মহান আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে সৃষ্টি করেছেন মানুষ হিসেবে। সৃষ্টিকতর্ার কাছে আমি তাই চিরকৃতজ্ঞ, কারণ আমি মানুষ, সৃষ্টির সেরা জীব। এই পৃথিবী তথা বিশ্বব্রহ্মান্ডের যাবতীয় সকলকিছু সৃষ্টির মূলে আল্লাহ্। আমি মানবজাতির পরিচয় বাহক। তাই আমার প্রথম পরিচয়- আমি একজন মানুষ। আমার দ্বিতীয় পরিচয়- আমি একজন মুসলমান। আমার তৃতীয় পরিচয়- আমি একজন বাংলাদেশী। আমার চতুর্থ পরিচয়- আমি একজন ব্যক্তি, সম্পূর্ণ একক স্বতা্বর অধিকারী । আমি একটা সমাজ বা পরিবারের অংশ মাত্র। আমার নিজস্ব একটা নাম আছে।
আমার প্রথম পরিচয়- আমি একজন মানুষ:
না, আমার পরিচয় এখনও শেষ হয়নি। আরও অসংখ্য পরিচয় আছে আমার। আপনাদেরও আছে আমার মত অসংখ্য পরিচয়। আর থাকাটাই স্বাভাবিক। বিশ্বের সকল মানব গোষ্ঠির কাছে আমার বা আপনার বর্তমান বা চিরাচরিত পরিচয় সর্বসম্মত ভাবে স্বীকৃত বা একমাত্র পরিচয় নাও হতে পারে। আর এই পরিচয়ের পার্থক্য এনে দেয় মূলত আমাদের সদাজাগ্রত দৃষ্টিভঙ্গি, সূক্ষণ অনুভুতি ও তীক্ষণ জীবনবোধ এবং সেই সাথে সমাজ, ধর্ম ও মানুষকে বিচার বিশ্লেষণের ক্ষমতা। সবের্াপরি মানুষ আপন কৃতকর্ম, সৃজনশীলতা, সামাজিক অবস্থান ও মূল্যবোধের দ্বারা এই পরিচয়ের ভিত্তি স্থাপন করে আর মানবিক গুণাবলী ও প্রক্রিয়া এই পরিচয়ের উপর তুলির শেষ টানটা বসিয়ে দেয়।
একটু খুলে ব্যাখ্যা করা যাক। যেমন মানুষ হওয়া সত্ত্বেও আমার নির্দ্দিষ্ট একটা নাম আছে। একটা সামাজিক পরিচয় আছে। আমি কারও সন্তান, পিতা বা ভাই। আমি সমাজের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হতে পারি আবার ঘৃণ্য সন্ত্রাসীও হতে পারি। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হতে পারি আবার রাজাকারও হতে পারি। আমি একজন সচেতন নাগরিক হতে পারি আবার মাতাল, লম্পট, চরিত্রহীন বা ব্যভিচারীও হতে পারি। আমি মায়ের আদর্শ সন্তান হতে পারি আবার নেশাখোর মাদকসেবীও হতে পারি। সুতরাং মানুষ হিসেবে আমার আপনার পরিচয়টা যেমন আপেক্ষিক আবার তেমনি ব্যপক বর্ণনা ও বিশেষণে ভূষিত। সবগুলো পরিচয়ই অর্থবহ এবং সমাজের কাছে স্বীকৃত। তাই সামাজিক ও ধমর্ীয় প্রেক্ষাপটে মানুষের বাহ্যিক পরিচয় যে কোন সময়ে বদলাতে পারে।
মানুষ পরিচয়টা আমার একক ও পূর্ণ পরিচয় নয়। আগেই বলেছি আমি আল্লাহ্'র সৃষ্টি একজন সাধারণ মানুষ। সমগ্র মানবজাতির ক্ষুদ্রতম একক। আরও একটু বিশদভাবে বলতে গেলে আমি একজন পুরুষ মানুষ। তাই পুরুষ জাতির প্রতিনিধি। সৃষ্টিকতর্া মনুষ্যজাতির বিভাজন ঘটিয়ে কাউকে করেছেন পুরুষ কাউকে নারী। শারীরিক ও মনোজৈবিক তফাৎ ঘটিয়ে নারীজাতিকে দিয়েছেন নারীসুলভ যাবতীয় গুণাবলির সঙ্গে সন্তান ধারণ ও প্রসবের বিশেষ ক্ষমতা। মাতৃত্বের গৌরব প্রকাশের অমিত সুখ। সৃষ্টিকর্তার পরেই মা'য়ের অবস্থান সুনিশ্চিত করেছেন। মানুষ হিসেবে একজন পুরুষ তা পায়নি। না সেজন্যে কোন হতাশা ব্যক্ত করছি না। সৃষ্টিকর্তা আমাকে যা সৃষ্টি করেছেন তাতেই আমি সুখী। সৃষ্টিকর্তা নারী জাতিকে এক শাশ্বত সৌন্দর্য দান করেছেন যা সময়বিশেষে পুরুষকে নারীর প্রতি আকৃষ্ট করে। এসব বাদ দিয়ে একজন নারীর চাইতে একজন পুরুষকে যা যা বেশী দিয়েছেন তা হলো তুলনামূলকভাবে কিছুটা পেশী বা শারীরিক শক্তি, আংশিক বর্ধিষ্ণু কিছূ মগজ ও মেধা, আর বিশেষ ক্ষেত্রে পশুসূলভ মনোবৃত্তি যা নিতান্তই ঘৃণ্য বিষয়। সেই সাথে নারীর চাইতে একখানা হাড়ও বেশী জুড়ে দিয়েছেন। আর অন্য যা কিছু বায়োফিজিক্যাল পার্থক্য দিয়েছেন তা আপাতত আমার আলোচনার বিষয়বস্তু নয়।
মানুষ হিসেবে আমার আনুসাঙ্গিক আরও অনেক পরিচয় আছে। যেমন আমি তৃতীয় বিশ্ব বা উন্নয়নশীল দেশের মানুষ। আমার গায়ের রঙ কালো। আমার ক্যালোরি ইনটেক মানব উন্নয়ন সূচকের তলানিতে। বিশ্বমানে আমার মাথাপিছু আয় গড়েপিটে দুটো আফ্রিকান দেশের উপরে, এশিয়ান ও অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে সবার নীচে। আমার আরও পরিচয় আমি এশিয়া মহাদেশের। আরেকটু বিশদভাবে আমি দক্ষিন পুর্ব এশিয়া বা ভারতবর্ষের অধিবাসী। আরও বলতে পারি আমি পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ অঞ্চলের বাসিন্দা। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও বৈচিত্রময় ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট বা সুন্দরবন অধু্যষিত এলাকার মানুষ। আরও উল্লেখ্য আমি বরেন্দ্র অঞ্চলের তথা প্রসিদ্ধ রেশম বা সিল্ক উৎপাদনকারী এলাকার মানুষ। আর কত বলবো। এই সবই আমার পরিচয়ের অংশবিশেষ। তাই আমার পরিচয়ের শেষ নেই। শেষ হবেও না। সব পরিচয় ছাপিয়ে যেটা ধ্রুব সত্য তা হলো আমার মানুষ পরিচয়।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই মার্চ, ২০০৬ রাত ৩:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



