somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ক্ষণিকের দেখা, এ মায়াময় ভুবনে - ৬

০১ লা নভেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৭:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভ্রান্তিযজ্ঞ

২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাস। উত্তরা ক্লাবে শুভমিতা আর রুপঙ্কর এর মঞ্চসঙ্গীত শুনছিলাম সস্ত্রীক এবং সবান্ধবে, একাগ্রচিত্তে, বেশ আনমনা হয়েই। আমার আসনটি ছিল একেবারে ‘আইল’ এর কিনারায়, তৃতীয় সারিতে। হঠাৎ সামনের সারি থেকে লাল পোষাকে সজ্জিতা এক তরুণী উঠে এল। ভেবেছিলাম হয়তোবা সে পেছনের দিকে যাবে, যেখানে চা-কফি ইত্যাদির আয়োজন ছিল। কিন্তু না, মেয়েটি আমাকে অতিক্রম না করে, আমাকে অনেকটা চমকে দিয়ে হঠাৎ করেই আমার পা ছুঁয়ে সালাম করলো। সে সময়ে মঞ্চে গান গাচ্ছিলেন শুভমিতা, আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল শিল্পীর গায়কির প্রতি, তাই মেয়েটির মুখের দিকে তাকানো হয়নি। সালাম করা দেখে অনুমান করে নিয়েছিলাম, হয়তো পরিচিত কোন আত্মীয়া হবে সে। সালাম শেষে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মেয়েটি বললো,"নাজীব মামা না?" ততক্ষনে আমি বুঝে গেছি যে সে ভুল করেছে; সেও বুঝে গেছে আমি তার 'নাজীব মামা' নই। মেয়েটি 'স্যরি' বলে দ্রুত প্রস্থান করলো, আমিও অনেকটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। পাশে বসা আমার স্ত্রী ঘটনার আকস্মিকতায় অবাক হয়ে একবার আমার দিকে, আরেকবার তরুণীটির দিকে তাকাচ্ছিল। বন্ধু এবং তার স্ত্রীও এই নিয়ে একটু মুখ টিপে হাসলো। কিছুক্ষণ পর মেয়েটি তার মা সহ পুনরায় এলো। তারা উভয়েই পরিচিতির এই ভ্রান্তিযজ্ঞে কিছুটা বিব্রত হলেও, হাস্যকৌতুকের ছলে ব্যাপারটা হাল্কা করে দিল। আমিও এই ভ্রান্তিবিলাসটুকু বেশ উপভোগ করলাম। অনুষ্ঠানশেষে বের হওয়ার সময় পুনরায় মেয়েটির দেখা পেয়েছিলাম। কাছে ডেকে তাকে বলেছিলাম, আমি 'নাজীব মামা' না হলেও একজন অনাত্মীয় মামা হিসেবে তার প্রতি আমার আশীর্বাদ রইল।

বেঙ্গল বাম

সে বহুদিন আগের কথা, আমি তখন পঁচিশ বছরের যুবক, রংপুর সেনানিবাসে কর্মরত। কোন পূর্বাভাস ছাড়াই একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি মেঝেতে পা ফেলতে পারছি না। বাম পায়ের গোড়ালির ঠিক একটু উপরে ভীষণ ব্যথা। ডাক্তারের পরামর্শ মত ব্যথানাশক ঔষধ খাওয়া শুরু করলাম। প্রথমে দুই একদিন অল্প ডোজের প্যারাসিটামল জাতীয় ব্যথানাশক, তার পরেও কাজ না হওয়াতে ব্রুফেন বা আইবুপ্রফেন জাতীয় উচ্চ ডোজের এ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি এ্যানালজেসিকস খাওয়া শুরু করলাম। এতে সাময়িক উপশম হচ্ছিল বটে, কিন্তু ৫/৬ ঘন্টা পর পর ব্যথার পুনরাবৃত্তি হতো এবং ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যথা অনুভব করতে থাকলাম। অবস্থা বেগতিক দেখে রংপুর সিএমএইচে ভর্তি হ’লাম। সেখানে নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষার পর চিকিৎসা চলতে থাকলো, কিন্তু ব্যথার স্থায়ী কোন উপশম হচ্ছিল না। দিনে তাও ব্যথা মোটামুটি সহনীয় থাকে, কিন্তু রাত বাড়ার সাথে সাথে ব্যথা তীব্র হয়। যেখানে ব্যথা হতো, সে জায়গাটা লাল হয়ে সামান্য ফুলে যেত এবং শরীরের অন্যান্য অংশের চেয়ে গরম হয়ে থাকতো। মাঝে মাঝে ব্যথা এত তীব্র হতো যে রাতে বিছানায় বসে বিনিদ্র রাত কাটাতে হতো।

