somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রম্য ভাবনাঃ খুন

৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ৩:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রম্য ভাবনাঃ খুন

তুমি আমাকে খুন করেছো তবুও তোমাকে আমি খুনী বলতে পারছিনা। কারণ সেই খুন আমাকে মৃত্যু দিতে পারেনি। শুনেছি, হৃদপিন্ডের স্পন্দন থেমে গেলে নাকি মানুষের মৃত্যু হয়। অথচ আমার হৃদপিন্ড এখনো পুরোপুরি স্থবির হয়ে যায়নি। আমার হৃদয় খুন হওয়া সত্ত্বেও ক্ষীণ লয়ে বয়ে যাওয়া একটা মৃদু স্পন্দন সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে আমার মৃত্যু হয়নি। আমার দেহ দিব্ব্যি সচল। আমাকে দেখতে সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ মনে হচ্ছে। আমার দেহের কোথাও এতোটুকু আঘাতের চিহ্ন নেই। আমি কিছুতেই প্রমাণ করতে পারবোনা আমি খুন হয়েছি। অথচ আমি দিব্ব্যি করে বলতে পারি আমার দেহের ভেতরের হৃদয়টা নির্মমভাবে খুন হয়েছে। হৃদয় নামের যে এক সূক্ষ্ণ অনুভূতিপ্রবণ, প্রবল স্পর্শকাতর একটা মাংশপিন্ড রয়েছে তা আর আগের মতো সচল নেই, সক্ষম নেই। অথচ আমার সচল, সুঠাম দেহ কিছুতেই প্রমাণ করতে পারছেনা আমি খুন হয়েছি। তাই তুমি নিশ্চিত এক খুনী হওয়া সত্ত্বেও তোমাকে আমি বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারছিনা। কী ভীষণ চালাক তুমি। কী ভীষণ বুদ্ধিমতি। তুমি জানো মানুষের দেহ থেকে আত্মা কেড়ে নিলে মানুষ নিথর হয়ে যায়। প্রাণহীন হয়ে যায়। আর নিথর প্রাণহীন দেহইতো মৃত্যুর প্রতীক। কি দারুন তোমার বুদ্ধিমত্তা। তুমি কী সুকৌশল আমার দেহ থেকে হৃদয় নামের আত্মাটাকে নিপূণ এক প্রেমময় অস্ত্রে ঘায়েল করলে আমি একটুও টের পেলামনা। যখন টের পেলাম তখন দেখি আমি এক দেহ সর্বস্ব জড় পদার্থ। এক জীবন্ত প্রেতাত্মা। ঘুরছি, ফিরছি, খাচ্ছি অথচ অনুভূতি বলে কিছু নেই।

আমি বড় হয়ে জেনেছিলাম আমার দেহের ভেতর একটা সুন্দর হৃদয় আছে। সেখানে প্রেম-ভালবাসা আছে। স্নেহ-মায়া-মমতা সবই আছে। তুমি হৃদয়ে বিশ্বাসী নও। তুমি বলো, “মানুষের ভেতর যারা পুরুষ তাদের ভেতর পশু থাকে। পশুর মতোই মানুষের দেহের ভেতরেও হৃদপিন্ড থাকে। সেটা নিতান্তই একটা মাংশপিন্ড। পশু আর মানুষের মাংশপিন্ডের কার্যকারিতা এক ও অভিন্ন। সেখানে রক্তের চলাচল থাকে। শ্বেত কণিকা, লোহিত কণিকা থাকে। সেই সব কণিকার দিব্ব্যি নেচে খেলে বেড়ায়। সেখানে কোন প্রেম ভালবাসা কিছু থাকেনা। ঐসব কীটসর্বস্ব রক্তই পশু ও মানুষকে বরাবর আলাদা করে ভাবতে শেখায়। পশুর রক্তে বহমান প্লাজমা মানুষের রক্তে বহমান প্লাজমার মতো সংবেদনশীল নয়। কারণ মানুষের নাকি মন বলে কী যেন একটা আছে। পশুদের তা নেই। সত্যই কী তাই? তবে মানুষ কেন সময়ে পশুর চেয়ে বেশী নৃশংশ হয়ে যায়? পশু তার পশুত্বের সীমা লঙ্ঘন করে এমনটা দেখিনি। তবে পশুকে মানুষ যেমন আক্রমণ করে তেমন পশুও মানুষকে পশু ভেবেই তেমন আক্রমণ করে। তবে বুদ্ধির মারপ্যাঁচে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে মানুষের জয় হয়। তার পেছনেও নানা কারণ। মানুষ বুদ্ধিকে লালন করে, চর্চা করে। জ্ঞান লাভের জন্য বই পড়ে। পশুরা সেটা করতে পারলে পশু মানুষে তেমন কোন তফাৎ থাকতোনা”।

