শিবলী নোমান, রাজশাহী ব্যুরো
উত্তরের প্লায়স্টোসিন চত্বরভূমি 'বরেন্দ্র' অঞ্চলের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭ হাজার ৭৭০ বর্গকিলোমিটার। বিস্তৃত এই অঞ্চলটির ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য একেবারেই আলাদা। এই অঞ্চলের কৃষি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও কৃষি মরতে বসেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে খরার প্রকোপ বাড়তে থাকায়। ১৪টি গবেষণা প্রতিবেদনে এমন আশঙ্কার কথাই ওঠে এসেছে। সম্প্রতি রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত উত্তরবঙ্গ খরা সম্মেলনে এসব গবেষণা প্রতিবেদনে বরেন্দ্রভূমির কৃষি বাঁচাতে পুকুর ও খাঁড়ি সংস্কারের তাগিদ দেওয়া হয়। দু'দিনব্যাপী তারা সম্মেলনের আয়োজন করে বরেন্দ্র ক্যাম্পেইন গ্রুপ ও রাবি ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগ। সহায়তা করে সিএসআরএল, অক্সফাম ও গ্রো। এদিকে এই ১৪টি গবেষণা প্রতিবেদনের বাইরে উত্তরবঙ্গ খরা সম্মেলনে গৃহীত হয় কাঁকনহাট ঘোষণা। বরেন্দ্রভূমি রক্ষায় রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার কাঁকনহাট এলাকায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনের শেষ অধিবেশনে কাঁকনহাট ঘোষণায় ৭টি দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হলো : বরেন্দ্র এলাকার খাস খাঁড়ি ও পুকুর দরিদ্র মানুষের অনুকূলে বন্দোবস্ত প্রদান, অপরিকল্পিত গভীর নলকূপ স্থাপন বন্ধ করা, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ, বহুজাতিক কোম্পানির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ে আইন প্রণয়ন করা, আঞ্চলিক সেচ ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত করেতে জাতীয় সেচ নীতিমালা প্রণয়ন ও জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ করে খরাপীড়িত এলাকার জন্য পানি ব্যবহার (ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ) নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা।
দু'দিনব্যাপী খরা সম্মেলনে আলোচকরা বলেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত নীতি থাকতে হবে। বরেন্দ্র এলাকায় বরেন্দ্র বহুমুখী প্রকল্পের অব্যবস্থাপনার কারণে অব্যবহৃতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছে। এতে এ এলাকার কৃষি ও জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে। রাজশাহী মহানগরীতে অব্যাহতভাবে পুকুর ভরাট করা হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি পুকুরগুলো ভরাট করা হচ্ছে। উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি দীর্ঘদিনের। এর জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টনের সমস্যা রয়ে গেছে।
কাঁকনহাট ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়, রাজশাহী এবং রংপুর বিভাগের সাতটি জেলায় বিস্তৃত বরেন্দ্রভূমি। প্রাচীন প্লায়স্টোলেন (১৮ লাখ থেকে ১ লাখ বছর আগ পর্যন্ত) চত্বরভূমির বরেন্দ্র মাটির প্রকৃতি কিছুটা ভিন্ন ধরনের। লালমাটির এ অঞ্চলে পানি কম রিচার্জ হয়। যার কারণে এ এলাকায় যে পরিমাণ পানি ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করা হয় বর্ষায় সে পরিমাণ পানি রিচার্জ হয় না।
এ কারণে এ অঞ্চলে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে ব্যাপকভাবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে দেশের পশ্চিমাঞ্চল যখন তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে তখন এ অঞ্চলে খরা পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ অবস্থায় কাজ হারাচ্ছে এলাকার কৃষি শ্রমিকরা। এদের একটা বড় অংশ সমতলের আদিবাসী। অস্বাভাবিক এই আবহাওয়া পরিস্থিতি এ অঞ্চলের কৃষি, জনস্বাস্থ্য, বন ও মৎস্য সম্পদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। দরিদ্র মানুষ ভ্যাপসা গরম ও পানিবাহিত রোগে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। অনাবৃষ্টির ফলে নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর ও উন্মুক্ত জলাশয়গুলো পানিশূন্য হয়ে পড়েছে।
১৯৯২ সালে রাজশাহী, নওগাঁ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) বনায়ন, খাল খনন ও রাস্তা-ঘাট নির্মাণের পাশাপাশি কৃষি খাতে উন্নয়নে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বরেন্দ্র এলাকায় কৃষকের চাহিদানুসারে গভীর নলকূপ স্থাপন শুরু করে। ব্যক্তি মালিকানাতেও অনেকে স্থাপন করেন অগভীর নলকূপ। যথেষ্ট পানি উত্তোলনের কারণে ক্রমাগত নিচে নামতে থাকে পানির স্তর। এ এলাকায় কমছে বৃষ্টিপাত। রোপা আমন স্বভাবতই একটি বৃষ্টিনির্ভর ফসল। এই ফসল বাঁচাতে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা বিএমডিএ তাদের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের মোট ১২ হাজার ডিপ টিউবওয়েলের মধ্যে ৭৬৭৭টি রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলায় সেচ সুবিধা দেওয়ার জন্য চালু রয়েছে, যার অধিকাংশই বরেন্দ্র অঞ্চল। তদুপরি হাজার হাজর হেক্টর জমিতে রোপা আপন করা সম্ভব হয়নি। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর রিচার্জের (ঘাটতি পূরণ) বিষয়টি মাথায় রেখে বর্তমানে ডিএমডিএর গভীর নলকূপ স্থাপন বন্ধ রাখার পাশাপাশি বরেন্দ্র অঞ্চলের পুকুর, খাল-খাঁড়ি ও জলাশয় খননের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ডিএমডিএর বর্ধিত এলাকা হিসেবে পরিচিতি বৃহত্তর দিনাজপুর এলাকায় তারা বর্তমানে ব্যাপকভাবে গভীর নলকূপ স্থাপন করেছে। একই সঙ্গে পুরো বরেন্দ্র এলাকায় ব্যক্তিগতভাবে মিনি গভীর নলকূপ স্থাপন চলছে লাগামহীনভাবে। বরেন্দ্র ক্যাম্পেইন গ্রুপের সংগঠন বরেন্দ্র উন্নয়ন প্রচেষ্টার পরিচালক ফয়েজুল্লাহ চৌধুরী বলেন, এ অঞ্চলকে রক্ষা করতে হলে এখনই সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


