somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রুবাই প্রসঙ্গ

২৬ শে জুন, ২০২৩ দুপুর ২:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

’রুবাই’ শব্দটি আরবী। এর মানে ’চতুষ্পদী’। ’রুবাই’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে ’আরবা’ (চার) থেকে। সোজা কথায় রুবাই মানে চার লাইন বা পংক্তির কবিতা। শব্দটি আরবী থেকে এলেও রুবাইয়ের কাব্যখ্যাতি ফারসী কবিতার কারণেই। ’রুবাই’-এর বহু বচন ’রুবাইয়াত’।

পারস্য তথা ইরানের সাহিত্যে ব্যবহৃত ফর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে মহাকাব্য, মসনবী, ক্বাসিদা, গজল, রুবাই, ক্বিতা, দু’য়া বায়িত (আরেক ধরনের চার লাইনের কবিতা) ইত্যাদি। জানা অজানা বহু কবিই রুবাই রচনা করেছেন। রুবাইয়ের সূচনা মহাকবি আবুল কাশেম ফেরদৌসীর হাতে। বর্তমানে আমরা রুবাই বলতে যা বুঝি তার সাথে সে রুবাইয়ের মিল অতিসামান্য। মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমী এবং শেখ মুসলেহ উদ্দীন সাদীও কিছু রুবাই লিখেছেন। রুমীর ভাবগুরু ফরিদ উদ্দীন আত্তার চার লাইন বিশিষ্ট কবিতার একটি সঙ্কলন প্রকাশ করেছিলেন। দরবেশ কবি বাবা তাহির চার লাইনের যে কবিতাগুলো লিখেছেন সেগুলো দু’য়া বায়িত বা দুবাইতি নামে পরিচিত। রুবাইয়ের সাথে এর মাত্রা সংখ্যার পার্থক্য আছে। তবে রুবাই রচয়িতা হিসাবে হাফিজ আর ওমরই বেশি পরিচিত। কাব্যবিশ্বের চোখে ওমর খৈয়ামই হলেন রুবাই জগতের কুতুব মিনার। প্রায় হাজার বছর আগে এইসব মহাকবির হাতে রুবাই কবিতার ফর্ম হিসাবে তুঙ্গ স্পর্শ করেছে।

রুবাইতে বিষয়বস্তুর ব্যাপক বৈচিত্র্যের মধ্যেও জাম/সুরা/সাকি এক অনিবার্য অনুষঙ্গ। রুবাই আকারে ছোট হলেও উঁচুদরের দার্শনিক কবিতা। মূলত: সুফিবাদ এর প্রধান অনুষঙ্গ।

রুবাইয়ের আরেকটি বড়ো বৈশিষ্ট্য এর দ্ব্যর্থকতা। পড়তে গিয়ে আক্ষরিক একটা অর্থ মিলবে। এরপর ভাবের জগতে ডুব দিলে মিলবে অন্য এক গভীর অর্থ। তাই সুরা/সাকির রোমান্টিকতার আক্ষরিক রূপের পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য মানে। ফলে গুণীজনরা সাকির মধ্যে মুর্শিদকে খুঁজে পান যিনি ’জাম’(সুরা পাত্র)-এর মধ্যে মাধ্যমে আনন্দরূপ সুরা (দিব্যজ্ঞান) পরিবেশন করেন। সে সুরা পানে ভক্তহৃদয় আনন্দে আপনাতে বিভোর হয়ে যান। তাঁরা সুরার মাধ্যমে আনন্দে বিভোর হয়ে দিব্যজ্ঞানকে খুঁজে পান। স্রষ্টারূপ মদিরায় ডুবে স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের অনুভূতি হয় যেন তাঁদের। যেমন হয়েছিলো মনসুর হাল্লাজের ’’আনাল হক’’ বিলাপের সময়।