তুমি বলো, “মানুষের মন বলে যদি কিছু থাকে তবে সেখানেই হয়তো প্রেম-ভালবাসা নামের অনুভূতিগুলো থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু তুমি তোমার দেহ হাজারবার পোস্টমর্টেম করেও সেখানে মন নামের কোন বস্তু দেখাতে পারবেনা। সত্যি কথা বলতে কী তোমার মন বলে কিছু নেই। তাই তুমি যাকে হৃদয় বলো সেটা তোমার কল্পনা, এক ধরণে মানসিক বিলাসিতা। হৃদয় বা মন মাঝে অনুপস্থিত। তোমার যা আছে ডাক্তারি পরিভাষায় বলতে গেলে সেটা তোমার হৃদপিন্ড। সেই হৃদপিন্ডে আছে রক্তের চলাচল, দাপাদাপিও বলা যায়। তোমার হৃদয় বলে কিছু নেই। তুমি হৃদপিন্ডসর্বস্ব একটা হৃদয়হীন মানুষ। একটা সফিস্টিকেটেড পশু”।

আচ্ছা তুমি কী আমাকে ছুঁয়ে দেখেছো? তুমি কী টের পাও আমার রক্তের ভেতর বেজায় রকমের দাপাদাপি? জানিনা পাও কিনা! সেটাই আমার হৃদপিন্ড। আর আমি যে কথাগুলো তোমাকে বলছি, সেটা আমার অনুভব। সেটাই আমার মনের কথা। আমার মন না থাকলে কথাগুলো আসতো কী করে? আর মন মানেইতো হৃদয়। আজ আমার বোধের কাছে আমি মৃত। আমাকে খুন করা হয়েছে। আমি নিশ্চিত আমার হৃদয়টা আজ ক্ষতবিক্ষত। আমার আত্মাকে বেজায় রকমের ঘায়েল করেছো তুমি। এরপরেও আমার দেহে হৃদপিন্ডের স্পন্দন অব্যাহত। কারণ সব মানুষেরই হৃদপিন্ড থাকে। পশুদেরও থাকে। আমারো আছে। তবে পশুত্বকে ছাপিয়ে আমার বাড়তি যা ছিল সেটাকে আমি হৃদয় বা মন বলেই জানতাম। আমার হৃদয় খুন হয়েছে দেহ নয়, তাই পুরোপুরি খুন হয়েছি এমনটা প্রমাণ করার মতো কোন আলামত পাচ্ছিনা। তাই বিচারকের দরবারেও যেতে পারছিনা। হৃদয় খুন হলে দেহে কোন আঘাতের চিহ্ন থাকেনা। আমার দেহেও কোন আঘাতের চিহ্ন নেই। সরেজমিন তদন্তে কিভাবে প্রমান করবো তুমি আমাকে খুন করেছো। প্রমাণের অভাবে মামলা খারিজ হয়ে যাবে। তোমার বিরুদ্ধে আমি কোন কোন প্রমাণ দাঁড় করাতে পারবোনা। একমাত্র আমিই জানি আমি খুন হয়েছি অথচ তোমাকে আমি খুনী বলতে পারছিনা। তবে কী ধরে নেব মানুষের হৃদয় খুন হলে কেউ খুনী হয়না!

(রাহেলার খুনীদের বিচার হোক। রাহেলার মত হতভাগীদের জন্য এই লেখাটা উৎসর্গকৃত)
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ২:০৫
৩০টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কে আমারে ডাকে?

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ১৯ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২০

কিছু কিছু গান তৈরির পর সৃষ্টির আনন্দে আমি অত্যধিক উচ্ছ্বসিত হই। এ গানটার ফিমেইল ভার্সনটা তৈরি করেও আমি অনেক অনেক তৃপ্ত। আপনারা যারা ফোক-ক্ল্যাসিক্যাল ফিউশন ভালোবাসেন, এটা তাদের জন্য উপযুক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরানের ভুল বনাম যুদ্ধকৌশল

লিখেছেন আলামিন১০৪, ২০ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১২:০৯






ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করেছিল এবং তার মাশুল দিচ্ছে হাড়ে-হাড়ে। যখন গাজার শিশু-মহিলা-আপামর জনসাধারণকে নির্বিচারে বোমা-ক্ষেপনাস্ত্রের আঘাতে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছিল তখন আম্রিকা বলেছিল ঈসরাইলের উপর হামলায় ইরানের ভূমিকা নেই- মানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

লোভে পাপ, পাপে ....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১:৫২


"মাংস সমিতি।" এরকম নাম শুনলে প্রথমে হাসি পায়। সঞ্চয় সমিতি শুনেছি, ঋণ সমিতি শুনেছি, এমনকি মহিলা সমিতিও শুনেছি। কিন্তু মাংস সমিতি? তারপর একটু ভাবলে হাসি থেমে যায়। কারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

চর্যাপদঃ বাংলা ও বাঙালির ঐতিহ্য

লিখেছেন কিরকুট, ২০ শে মার্চ, ২০২৬ সকাল ৭:০৮

চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত হলেও, এর ভাষা ও উৎস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলে আসছে। ১৯০৭ সালে নেপালের রাজগ্রন্থাগার থেকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এই পদগুলি আবিষ্কার করেন এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৮:৩৪


আজ বাদে কাল ঈদ। ঈদ-উল-ফিতর প্রতি বছর আমাদের জীবনে নতুন নতুন অনুভূতি নিয়ে ফিরে আসে, তবে এই আনন্দের জোয়ার সবচেয়ে বেশি আছড়ে পড়ে শিশু-কিশোরদের মনে। সেই ছোটবেলার কথা মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×