তোমার আমার পরিচয় বসন্ত দিনের কোন এক বিকেলে। ভার্সিটি চত্ত্বরজুড়ে তখন কৃষ্ণচূড়া, শিমুল আর পলাশের বাহারি উৎসব। চারিদিকে মনকাড়া রঙের ছোঁয়া। কুসুম কুসুম রোদ ছড়ানো সেই বিকেলে কোথাও এতোটুকু ধূলো ওড়েনি। তুমিও মায়াবী বিকেলের সেই রোদে কনে সেজে আমার সামনে এসে দাঁড়াওনি। তবুও মনে হয়েছিল এই গোধূলী বেলায় আমি যারে দেখছি সে কী আমার স্বপ্নের সেই রাজকন্যা? যাকে আমি খুঁজছি!
শ্যামল সবুজে ঘেরা সারি সারি বৃক্ষের ছায়া বিদীর্ণ করে পড়ন্ত বিকেলের স্তিমিত রোদ তোমার মুখে খেলা করছিল। দীপ্ত আভায় পরিপূর্ণ তোমার মুখ। আমি মুগ্ধ হয়ে তোমাকে দেখছিলাম। বাক্যহারা আমি কিছু বলতে পারিনি। শুধাইনি, এই মেয়ে তোমার নাম কী? সত্যি বলতে কী, তোমার নাম জানার এতোটুকু আগ্রহ আমার ছিলনা। সেই মুহূর্ত্তে মনে মনে আমি একটা নাম শুধু উচ্চারণ করেছিলাম- অনিন্দিতা। তোমার আর কোন নাম-পরিচয় দরকার ছিল না। সেই থেকে তুমি আমার কাছে শুধুই অনিন্দিতা। বসন্তের সেই বিকেলে বাদল দিনের প্রথম কদমফুলের মত ভালবাসার যে মিষ্টি সুবাস তুমি ছড়িয়েছিলে তার সুরভীটুকু ছুঁয়েছিল আমার সমস্ত তনুমন। সেদিনই প্রথম একজনের মনে পুষ্পবৃষ্টি হয়েছিল, ভালবাসায় সিক্ত হয়েছিল।
সময়ের ব্যবধানে সবকিছু পাল্টায়। বসন্ত চলে যায় নিঃশব্দে। জীবন থেকে সুখ পাখীটা তার স্বপ্নের নীড় হারায়। গ্রীষ্মের দুঃসহ দাব দাহে পুড়তে থাকে চলমান সময়। তুমি আর আমি একসময় ঝরা পালকের মত খসে পরি বিস্তির্ণ লোকালয়ে। তখন মন চায় নীল আকাশের কোল জুড়ে কাজল মেঘেরা ঢেলে দিক সজল বর্ষণ- সিক্ত করুক ধরণী, শান্ত হোক আমাদের মানবজমিন। দেখতে ইচ্ছে করে চাতক পাখীর মত অধীর আগ্রহে বসে থাকা মাটির মানুষগুলোর মুখশ্রীতে সেই পুলকভাব, নবান্নের উৎসবের ছোঁয়া। মন চায় ঘুটঘুটে অমাবশ্যার অন্ধকারে জোনাকির আলোয় একা একা ভেসে বেড়াতে। সাধ জাগে চৈতালী চাঁদনি রাতে নব-মালতির কলির সাথে সখ্যতা করে পুকুর পাড়ের দখিনা বাতাসে নিজেকে মেলে ধরতে। ভীষণ ইচ্ছে করে ভারি বর্ষণ শেষে আর্দ্র বাতাসে নিজেকে আরও বেশী সিঞ্চিত করতে। এমন সব মুহূর্ত্তগুলো আবার জীবন্ত হতে চায় শুধু তোমার কথা ভেবে।
জীবনটা আজ সোনার পানি চড়ানো কৃত্তিম গহনার মত। রঙচটা জিনসের মত ফিকে, যত্নহীন। ষড়ঋতুর ব্যঞ্জনা মনকে আর মোহময় ঐশ্বর্যে ভরিয়ে তোলে না। নাগরিক বিষাদময় এই নগর জীবনে মানুষে মানুষে মিতালির গুঞ্জন আজ অনেকটাই স্তিমিত। পারস্পারিক সম্পর্কেও নেই আগের মত সেই মমত্বের প্রকাশ। সকলেই যার যার স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। সবখানেই কেমন যেন একটা বিষাদের স্বরলিপি রচিত। সেই বিষাদের করুণ সুর ভেঙ্গে তবুও মাঝে মাঝে উঠে আসে কিছু আশাবাদী মানুষের স্বপ্ন। স্বপ্নে লালিত সেই ভালবাসায় ভিজে ওঠে জীবন জমিন। নাগরিক কোলাহল, অহেতুক চীৎকার, যান্ত্রিক সব শব্দকে ছাপিয়ে কোন এক অজানা পার থেকে ভেসে আসে এক মিষ্টি ডাক। হৃদয়ের দুকূল ভাসিয়ে তখন জেগে ওঠে ভালবাসার এক নতুন চর। কারও প্রগাঢ় মমত্বের কাছে নতজানু হয় মন। মনের যা কিছু নিজস্ব, সব একাকিত্বকে পাশ কাটিয়ে কারো জন্য বপন করতে ইচ্ছে করে নতুন ফসল। ইচ্ছে করে তার দৃষ্টির দিগন্তে জমা করি এক জীবনের যা কিছু সুন্দর। অনিন্দিতা, তুমি আমার সেই সুন্দর পথের দিশা। তাই আমার ভাবনায় তুমি আজও অকৃত্তিম, একাত্ম হয়ে আছো আমার প্রতিটি অনুভবে।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মার্চ, ২০০৭ ভোর ৪:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