রুবাই রচয়িতাগণ জীবনের গভীর দর্শণকেই মূল অবলম্বন হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। তবে রুবাইয়ের নানা শ্রেণীকরণও করা হয়েছে বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে। বিশেষ করে ওমরের রুবাইকে গুনীরা ৬ ভাগে ভাগ করে থাকেন - ১। শিকায়াত-ই-রোজগার (অদৃষ্টের প্রতি অনুযোগ), ২। হজও (ভণ্ডদের প্রতি বিদ্রুপ), ৩। ফিরাফিয়া ও ওয়াসালিয়া (প্রিয়ার বিরহ/মিলনাত্মক), ৪। বাহরিয়া (বসন্ত ও এর অনুষঙ্গ বিষয়ক), ৫। কুফরিয়া (ধর্মশাস্ত্রকে সমালোচনামূলক) ও ৬। মুনাজাত (প্রার্থনামূলক)

রোমান্টকি বাংলা কবতিার ধারায় বৈষ্ণব পদাবলী ও তার সমকালীন কবতিার একটি স্বতন্ত্র ও গভীর তাৎর্পয আছ। তার সাথে ফারসী রুবাই এবং র্উদু শের-এর বাংলা অনুবাদ নতুন মাত্রা যুক্ত করছিলো। রসিক পাঠক মাত্রই এগুলোর খাঁটি সমঝদার। কেননা, এদশেরে গান ও কবিতাপ্রিয় মানুষের মনে তীক্ষ্ণবুদ্ধি এবং তীব্র আবেগের মিশেলে রোমান্টকিতা, আধ্যাত্মকিতা আর মরমিয়াবাদ গলাগলি করে আছে।
ইউরোপীয় রোমান্টকিতা আধুনিক বাংলা কবিতায় বহুল চর্চিত। বাংলা কবিতারর সকল রথী মহারথীর হাতেই এর পরিপুষ্টি ঘটেছে। তারপরও সব কালেই রুবাই এবং শের-এর বাংলা অনুবাদের প্রতি পাঠকের আলাদা টান লক্ষ করা গেছে। কান্তি ঘোষ, নরেন দেব প্রমুখ ওমরের রুবাই ফিটজেরাল্ডের ইংরেজি অনুবাদ অবলম্বনে বাংলায় অনুবাদ করেছেন এবং কক খখ অন্ত্যমিল ব্যবহার করেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম রুবাই অনুবাদ করছেনে মূল ফারসী থেকে এবং মূল কবিতার অনুরূপ কক খক অন্ত্যমিল ব্যবহার করেছেন। কেউ কেই রুবাইকে ফর্ম হিসাবে বাংলা ভাষা মৌলিক রুবাই রচনা করেছেন।

অনুবাদের ক্ষেত্রে অনুবাদকের নিজস্বতার ছাপ দেখা যায়। ওমরের একটি রুবাই অনুবাদ নমুনা হিসাবে পেশ করা যায়। ওমরের মূল রুবাইটি হলো-
"মা ল'বতেগানীম ও ফলকে ল'বতেবায
আয রুয় হাকিকাতি নাহ্ আয রুয় মজায
এক চান্দ দর ইন বেসাত বাজী কারদিম
রফতিম বেহ সন্দুকে আদম এক এক বায।

ইংরেজ কবি এডোয়ার্ড ফিটজেরাল্ড অনুবাদ করার সময় মূল অন্ত্যমিলের নিয়ম মেনেছেন-

Tis all a Chequer-board of Nights and Days

Where Destiny with Men for Pieces plays:

Hither and thither moves, and mates, and slays,

And one by one back in the Closet lays.

কান্তি ঘোষ ফিটজেরাল্ডের অনুবাদ অবলম্বনে অনুবাদ করার সময় বাক্যগুলো ভেঙেছেন এবং ককখখ অন্ত্যমিল ব্যবহার করেছেন-

ছকটি আঁকা সৃজন ঘরের

রাত্রী দিবা দুই রঙের,

নিয়ৎ দেবী খেলছে পাশা

মানুষ ঘুঁটি সব ঢঙের;

প'ড়ছে পাশা ধ'রছে পুনঃ,

কাটছে ঘুঁটি, উঠছে ফের—

বাক্সবন্দী সব পুনরায়,

সাঙ্গ হ'লে খেলার জের ৷

কাজী নজরুল মূল ফারসি থেকে অনুবাদ করেছেন এবং মূল অন্ত্যমিল বজায় রেখেছেন-

আমরা দাবার খেলার ঘুঁটি, নাইরে এতে সন্দ নাই!

