
আমি ব্যক্তিগত জীবনে অনেকজনকেই দেখেছি অল্পতেই কারো কথায় বা ইশারায় প্রভাবিত হয়ে পরে। কেউ হয়তো বল্লো "জানো অমুকে না খুব ভালো বা তমুকে খুবই খারাপ"। আমরাও সাথে সাথে ভেবে নেই "হ্যা, হ্যা তাইতো তাইতো সে তো আসলেও সত্যি খুব খারাপ বা দারুণ একজন ভালোলোক"। এখানে কি আমাদের বিচার বিবেচনা না করেই এমন কিছু বিশ্বাস করা উচিত? নাকি অনুচিত! আমাদের নিজস্ব যৌক্তিক চিন্তা ভাবনা কি লোপ পায় মানুষের একটি কথায়!
এই একটিমাত্র কারনে বাস্তব এবং ভার্চুয়াল দুই জগতের অনেক প্রিয় বন্ধুদের সাথে আমার এক তরফা সম্পর্কের সাময়িক অবনতি হয়েছে, হয়েছে মনমালিন্য যা আমার জন্য অনেক কষ্টকর, অবশ্য পরে তারা তাদের দোষগুলো অনুধাবন করতে পারে এই যা স্বস্তি ।
এ ব্যাপারে দুটো উদাহরণ দিই তাহলেই সবার বুঝতে সুবিধা হবে বলে মনে করি।
বেশ কয়েক বছর আগের কাহিনী, আমার শিক্ষাজীবনের বন্ধুদের নিয়ে ফেসবুকে একটা গ্রুপ ছিল। সেই গ্রুপে আমি বাদে আমার কিছু ক্লোজ বন্ধু সারাক্ষণ বেহুদা আলাপচারিতা যাকে ইংরেজিতে বলে ট্রল তো সেই ট্রলিং তারা চালিয়েই যাচ্ছিল যাকে বলা যায় সীমা অতিক্রম করে। আমি জানি কোথায় থামতে হয়, তাই আমি থেমে গেছি সময় মতই। যাই হোক এক পর্যায়ে আমাদের গ্রুপ এডমিন এই ব্যাপারে একটা নোটিশ জারী করলো যার মূল বক্তব্য ছিল আমরা সবাই শিক্ষিত এবং আমাদের সবার লেখায় একটা আত্মমর্যাদা এবং শালীনতা থাকা চাই,এ ব্যাপারে সবার সহযোগিতা কাম্য।
এখানে সে কারও নাম উল্লেখ করেনি । কিন্তু চোরের মন পুলিশ পুলিশ। এখন যে কয়েকজন চোর ছিল তারা ঘোষণা দিল এই গ্রুপ তারা বর্জন করবে, আর আমাকেও তারা চাপ দিতে লাগলো গ্রুপ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য। আমি বললাম কেন! সেতো কারো নাম বলে নাই, আর খারাপ কিছুও বলে নাই তাহলে কেন আমরা নিজেরা নিজেদের গায়ে কাদা মাখবো! যাই হোক গ্রুপ থেকে তারা বেরিয়ে তো গেলই এবং প্রথম অবস্থায় আমার উপর প্রচন্ড মনক্ষুন্ন হলেও পরে উপলব্ধি করেছে আমি ঠিক ছিলাম। আমি নিজে যেমন নিজের আচার আচরণকে বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করি তেমনি অন্যের আচরণকেও।
দ্বিতীয় কাহিনী বাস্তব জীবনের। আমার ছেলে উন্নত বিশ্বের এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র। প্রথম প্রথম যাওয়ার পর আমার হাজবেন্ডের এক বন্ধু তার সাথে দেখা করতে আসে। সাথে চাল ডাল থেকে ঘটিবাটি সব নিয়ে আসে যাতে প্রাথমিক অবস্থায় সে চলতে পারে। ইমেইলে তার সিভি নিয়ে ভদ্রলোক বিভিন্ন জায়গায় পাঠায়।
কিন্ত কোভিড পরবর্তী অবস্থায় চাকরির বাজার ছিল সীমিত। সাত দিনের দিন উনি শেষ পর্যন্ত কোথাও কিছু না পেয়ে তার নিজের দোকানেই আমার ছেলেকে ঘন্টায় ১০ ডলার করে ৮ ঘন্টার কাজ দেয়। কিন্ত প্রথম দিন থেকেই সে আমার ছেলের উপর দুর্ব্যবহার করতে থাকে। বাসায় ফিরে যখন সে এগুলো আমাদের বলেছে যা শুনে আমরা স্বামী স্ত্রী ভীষণ আপসেট হয়ে পরি। আমার ছেলে সোনার চামচ মুখে না নিয়ে জন্মালেও অনেক আদরে আহ্লাদেই বড় হয়েছে। আমার স্বামী যে কিনা দিনে কমপক্ষে দুই বার সেই বন্ধুর সাথে গল্প করতো ফোনে সে কথা বলা ট্যোটালি স্টপ করলো।
কিন্ত এই ঘটনা বা ছেলের কথায় আমি সাথে সাথে প্রভাবিত হইনি, বার বার আমার ছেলেকে বুঝাই "কাজ না করলে না করো, ভালোভাবে বলে কয়ে ছেড়ে দিয়ে আসো কিন্তু তাকে খারাপ ভেবো না। হয়তো তার পারিবারিক কোন সমস্যা আছে, বা উনি মানসিক ভাবে অসুস্থ কারন তার একমাত্র অল্প বয়সী সন্তানটি কিছুদিন আগে মারা গেছে তার জন্য হয়তো মন খারাপ"। তিনদিনের দিন উনি আমার ছেলের সাথে এমন ভয়ংকর দুর্ব্যবহার করলো যে আমার ছেলে কাজ ছাড়ার কথা বললে সে জানালো "তোমাকে আমার দরকার ছিল না শুধু তোমার আব্বুর কথা ভেবে তোমাকে আমি রেখেছিলাম"। এতবড় অপমান আমরা তো বাদই আমাদের ছেলেও কখনো হয় নি।
এই ঘটনার মাস ছয়েক পরে মানে দুদিন আগে আমার ছেলে কথায় কথায় বলছে "আম্মু জানো এখানে ইকোনমিক রিসেশন এমন পর্যায়ে যে মানুষ ১০ ডলার খরচ করতে দশবার ভাবে। এখন আমি চিন্তা করি জামিল (ছদ্মনাম) আংকেল মনে হয় আব্বুর জন্য বাধ্য হয়েই আমাকে কাজ দিয়েছিল তার দোকানে। তার লোক ছিল, আমাকে তার দরকার ছিল না। ঘন্টায় ১০ ডলার করে প্রতিদিন ৮ ঘন্টা কাজের জন্য উনি তিন দিনে মোট ২৪০ ডলার আমাকে দিয়েছিল। জানো এই তিনদিনে তার বিক্রি হয়েছিল মাত্র একশ ডলার"।
আমি বললাম তুমি একদিন গিয়ে দেখা করে এসো, তোমার উপকার তো কিছুটা হলেও উনি করেছেন।
ছেলে বল্লো "যাবো সামনের ছুটিতে"।
ছেলের মুখের কথা অর্থাৎ এক পক্ষের কথা শুনেই ভদ্রলোকের প্রতি আমার ছেলের ভেতর ঘৃনার মনোভাব উদ্রেকে আমি উৎসাহিত বা সহায়তা করি নি।
ছবি সুত্র আমার মোবাইলে আমার তোলা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