প্রতিদিন সকালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রাউন্ডে এসে আমাকে স্মিতহাস্যে জিজ্ঞেস করতেন, ‘আজ কেমন আছেন’? আমি চেষ্টা করতাম বলতে যে ভাল আছি, কিন্তু আমার চেহারা আর পায়ের দিকে তাকিয়ে উনি বুঝতে পারতেন যে আমি ভালো নেই। কিছুক্ষণ ব্যথার জায়গাগুলো স্পর্শ করে এবং রিপোর্টগুলো পর্যালোচনা করে তিনি গম্ভীর মুখে বলতেন, এটা এক ধরণের আন-স্পেসিফাইড আর্থ্রাইটিস, সারতে কিছুটা সময় নেবে। আমি মেনে নিতাম এবং উনি চলে গেলে আমার পাশের বেডের রোগীর সাথে গল্পে যোগ দিতাম। মেডিক্যাল এ্যাসিসট্যান্ট সময় মত এসে ঔষধ দিয়ে যেত। ঔষধে কোন কাজ হচ্ছিল না বলে খেতে ইচ্ছে হতো না, তবুও খেতাম। রাতের শিফটে ডিউটিতে আসতো অস্থায়ী ভিত্তিতে সদ্য নিয়োগ পাওয়া এক তরুণ ওয়ার্ডবয়। চেহারায় তার দারিদ্র্যের ছাপ সুস্পষ্ট, কিন্তু মুখে একটা সারল্যের হাসি লেগে থাকতো। রাতে আমার ব্যথা বেড়ে যাওয়াতে সে আমাকে ঘন ঘন দেখতে আসতো। তার সাথে আমি অনেক গল্প করতাম, সেও অকৃত্রিম সারল্যে আমাকে তার জীবনের গল্প বলে যেত। তার নাম ধাম আজ মনে নেই, কিন্তু চেহারাটা স্পষ্ট মনে আছে। আজও আমি তাকে দেখলে চিনতে পারবো। সে শুধু আমাকে বলতো, স্যার পায়ে ‘বেঙ্গল বাম’ মালিশ করেন। আমি তাকে মায়া করতাম বলে তার কথাটাকে একেবারে উড়িয়ে না দিয়ে একটু হেসেই বলতাম, “এতবড় ডাক্তার আমাকে প্রতিদিন দেখে যাচ্ছেন, সেটাতে ভাল হচ্ছিনা, আর তোমার ‘বেঙ্গল বাম’ মেখে আমি ভালো হবো”? সে একটুও দমে না গিয়ে বলতো, “স্যার, আমার বাবারও এ রোগ হয়েছিল, তিনি ‘বেঙ্গল বাম’ মেখে ভালো হয়ে গেছেন”।

আমার ব্যথার উপশম হচ্ছেনা দেখে সে একদিন রাতে আমাকে বললো, “স্যার আমি আজ একটা ‘বেঙ্গল বাম’ নিয়ে এসেছি, আপনি একটু মেখে দেখেন”। ব্যথার তীব্রতায় ভুগতে ভুগতে নমনীয় হয়ে আমি একটু নিমরাজী ভাব প্রকাশ করলাম। আমি বিছানায় বসে পায়ের গোড়ালিতে এবং পাতায় হাত বুলাচ্ছিলাম, এতে একটু আরাম হচ্ছিল। সে বললো, “স্যার, আপনি বালিশে মাথা রেখে শুয়ে পড়েন এবং পায়ের গোড়ালিটা কম্বল থেকে একটু বের করে রাখেন, আমি মালিশ করে দিচ্ছি”। আমি তাই করলাম। সে খুব সুন্দরভাবে আলতো করে মালিশ করা শুরু করলো। আমি কিছুটা উপশম বোধ করতে করতে নিদ্রার কোলে ঢলে পড়লাম। সেদিন এক ঘুমে সকাল হয়েছিল। ভোরবেলা আমাকে ঘুমন্ত রেখেই সে ডিউটি শেষ করে বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। যাবার আগে সে ‘বেঙ্গল বাম’ এর কৌটোটা আমার বেডসাইড ড্রয়ারে রেখে যেতে ভুলেনি।

