহ—এটাই ধীরে ধীরে সামাজিক অবিশ্বাস, অসহিষ্ণুতা, বিশৃঙ্খলা ও অশান্তির জন্ম দিচ্ছে। আমরা প্রত্যেকে অন্যের কাছ থেকে পরিবর্তন আশা করছি, অথচ নিজের পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করছি না। ফলে সমস্যা থেকে যাচ্ছে, সংকট বাড়ছে, কিন্তু সমাধানের পথে আমরা এগোতে পারছি না।

বাস্তবতা হলো, সফলতা কোনো শর্টকাটের পুরস্কার নয়। এটি দায়িত্ব, পরিশ্রম, ধৈর্য, সততা এবং ধারাবাহিক আত্মউন্নয়নের সম্মিলিত ফল।

দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়ে কখনো দায়িত্বশীল হওয়া যায় না। বরং দায়িত্ব পালন করতে করতেই একজন মানুষ দায়িত্বশীল হয়ে ওঠেন। ছোট দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে পারলেই বড় দায়িত্বের উপযুক্ততা তৈরি হয়। একইভাবে পরিশ্রম ছাড়া দক্ষতা তৈরি হয় না, আর দক্ষতা ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী সফলতা অর্জন করা কঠিন।

তাই শুধু ভালো পদ পাওয়ার স্বপ্ন দেখলে হবে না, সেই পদের উপযুক্ত হতে হবে। শুধু ভালো বেতনের প্রত্যাশা করলে হবে না, নিজের দক্ষতা ও কর্মদক্ষতা বাড়াতে হবে। শুধু সম্মান দাবি করলে হবে না, নিজের আচরণ ও কাজের মাধ্যমে সম্মান অর্জন করতে হবে। শুধু অধিকার আদায়ের কথা বললে হবে না, অন্যের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও সমানভাবে সোচ্চার হতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, পৃথিবীতে কেউ শুধু দাবি করে বড় হননি। বড় হয়েছেন নিজের কাজ, দায়িত্ববোধ, ত্যাগ ও অবদানের মাধ্যমে।

আমরা যদি সত্যিই ব্যক্তি, পরিবার, কর্মক্ষেত্র, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নতি চাই, তাহলে প্রথমে নিজের জায়গা থেকে পরিবর্তন শুরু করতে হবে। অন্যের ভুল খোঁজার আগে নিজের দায়িত্ব পালনের হিসাব নিতে হবে।

কারণ, আমরা সবাই যদি শুধু পাওয়ার প্রত্যাশা করি, তাহলে দেওয়ার মানুষ থাকবে না। সবাই যদি নেতৃত্ব দিতে চাই, কিন্তু দায়িত্ব নিতে না চাই, তাহলে নেতৃত্বের সংকট তৈরি হবে। সবাই যদি অধিকার দাবি করি, কিন্তু অন্যের অধিকার নিশ্চিত না করি, তাহলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না।

পরিশেষে, সফল হতে চাইলে শুধু স্বপ্ন দেখলেই চলবে না, স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্বও নিতে হবে। যোগ্য হতে চাইলে শুধু যোগ্যতার দাবি নয়, যোগ্যতা অর্জনের সাধনাও করতে হবে।

মনে রাখবেন, দায়িত্ব আপনাকে যোগ্য করে, পরিশ্রম আপনাকে সফল করে, আর অন্যের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি সম্মান আপনাকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×