আসমানী সেই রাজ-দাবাড়ে চালায় যেমন চলছি তাই ৷

এই জীবনের দাবার ছকে সামনে পিছে ছুটছি সব

খেলা শেষে তুলে মোদের রাখবে মৃত্যু-বাক্সে ভাই!

এ পর্যন্ত শতাধিক গুণী ওমরের রুবাই বাংলায় অনুবাদ করেছেন। সৈয়দ মুজতবা আলী নজরুলের রুবাই অনুবাদ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, কাজীর অনুবাদ সকল অনুবাদের কাজী।

অনেক গুণী বাংলায় মৌলিক রুবাই লিখেছেন। ড. সৈয়দ আজিজ লিখেছেন-
'দুইয়ে দুইয়ে চলছে খেলা নিরবধি
দুইয়ের স্রোতে একই ধারায় বইছে নদী
দেহের ভিটা উথলে উঠে ভাঙছে শুধু
মুক্তি হবে যুক্তি এসে কাঁদায় যদি।’





সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুন, ২০২৩ দুপুর ২:৫৮
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বইমেলার কবিতার বই: পাঁচ বছরে বাজারে এসেছে প্রায় ছয় হাজার, মান নিয়ে বিতর্ক

লিখেছেন এম ডি মুসা, ০৩ রা মার্চ, ২০২৪ সকাল ১১:৫২

তবে কবিতার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন গবেষণারাও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বায়তুল্লাহ কাদেরী বলেন,হ্যাঁ, কবিতার মান ঠিক নেই। কিন্তু এখন মান দেখার তো লোক নেই। যার যেমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোরআনের যে দ্বন্দ্বগুলোর সমাধান নেই।

লিখেছেন কবি হাফেজ আহমেদ, ০৩ রা মার্চ, ২০২৪ দুপুর ১২:০১

এসবের উত্তরে গোজামিল দিয়েছেন খোদ খলিফা আলী নিজে।


কোরআনের সূরা আল-নিসার ১১-১২ নাম্বার আয়াত অনুসারে কেনো সম্পত্তির সুষ্ঠু বন্টন করা সম্ভব হয় না? [যখন একজন ব্যাক্তি শুধুমাত্র ৩ বা ততোধিক কন্যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

পবিত্র মাহে রমজানের প্রস্তুতি -ঈষৎ সংশোধিত পুনঃপোস্ট

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৩ রা মার্চ, ২০২৪ দুপুর ১২:৫৩

পবিত্র মাহে রমজানের প্রস্তুতি

ছবিঃ অন্তর্জাল হতে সংগৃহিত।

প্রাককথনঃ

দেখতে দেখতে পবিত্র মাহে রমজান-২০২৪ আমাদের দোড়গোড়ায় এসে উপস্থিত। রমজান, মুমিনের জীবনের শ্রেষ্ঠতম আনন্দের ক্ষণ, অফুরন্ত প্রাপ্তির মাস, অকল্পনীয় রহমতলাভের নৈস্বর্গিক মুহূর্তরাজি। রমজান... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাপ-মেয়ের দ্বৈরথ

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০৩ রা মার্চ, ২০২৪ সন্ধ্যা ৬:৫৩


আমার দাদির ঝগড়াঝাঁটির স্বভাব কিংবদন্তিতুল্য ছিল। মা-চাচীদের কাছ থেকে শোনা কষ্ট করে রান্নাবান্না করলেও তারা নাকি নিজে থেকে কখনও মাছ-মাংস পাতে তুলে খেতে পারতেন না। দাদি বেছে বেছে দিতেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

বৃষ্টি খাতুনই অভিশ্রুতি, এনআইডিতে নাম সংশোধনের আবেদন করেছিল। ধর্মান্তরিত হওয়ার পিছনে দায়ী কে?

লিখেছেন এম ডি মুসা, ০৩ রা মার্চ, ২০২৪ রাত ৮:৩৩





বেইলি রোডের সেইদিনের অগ্নিকাণ্ডে নিহত অভিশ্রুতি শাস্ত্রীর প্রকৃত নাম বৃষ্টি খাতুন। অভিশ্রুতি ও বৃষ্টি খাতুন নামে দুইজন একই ব্যক্তি বলে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ সূত্রে নিশ্চিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×