কথায় বলে, ‘বিশ্বাসে স্বর্গ মেলে, তর্কে বহু দূর’! জানি, আজকের এ বিজ্ঞানের যুগে এমন কথা বলাটা শুধু হাস্যকরই নয়, নিদারুণ বেকুবিও বটে। অনেকদিন পর সে রাতে আমি ভালো করে ঘুমিয়েছিলাম। পরের দিনটা আগের দিনগুলোর চেয়ে বেশ ভালো ছিলাম। পরের রাতে সে ছেলেটি আবার ডিউটিতে এসে প্রথমেই আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, “স্যার আজ কেমন আছেন”? আমাকে কিছু বলতে হলোনা, সে নিজেই বললো, “দেখে তো মনে হয় আজ আপনি আগের চেয়ে কিছুটা ভালো আছেন”। আমি হেসে বললাম, ‘যেমন দেখছো, তেমনই আছি’। এর পরে আরও সপ্তাহ খানেক হাসপাতালে ছিলাম। আমি সেই তরুণ ওয়ার্ডবয়ের প্রেস্ক্রিপশন অনুযায়ী নিজেই নিজের পায়ে ‘বেঙ্গল বাম’ মালিশ করে যাচ্ছিলাম। প্রতিদিনই একটু একটু করে অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল। হাসপাতালের দেয়া ঔষধের কোন পরিবর্তন হয়নি, একই ঔষধ খাচ্ছিলাম, তবে গোপনে যোগ হয়েছিল সেই ছেলেটির দেয়া ‘বেঙ্গল বাম’ এর মালিশ। কোনটিতে কাজ হয়েছিল জানি না; হয়তো ঔষধে, নয়তো ‘বেঙ্গল বাম’ এ। কিংবা কোন ঔষধ না খেলেও হয়তো এমনিতেও ভালো হয়ে যেতাম। তবে মন বলে, সেদিন বিশ্বাস করে সেই ছেলেটির ‘বেঙ্গল বাম’ মালিশ করার পর থেকেই না আমি প্রথম ব্যথার উপশম অনুভব করেছিলাম। তারও দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, ‘বেঙ্গল বাম’ মাখলে আমি ভালো হয়ে যাবো। জগতের অনেক অদৃশ্য সমীকরণ বোঝাটা অনেক সময় মানুষের সাধ্যের অতীত। আমি তার কোন স্বজন ছিলাম না। আমার ব্যথার উপশম করানোটা তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তথাপি সে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে আমাকে কিছুটা রিলিফ দিতে এগিয়ে এসেছিল, শুধুমাত্র ভক্তি এবং মায়ার বশবর্তী হয়ে। হাসপাতাল ত্যাগের পরে সেই ছেলেটির সাথে জীবনে আর কখনো দেখা হয়নি, হয়তো হবেও না। কয়েক বছর পরে একদিন খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, সে ঐ চাকুরি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে, কারণ তার চাকুরিটি পার্মানেন্ট ছিল না। কিন্তু তার দয়ার কথা আমার পক্ষে ভোলা কখনো সম্ভব নয়। সে আজ যেখানেই থাক, আল্লাহ যেন তাকে ভালো রাখেন সুস্বাস্থ্যে, সপরিবারে!



ঢাকা
২৪ অক্টোবর ২০২১
শব্দ সংখ্যাঃ ৯৯৭

সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২২ রাত ১১:১৭
১৬টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জাপান যেভাবে মাত্র ৭ বছরে অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭



জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হায়াতো ইকেদা ১৯৬০ সালের শেষভাগে তাঁর বিখ্যাত "ইনকাম ডাবলিং প্ল্যান" বা "আয় দ্বিগুণকরণ পরিকল্পনা" চালু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জাপানের অর্থনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে হেরে যাচ্ছি ০২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৪


কাহিনীটা ৯০ এর দশকের শুরুতে। বুশ তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট- মার্কিনিদের আগ্রাসন চলছে তখন ইরাক জুড়ে। হাটে মাঠে ঘাটে আড্ডায় গল্প আলোচনা মিডিয়ায় এমনকি বাসর ঘরেও তখন নব পরিণীতার সাথে তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাতিসত্তার পরিচয়ের বাজার

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:২১

ইতিহাসে কোনো আদর্শ সত্যিকার অর্থে মরে না। সে শুধু নাম বদলায়, পরাজিত আদর্শেরও পুনর্জন্ম হয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ একটি আসনও পায়নি। কিন্তু সেই রাতে মুসলিম লীগ মরেনি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটা ছিলো সোনার কণ‍্যা, মেঘ বরন কেশ!!!!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ ভোর ৬:১৩



শাওন প্রশ্ন করেছিলে ৭৮ বছর বয়স্ক একজন মহিলার। অন্তর্বাস উচিয়ে যখন অন্তর্জালে দাঁত মুখ খিচিয়ে উল্লসিত বহু পোস্টে ভেসে যায় ।কিংবা দেয়ালে সরাসরি দি লিখে প্রচার করছিলো তখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘ছুটি’র স্মৃতি

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৫০

(প্রায় দু’মাস আগে লেখা। তখন গ্রীষ্মকাল হলেও ঢাকায় কয়েকদিন পরপর বৃষ্টি হতো। এখনকার মত “ঘাম ঝরে দরদর” ধরণের গরম ছিল না। রাতগুলো তুলনামূলকভাবে বেশ ঠাণ্ডা থাকতো।)

আজ খুব ভোরে (শেষরাতে)... ...বাকিটুকু পড়ুন

×